বাংলাদেশে ২০২৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুসারে বিদায়ী বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, হেফাজতে মৃত্যু, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পেয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এমএসএফ জানায়, জবাবদিহির অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এমএসএফ-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৫৯৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় মোট ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বড় অংশই বিএনপির (৬৫ জন)। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যসহ সাধারণ নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন।
বিদায়ী বছরে ২ লাখ ১২ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে 'অপারেশন ডেভিল হান্ট'সহ বিভিন্ন অভিযানে আওয়ামী লীগের প্রায় ১৫ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে প্রায় ৪৫ লাখ ২০ হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে, যা বিচার প্রাপ্তিকে কঠিন করে তুলছে। সংগঠনটি জানায়, ২০২৫ সালেও 'ক্রসফায়ার' বা বন্দুকযুদ্ধের সংস্কৃতি বন্ধ হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যার অন্তত ১৯টি ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে যৌথ অভিযানেই ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তারের ভয়ে পালানোর সময় ধাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে আরো ৮ জনের। এ বছর কারাগারে ১১৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১১২ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে 'অসুস্থতা' উল্লেখ করা হয়েছে।
এমএসএফ-এর মতে, ২০২৫ সালে 'মব ভায়োলেন্স' বা গণপিটুনি মহামারি আকার ধারণ করেছে। ৪২৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময় সারা দেশে ৬৪১টি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা চরম সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
বিদায়ী বছরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চরম চাপের মুখে ছিল। এমএসএফ জানায়, ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১ জন সাংবাদিক নিহত এবং ২৯৫ জন হামলার শিকার হয়েছেন। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলাসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৪৬টি মামলা ও ১২ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।
নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ বছর নারীদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ১৪টি এবং শিশু-কিশোরীদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২৮টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা (৯২টি) গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে এমএসএফ কয়েকটি জরুরি সুপারিশ পেশ করেছে-
১. বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন।
২. মব ভায়োলেন্স রোধে জবাবদিহিমূলক পুলিশিং নিশ্চিত করা। ৩. সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা জোরদার এবং সাইবার আইনের অপব্যবহার রোধ। ৪. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এমএসএফ-এর প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান এবং প্রকল্প সমন্বয়ক মোহাম্মদ টিপু সুলতানসহ অন্য কর্মকর্তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









