ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলা এবং কুড়িগ্রামের সব নদ-নদীর পানি বেড়ে বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে দুধকুমার নদের পানি সমতলে দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দুধকুমার নদ অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানিও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে বিপৎসীমার চার সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে৷ টানা বৃষ্টির মধ্যে উঁচু জায়গা বা সড়কে খোলা আকাশের নিচে খুব কষ্টে দিন কাটছে বন্যার্তদের। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়ার কথা জানিয়ে দ্রুতই তা আশা করছেন।
এদিকে রংপুর বিভাগের বাকি জেলাগুলোসহ সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদ-নদীগুলোর পানিও কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তারা বলছে, আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী দু’তিনদিনে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
লালমনিরহাটে ঢুকেছে বানের পানি: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে বলা হয়েছে, কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে বিপৎসীমার চার সেন্টিমিটার ও তিস্তা নদীর পানি সমতল ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কেন্দ্রটি বলছে, বিশেষত টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে ফের বেড়েছে তিস্তা নদীর পানি। ফলে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রবিবার রাত থেকে গতকাল সোমবার সারাদিনে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার অনেক বাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে বসতবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। চরাঞ্চলে তেমন আবাদ না থাকলেও মৎস্যচাষিদের পুকুরের মাছ পানির সঙ্গে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাটগ্রামের গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারী, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী ও ডাউয়াবাড়ী; কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈলমারী ও নোহালী; আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন, কালমাটি, বাহাদুরপাড়া ও পলাশী এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, তাজপুর ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘রবিবার রাত থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। এর সঙ্গে ভারী বৃষ্টিও হচ্ছে। এবার বন্যা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। আমরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে নিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি।’ গোবর্ধন এলাকার তানজিলা আক্তার বলেন, রবিবার রাতে আমাদের বাড়িতেও পানি উঠে গেছে। বাধ্য হয়ে আমরা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছি। টানা বৃষ্টির মধ্যে খুব কষ্টে দিন কাটছে। তিস্তা আমাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না।’
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টা দেশে ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি সব পয়েন্টেই বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপর থাকতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার পাশাপাশি পানি কমে যাওয়ার পর নদীভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার ডান তীর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তিস্তা নদী ডালিয়া (নীলফামারী) ও কুশিয়ারা নদী মারকুলি (সুনামগঞ্জ) এবং সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কুড়িগ্রামে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি: দুধকুমার নদের পানি বেড়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকডাঙ্গা, ছিট পাইকেরছড়া ও চর বলদিয়া এবং নাগেশ্বরী উপজেলার চরবিষ্ণুপুর, বালাবাড়ি, চর লুছনি ও ফান্দরচর এলাকার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে নিচু এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে, শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
নাগেশ্বরী উপজেলার চর লুছনি এলাকার বাসিন্দা আবদুল জব্বার বলেন, রবিবার বিকেলের পর থেকে দুধকুমারের পানি হু হু করে বেড়ে ফসলি জমি ডুবে গেছে। বসতবাড়ির চারদিকে পানি হয়ে হাঁটাচলার পথ বন্ধ হয়ে অন্তত শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গবাদিপশুর খাবার নিয়ে সবাই চিন্তায় আছে।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টির ফলে সমতলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। দুধকুমার নদের পানি বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে।
জেলা পাউবোর তথ্যমতে, গতকাল সোমবার প্রধান নদ-নদীগুলোর মধ্যে দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অন্যদিকে ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ৭৩ সেন্টিমিটার এবং তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ছয় সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, উজানের ঢলে যেসব জায়গায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, তাদের জন্য নগদ দুই লাখ টাকা এবং এক হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনা খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলার জন্য এক হাজার করে জিও ব্যাগ জরুরি ভাঙনরোধে প্রস্তুত আছে। তবে তিনি বলেন, নয়টি উপজেলার জন্য দুই লাখ টাকা কিছুই নয়। প্রশাসনের কাছে যে টাকা ও খাবার ছিল, সব বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আরও কয়েক জেলায় বন্যার শঙ্কা: শেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগ, ভারতের মেঘালয় ও অরুণাচল রাজ্যে অতি ভারি এবং পশ্চিমবঙ্গে ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময় চট্টগ্রামের কুতুবদিয়ায় দেশের সর্বোচ্চ ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ডের তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ মঙ্গলবারও রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণের পূর্বাভাসও রয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, দেশের ভেতরে রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, অরুণাচল ও মেঘালয় রাজ্যে গতকাল সোমবার থেকেই ভারি থেকে অতি ভারি এবং পরবর্তী এক দিন মাঝারি-ভারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত চলছে, যা আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
বৃষ্টির পানির সঙ্গে জোয়ার ও পাহাড়ি ঢলে শেষ ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা-কুশিয়ারা নদ-নদীর পানির সমতল বেড়েছে, যা আগামী শনিবার ৩ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বৃহস্পতিবার ১ জুলাই থেকে ওইদিন পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে। আগামীকাল বুধবারের মধ্যে সুরমা-কুশিয়ারা নদী দুটিও সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বুলেটিনে বলেছে, উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদী দুটিও আজ মঙ্গলবার থেকে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে এবং লালমনিরহাটের আরো অনেক জায়গা স্বল্পমেয়াদি বন্যার কবলে পড়তে পারে। মনু, খোয়াই, ধলাই, সোমেশ্বরী ও ভূগাই-কংস নদীর পানি সমতলও কাল বুধবার পর্যন্ত বেড়ে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। পদ্মা নদীর পানিও একই সময়কালে বেড়ে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে বলেও আভাস দিচ্ছে কেন্দ্রটি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









