চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংযোগ (ডাইরেক্ট কানেক্টিভিটি) প্রতিষ্ঠা এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমবিসি) উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন বিকল্প অনুসন্ধানে সম্মত হয়েছে ঢাকা ও বেইজিং।
চীনের মতে, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নতুন কৌশলগত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনের অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আরো জানিয়েছেন, চীন যেকোনো দেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে বাংলাদেশের পাশে আছে চীন।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় চীনা দূতাবাস আয়োজিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সেদেশের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২২-২৬ জুন চীন সফরের ফলাফল তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের নেতারা আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে নতুন বিকল্প অনুসন্ধানে সম্মত হয়েছেন। এর মধ্যে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নের বিষয়ও রয়েছে।
তার ভাষায়, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো চীন–বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে উন্নীত করে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন চীন–বাংলাদেশ সম্প্রদায় গঠনের সিদ্ধান্ত। তার মতে, এটি এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিফলন এবং আগামী স্বর্ণালী পঞ্চাশ বছরের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করেছে।
ইয়াও ওয়েন জানান, সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক হয়। দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন, একাধিক সহযোগিতা দলিলে সইয়ের সাক্ষী থাকেন এবং সফর শেষে একটি যৌথ কমিউনিকে প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময়, সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপ ব্যবস্থা গঠন এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক '২+২' সংলাপ কাঠামো চালুর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা হবে।
রাষ্ট্রদূত জানান, উভয় দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা সম্প্রসারণ, উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় এবং সবুজ ও নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল, অর্থায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় পর্যায়ের (সাবন্যাশনাল) সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। বন্দর ও পানি সম্পদ উন্নয়নসহ বড় প্রকল্পগুলোও এগিয়ে নেয়া হবে।
বিনিয়োগ সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ চীনে তাদের প্রথম বিদেশী বিনিয়োগ কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে বলে জানান ইয়াও ওয়েন। এছাড়া বিনিয়োগ ফোরামে চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন উন্নয়নসংক্রান্ত চুক্তি এবং মোংলা পোর্ট ইকোনমিক জোন-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। পাশাপাশি মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প যৌথভাবে এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা কাঁঠাল রফতানির জন্য উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ (ফাইটোস্যানিটারি) প্রটোকল এবং বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা (জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান) সই হয়েছে। এর কার্যকর বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে চীন।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে পানি সম্পদ পরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং এ খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে। নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে চীন এ প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা করবে।
পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে একটি সরকারি দ্বিপক্ষীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে চীন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পুনরায় এক-চীন নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বহুপক্ষীয় সহযোগিতা প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। চীন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (জিডিআই) গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক এগিয়ে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সফরে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত সহযোগিতা আরো গভীর হবে এবং এর সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল— আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর, স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন প্রত্যাখ্যান করবে। আপনি কি এটি ব্যাখ্যা করতে পারেন? জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের বৈদেশিক নীতি হলো—চীন যেকোনো দেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। চীন নিজেও একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। অনেক বিদেশি অপশক্তি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায়। এমনকি এখনও আমরা কিছু মহলের দ্বারা একই ধরনের অপচেষ্টার সম্মুখীন হচ্ছি। আপনাদের এটি বুঝতে হবে। তাই বাংলাদেশ বর্তমানে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি।
রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, কাজেই বাংলাদেশের কাছে এই বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে চীন বাংলাদেশের পাশে আছে। গত ৫০ বছর ধরে এটাই আমাদের নীতি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









