ভারত ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া স্থগিত করায় গত প্রায় দুই বছর ধরে কলকাতার নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন অঞ্চলের হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং দোকানপাটগুলো টিকে থাকার তীব্র সংগ্রাম করছে, বলে খবরে এসেছে। বাংলাদেশিদের জন্য দীর্ঘ দুই বছর পর আবার চালু হচ্ছে ভারতের পর্যটন ভিসা। এ সিদ্ধান্তে ব্যবসা পুনরুজ্জীবনের আশায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত নিউ মার্কেটসহ মারকুইজ স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকা। গতকাল রবিবার থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (আইভ্যাক) এই পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত এই ভিসা বন্ধ করে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন পর এই সেবা চালু হওয়ায় ভ্রমণপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের অপেক্ষার অবসান ঘটল।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নেয়ার পর গত বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, পর্যটন ভিসার পাশাপাশি মানবিক কারণে মেডিকেল ভিসা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের বাকি আইভ্যাক কেন্দ্রগুলোতেও এই সেবা চালু করে ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হবে।
জেগে উঠছে কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ বাংলাদেশিদের জন্য দীর্ঘ দুই বছর পর আবার চালু হচ্ছে ভারতের পর্যটন ভিসা। এ সিদ্ধান্তে ব্যবসা পুনরুজ্জীবনের আশায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত নিউ মার্কেটসহ মারকুইজ স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার অংশ হিসেবে ঢাকায় ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত ২৫ জুন এক অনুষ্ঠানে রবিবার থেকে বাংলাদেশিরা আবার পর্যটন ভিসার আবেদন করতে পারবেন বলে ঘোষণা দেন। ঘোষণা অনুযায়ী রবিবার থেকে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের মাধ্যমে আবেদন নেওয়া হবে।
শনিবার টাইমস অব ইন্ডিয়ায় এ সংক্রান্ত এক খবরে বলা হয়, ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেওয়ায় কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এই সিদ্ধান্তকে কলকাতার মারকুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড এবং কলিন লেন অঞ্চলের প্রায় ৩৫০টি হোটেলের জন্য একটি ‘লাইফলাইন’ বা ‘সঞ্জীবনী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
“২০২৪ সালে বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারত বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া স্থগিত করায় গত প্রায় দুই বছর ধরে এই অঞ্চলের হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং দোকানপাটগুলো টিকে থাকার জন্য তীব্র সংগ্রাম করছিল। গত দুই বছর এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ৭০ শতাংশের বেশি ধসে পড়েছিল। হোটেলগুলোর বোর্ডার সংখ্যা এবং গড় রুম ভাড়া প্রায় নেমে এসেছিল অর্ধেকে। এছাড়া রেস্তোরাঁ, মানি এক্সচেঞ্জ, পরিবহন অপারেটর, কাপড়ের দোকান এবং নিউ মার্কেটের প্রায় ৩ হাজার দোকানদারও এখন তাদের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন।”
কলকাতার নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, গোটা নিউ মার্কেটে দৈনিক ব্যবসার পরিমাণ আগে যেখানে প্রায় ৫০০ কোটি রুপি ছিল, তা গত দুই বছরে কমে মাত্র ৫০ কোটি রুপিতে নেমে এসেছে।
‘ক্যালকাটা হোটেলস, গেস্ট হাউসেস অ্যান্ড রেস্টুরেন্টস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হরমিত সিং বলেন, “এই ঘোষণা (ভিসা শুরু) মধ্য কলকাতার বাণিজ্যিক এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ ও আমেজ বদলে দিয়েছে। কারণ এ এলাকা মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।”
তিনি বলেন, গত দুই বছরে নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় হোটেলগুলোতে বোর্ডার থাকার হার এবং গড় রুম ভাড়া ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
“আগে যেখানে গড় ভাড়া ছিল প্রায় ২০০০ রুপি, তা নেমে দাঁড়ায় ৯০০ থেকে হাজার রুপিতে। কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁতো বন্ধই হয়ে গেছে। মানি এক্সচেঞ্জ, পরিবহন অপারেটর এবং কাপড়ের দোকানগুলো এখন সাগ্রহে বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমনের অপেক্ষায় আছে।”
হোটেল মালিকরা বলেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রত্যাবর্তন কেবল হোটেলের রুম বুকিংই বাড়াবে না, বরং রুমের ভাড়াও আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করবে। কারণ ভারতের ভ্রমণকারীরা সাধারণত মাত্র এক বা দুই দিন থাকেন। সেখানে বাংলাদেশি দর্শনার্থীরা সাধারণত কলকাতায় অন্তত এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় কাটান।
নিউ মার্কেটের এসএস হগ মার্কেট ট্রেইডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি চকলেট, ড্রাই ফ্রুটস এবং প্রসাধন সামগ্রী বিক্রেতা অশোক গুপ্ত বলেন, “এখানকার প্রায় তিন হাজার দোকান গত কয়েক বছর ধরে কোনোমতে টিকে রয়েছে। এর আগে, এখানকার ব্যবসার প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ আসত বাংলাদেশি পর্যটকদের হাত ধরে। দুই-তিন বছর আগে একদিনে আমাদের যে বিক্রি হতো, এখন সেই বিক্রি এক মাসেও করতে পারছেন না।”
এদিকে আশার পাশাপাশি ব্যবসায়ী মালিকরা এখনো কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করছেন বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়। কলকাতা নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর আগেও একবার কথা উঠেছিল ৬ মে থেকে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালু হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
গেস্ট হাউসেস অ্যান্ড রেস্টুরেন্টস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাজেশ শেঠি বলেন, “মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। একবার ভিসা দেওয়া শুরু হলে হোটেল মালিকরা বন্ধ থাকা রুমগুলো আবার খুলবেন। দোকানদাররাও নতুন মালামাল তুলতে শুরু করবেন দোকানে।”
অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
ভারতীয় টুরিস্ট ভিসার আবেদন করতে প্রথমে ভারতের অনলাইন ভিসা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে ‘রেগুলার ভিসা অ্যাপ্লিকেশন’ অপশন নির্বাচন করে দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবং ভিসার ধরন হিসেবে টুরিস্ট ভিসা বেছে নিতে হবে।
এরপর পাসপোর্ট অনুযায়ী ব্যক্তিগত তথ্য, পাসপোর্টের বিবরণ এবং ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে। আবেদন সম্পন্ন হলে একটি ওয়েব ফাইল নম্বর বা অ্যাপ্লিকেশন আইডি পাওয়া যাবে। পরবর্তী সব কার্যক্রমের জন্য এটি সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের একটি ডিজিটাল ছবি আপলোড করে আবেদনপত্র প্রিন্ট করে তাতে স্বাক্ষর করতে হবে।
যেসব কাগজপত্র লাগবে
ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস থাকতে হবে এবং অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে। আগের কোনো পাসপোর্ট থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক তোলা রঙিন ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কপি, বর্তমান ঠিকানার প্রমাণপত্র এবং পেশাভিত্তিক প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) বা অফিসের প্রত্যয়নপত্র, ব্যবসায়ীদের জন্য হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র বা বোনাফাইড সনদ প্রয়োজন হবে।
আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ
টুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণও দিতে হবে। এ জন্য গত ছয় মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট অথবা পাসপোর্টে ন্যূনতম ১৫০ মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অ্যান্ডোর্সমেন্ট থাকতে হবে। বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের কপিও জমা দেয়া যাবে।
ফি পরিশোধ ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট
অনলাইন আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর আইভ্যাকের নির্ধারিত পেমেন্ট পোর্টালের মাধ্যমে প্রসেসিং ফি পরিশোধ করতে হবে। এরপর আইভ্যাক বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট আগের দিন সন্ধ্যা ৬টায় উন্মুক্ত করা হয়। তবে স্লট বুক করতে আবেদনকারীকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে সাইন-আপ সম্পন্ন করতে হবে।
আবেদন জমা দেয়ার দিন
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত হওয়ার পর নির্ধারিত দিনে প্রিন্ট করা আবেদনপত্র, পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইভ্যাক কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে।
সেখানে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের পর আবেদন গ্রহণ করা হবে এবং একটি রিসিপ্ট বা ডেলিভারি স্লিপ দেয়া হবে। সাধারণত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে আবেদনপত্র জমা নেয়া হয়।
ফাইল সাজাবেন যেভাবে
ভিসা সেন্টারে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দিষ্ট ক্রমে সাজিয়ে রাখা ভালো। প্রথমে থাকবে প্রিন্ট করা অনলাইন আবেদনপত্র, এরপর আইভ্যাক ফি পরিশোধের স্লিপ।
এর সঙ্গে মূল পাসপোর্ট ও পুরোনো পাসপোর্ট, পাসপোর্টের তথ্যপাতার ফটোকপি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদের কপি, বর্তমান ঠিকানার প্রমাণপত্র, পেশার প্রমাণ এবং আর্থিক সক্ষমতার নথি সংযুক্ত করতে হবে।
কাউন্টারে জমা ও বায়োমেট্রিক
ভিসা সেন্টারে প্রবেশের পর প্রথমে কাগজপত্র প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হবে। এরপর আবেদনকারীকে একটি টোকেন দেয়া হবে। টোকেন নম্বর ডাকার পর নির্ধারিত কাউন্টারে ফাইল জমা দিতে হবে।
কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় নথি যাচাই শেষে আবেদনকারীর ডিজিটাল ছবি, আঙুলের ছাপ এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান গ্রহণ করবেন। সবশেষে একটি রসিদ দেয়া হবে। পাসপোর্ট সংগ্রহের সময় এই রসিদ প্রয়োজন হবে, তাই এটি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করতে হবে।
ট্র্যাকিং ও পাসপোর্ট সংগ্রহ
আবেদন জমা দেয়ার পর আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে রসিদের নম্বর ব্যবহার করে ভিসা আবেদনের অগ্রগতি বা স্ট্যাটাস দেখা যাবে। ভিসা প্রস্তুত হলে আবেদনকারীর মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠানো হবে।
এসএমএস পাওয়ার পর রসিদে উল্লিখিত সময় অনুযায়ী, সাধারণত বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে আইভ্যাক কেন্দ্র থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করা যাবে।
যত দিনে মিলবে ভিসা
ভারতীয় ভিসার আবেদন জমা দেয়ার পর সাধারণত ন্যূনতম তিন কার্যদিবস সময় লাগে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে। তবে নথিপত্র যাচাই, আবেদনকারীর জাতীয়তা এবং বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সময় আরও বেশি লাগতে পারে।
ভিসা অনুমোদিত হলে আইভ্যাক কেন্দ্র থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করা যাবে।
আবেদনকারীদের জন্য সতর্কতা
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইন আবেদন জমা দেয়ার পর আর কোনো তথ্য সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তাই নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, পাসপোর্ট নম্বরসহ সব তথ্য একাধিকবার যাচাই করে আবেদন জমা দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে বলে অ্যাপ্লিকেশন আইডি বা ওয়েব ফাইল নম্বর সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শও দেয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









