দেশজুড়ে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু এবং হাম ও এর উপসর্গের সংক্রমণ। জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
অন্যদিকে সর্বশেষ ২৪ ঘন্টায় হাম রোগের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরও পাঁচজন শিশু। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১০৭ দিনে হাম ও রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৪ জনে। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ৯৩ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৬৩১ জন। একই সময়ে ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে আরো ৯৬৫ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫৪ জন শিশুর শরীরে। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ দুই হাজার ৯৯৩ জনে আর ১২ হাজার ২৮৬ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ২৭৯ জনে।
ডেঙ্গুতে সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল আশঙ্কা করছেন, চলতি জুলাই ও আগামী আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়তে পারে। তবে তা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, থানা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গুর এনএসওয়ান পরীক্ষার কিট পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগী বাড়লে চালু হবে হাসপাতাল।
তিনি জানান, গত দুই মাস ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উপজেলা, জেলা ও থানা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এনএসওয়ান পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হয়েছে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের হাসপাতালগুলোও রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে মানুষকে বাড়ির আশেপাশে পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আগামী সাতদিনের মধ্যে বিশেষ ধরনের মেডিকেল ট্যাবলেট সংগ্রহ করা হবে, যা জমে থাকা পানিতে ব্যবহার করলে লার্ভা দ্রুত ধ্বংস হবে।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে তিনি বলেন, প্লাজমা লিকেজের কারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দৈনিক চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরি করে মোবাইল ফোন ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জ্বর কমে গেলেও রোগী পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না।
বাড়ছে ডেঙ্গু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৯ জন আর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ২৬৭ জনে, যাদের মধ্যে কেবল জুনেই ভর্তি হন দুই হাজার ৯০৭ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন পাঁচ হাজার ৭৯৩ জন। আক্রান্ত রোগীদের ৬২.২ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭.৮ শতাংশ নারী এবং মৃতদের ৫২.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৪৭.৪ শতাংশ নারী।
বেড়েই চলেছে হামের প্রাদুর্ভাবও: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত বুধবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত পাঁচজন শিশুর তিনজনই ঢাকা বিভাগের। অন্য দুজনের একজন করে বরিশাল ও সিলেট বিভাগের। জেলা হিসেবেও ঢাকায় সবচেয়ে বেশি তিনজন শিশু মারা গেছে। ওই একদিনে হামের লক্ষণ নিয়ে ৯০২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের ৩৭২ জন চিকিৎসাধীন ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে।
এরপর আছে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৮০ জন, বরিশাল বিভাগের ১০৩ জন, খুলনা বিভাগের ৪১ জন, সিলেট বিভাগের ৮৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের ৫৮ জন, রাজশাহী বিভাগের ৪৪ জন এবং সবচেয়ে কম ১৭ জন ভর্তি হয়েছে রংপুর বিভাগে।
অন্যদিকে, বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুসারে, ওই একদিনে সবচেয়ে বেশি ৪৩১ জন সন্দেহজনক ও ৬৫ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮১ জন সন্দেহজনক ও ৪০ জন নিশ্চিত, বরিশালে ১০৩ জন সন্দেহজনক ও ১০ জন নিশ্চিত, সিলেটে ৯২ জন সন্দেহজনক ও ১৫ জন নিশ্চিত, ময়মনসিংহে ৫৬ জন সন্দেহজনক ও সাতজন নিশ্চিত, রাজশাহীতে ৪১ জন সন্দেহজনক, খুলনায় ৪১ জন সন্দেহজনক ও চারজন নিশ্চিত এবং রংপুরে ২০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৮৭৭ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৮৬ হাজার ৪১১ জন শিশু, যাদের ৮২ হাজার ৭৫৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩২৯ জন ও আক্রান্ত হয়েছে ৫৫ হাজার ২৫২ জন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









