দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য আবারো ট্যুরিস্ট বা পর্যটন ভিসা চালু করেছে ভারত। ভিসা চালুর এই ঘোষণা আসতেই দেশের ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ দুই বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেবা চালুর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এক লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে ভারতীয় ভিসাকেন্দ্রগুলোতে।
ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কের ভিসাকেন্দ্রের বাইরে গত তিনদিন ধরে এক কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ভিসাপ্রত্যাশীরা বলছেন, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, বিয়ের কেনাকাটা কিংবা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে ভারতই একমাত্র ভরসা।
২৮ জুন ঢাকায় নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নিয়েই দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে জোরদারে ট্যুরিস্ট ভিসা ফের চালুর ওই ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার পাঁচটি ভিসাকেন্দ্রের সামনে আবেদনকারীদের দীর্ঘলাইন তৈরি হচ্ছে।
ইন্ডিয়া টুডে জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। সে সময় ভিসাকেন্দ্রগুলোতে হামলা ও কর্মীদের হুমকির মুখে ট্যুরিস্ট ভিসা সম্পূর্ণ স্থগিত করে ভারত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতবিরোধী মনোভাবে সম্পর্কের আরো অবনতি হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদিকে হত্যার পর ভারতীয় দূতাবাসে উগ্র জনতার চড়াও হওয়ার চেষ্টায় তা চরমে পৌঁছায়। বর্তমানে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অধীন পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ ও তিস্তার পানিবণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে এখনো শীতল ভাব বজায় রয়েছে। তবে রাজনৈতিক এই টানাপড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যকার গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে এড়ানো অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আগে যেখানে প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভারতে যেতেন, ভিসা স্থগিতের পর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র চার লাখ ৭০ হাজারে, যাদের বেশিরভাগই গিয়েছিলেন সীমিত পরিসরে চালু থাকা মেডিকেল ভিসায়।
আগে ভারতের দেওয়া মেডিকেল ভিসার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই পেতেন বাংলাদেশিরা। সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় বিকল্প হিসেবে অনেকে চীন, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে গেলেও মধ্যবিত্তের জন্য তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে ভাষা বা খাবারের কোনো বাধা না থাকা এবং বাংলাভাষি চিকিৎসকদের সহজলভ্যতায় কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি বা ব্যাঙ্গালুরুর হাসপাতালগুলোই বাংলাদেশিদের প্রধান পছন্দ। মেডিকেল ভিসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেকেই এখন ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে ছুটছেন।
ভিসাকেন্দ্রের লাইনে থাকা আবেদনকারী শফিকুল জানান, অসুস্থ স্ত্রী ও মায়ের চিকিৎসার জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়াটা তার জন্য জীবন রক্ষাকারী সুযোগের মতো। অন্যদিকে একজন সাধারণ আবেদনকারী বলেন, ‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আমাদের সম্পর্ক সবসময়ই উষ্ণ ছিল, মাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্ব বজায় রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
ইন্ডিয়া টুডে বলছে, ট্যুরিস্ট ভিসা ফের চালুর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরাও। গত দুই বছরে কলকাতার নিউ মার্কেট ও সদর স্ট্রিট সংলগ্ন ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত বাণিজ্যিক এলাকায় বাংলাদেশিদের আগমন কমে যাওয়ায় হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছিল। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের প্রায় এক হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে আবারও ব্যবসা চাঙ্গা হবে বলেও আশা করছেন তাঁরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









