মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরের দক্ষিণ প্রান্তে ইসলামপুর সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা গত বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি সফরে মৌলি বাজার এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো কালে হাওয়া রক্ষা আন্দোলনের নেতাদের হাতে ছিল রঙিন ব্যানার, কণ্ঠে ছিল স্লোগান। কিন্তু এই আয়োজন কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শন ছিল না; এটি ছিল একটি জনপদের প্রাণের আর্তি। এটি ছিল কৃষক, মৎস্যজীবী ও পরিবেশসচেতন মানুষের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে একটি আবেদন; হাওরকে বাঁচান, প্রকৃতিকে বাঁচান, ভবিষ্যৎকে বাঁচান।
বাংলাদেশ একটি ছোট ভূখণ্ডের দেশ। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। ফলে উন্নয়ন আমাদের জন্য অপরিহার্য। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অবকাঠামো নির্মাণ, এসবই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের পথ কি এমন হবে, যেখানে কৃষিজমি হারিয়ে যাবে, জলাভূমি ধ্বংস হবে এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে? উন্নয়ন যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করে।
মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চল শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি দেশের খাদ্য, মৎস্য ও পরিবেশ নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বর্ষাকালে বিশাল জলরাশি দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডারে পরিণত হয়। শুকনো মৌসুমে সেই একই ভূমি হয়ে ওঠে সোনালি ধানের ক্ষেত। একদিকে মাছ, অন্যদিকে ধান; দুই ক্ষেত্রেই জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে হাওরাঞ্চল।
হাওর শুধু খাদ্যের উৎস নয়, এটি জলবায়ু ও পরিবেশেরও রক্ষাকবচ। জলাধার হিসেবে হাওর বন্যার পানি ধারণ করে, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা করে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই সময়ে হাওরাঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রকৃতির ভাষায় বলতে গেলে, হাওর হলো দেশের কিডনি, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
মৌলভীবাজারের সৌন্দর্যও এই হাওরকে ঘিরেই। হাওর, নদী, চা-বাগান, ঝরনা, পাহাড়ি টিলা, খাল ও বিলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ভূপ্রকৃতি। উজানের চা-বাগান বেষ্টিত পাহাড় ও বনভূমি জেলার ফুসফুসের মতো কাজ করে। এই প্রকৃতি শুধু স্থানীয় মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন নয়, এটি পর্যটন ও জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
দুঃখজনকভাবে, এই সম্পদ আজ নানা হুমকির মুখে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে কিছু কোম্পানি হাওরের সস্তা কৃষিজমি ও জলাভূমি কিনে নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়েও আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী হাওরভূমিকে শিল্পায়নের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
সৌরবিদ্যুৎ অবশ্যই প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতেই হবে। কিন্তু সৌরবিদ্যুতের নামে যদি হাজার হাজার একর উর্বর কৃষিজমি ভরাট করা হয়, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। পরিবেশ ধ্বংস করে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনের যুক্তি নিজেই একটি বড় বৈপরীত্য।
কাউয়াদিঘি হাওর নিয়ে বর্তমানে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা মোটেও অমূলক নয়। বিভিন্ন কোম্পানি ইতিমধ্যে আড়াই হাজার একরেরও বেশি জমি কিনে নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। যদি হাওরের মাঝখানে বিশাল এলাকা ভরাট করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়, তবে শুধু কৃষিজমিই হারাবে না; মাছের আবাসস্থল, পাখির বিচরণক্ষেত্র এবং পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে হাওরপাড়ের কৃষক ও মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনে।
তবে আশার কথা হলো, হাওর রক্ষা আন্দোলন শুধু আপত্তি জানায়নি; তারা একটি বাস্তবসম্মত বিকল্পও প্রস্তাব করেছে। এটাই তাদের আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।কাউয়াদিঘি হাওরের প্রায় ৫৬ হাজার একর ভূমি মনু সেচ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। শুকনো মৌসুমে মনু নদ থেকে পানি এনে এই অঞ্চলের কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হয়। এ জন্য ২০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত অসংখ্য ক্যানেল রয়েছে।
এসব ক্যানেলের প্রধান কাজ পানি পরিবহন। সেখানে মাছ চাষও হয় না। হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা প্রস্তাব করেছেন, কৃষিজমি ভরাট না করে এসব ক্যানেলের ওপর সৌর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। এই প্রস্তাব শুধু অভিনব নয়, অত্যন্ত দূরদর্শীও।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাল, জলাধার ও সেচব্যবস্থার ওপর সৌর প্যানেল স্থাপনের উদাহরণ রয়েছে।
এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, অন্যদিকে জমি নষ্ট হয় না। এমনকি পানির বাষ্পীভবনও কমে যায়। ফলে একই সঙ্গে কৃষি ও জ্বালানি; দুই খাতই উপকৃত হয়।
মনু সেচ প্রকল্পের বাঁধসংলগ্ন প্রায় ৬৪ কিলোমিটার উন্মুক্ত ভূমি এবং প্রধান ও উপ-ক্যানেলের মধ্যবর্তী প্রায় ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকার চাইলে নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এসব এলাকা লিজ দিতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, বিনিয়োগও আসবে। কিন্তু কৃষিজমি, জলাভূমি ও পরিবেশ অক্ষত থাকবে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি নিহিত। আমরা কি সহজ পথের নামে ভুল পথ বেছে নেব, নাকি কিছুটা চিন্তা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই পথ খুঁজে নেব? উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার দিন শেষ হয়ে গেছে। আধুনিক বিশ্ব দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃত উন্নয়ন সেই উন্নয়ন, যা অর্থনীতি ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ওপর। হাওর ধ্বংস করে সাময়িক লাভ পাওয়া সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জলাভূমি, বিলুপ্ত মাছের প্রজাতি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই আজকের সিদ্ধান্ত আগামী প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাওরপাড়ের মানুষের আবেদন খুবই সরল; উন্নয়ন হোক, কিন্তু হাওর ধ্বংস করে নয়। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হোক, কিন্তু কৃষিজমি নষ্ট করে নয়। বিনিয়োগ আসুক, কিন্তু পরিবেশের বিনিময়ে নয়। হাওর বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমি রক্ষা করা নয়। হাওর বাঁচানো মানে কৃষককে বাঁচানো, মৎস্যজীবীকে বাঁচানো, খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা করা এবং জলবায়ু সংকটের মুখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা। আজ যদি আমরা হাওরের পাশে দাঁড়াই, তাহলে প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেদের অস্তিত্বের পক্ষেই দাঁড়াব। কারণ হাওর বাঁচলেই ভবিষ্যৎ বাঁচবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









