দেশে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে দিনেরাতে পুশইনের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বিএসএফ। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তেও বাংলাদেশের কঠোর নজরদারির কারণে নতুন করে ঢুকতে পারছে না সে দেশের নিপীড়িত রোহিঙ্গারা। এতে বোঝা যায়, সীমান্ত এলাকাগুলো একেবারেই সুরক্ষিত ও নিশ্ছিদ্র। তবে এই নিশ্ছিদ্র সীমান্তেরই ‘সছিদ্র’ রূপ দেখা যায় মাদক পাচারের বেলায়। একটি-দুটি নয়, সীমান্তজুড়ে মাদক আনার এমন ১৫০টি অরক্ষিত পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
মিয়ানমার ও ভারতের বিস্তীর্ণ সীমান্ত ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো বাংলাদেশকে মাদকের ট্রানজিট ও বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দেশে ঢুকছে এসব মাদক। সীমান্ত এলাকাগুলোকে মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি অনুযায়ী তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে— পশ্চিম সীমান্ত, উত্তর সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্বের মিয়ানমার সীমান্ত। এর মধ্যে পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে মূলত ফেনসিডিল, হেরোইন ও অন্যান্য মাদক দেশে ঢোকে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ঢোকে ইয়াবা ও ভয়ংকর মাদক ক্রিস্টাল মেথ (আইস)। ভারত থেকে হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত-অপ্রচলিত মাদক আসছে। এই পয়েন্টগুলো দেশের ১৮টি সীমান্তবর্তী জেলার মধ্যে পড়েছে। আর সীমান্তের এসব পয়েন্ট অরক্ষিত থাকায় সহজেই দেশে মাদক আসছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন রুটে মিয়ানমার ও ভারত থেকে মাদক আসায় ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান আইস বা ক্রিস্টাল মেথ (মেথএমফিটামিন) আসার পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে। চিহ্নিত মাদক স্পটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা ও আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী ১৮টি জেলার অন্তত ১৫০টি সক্রিয় পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন দেশে ঢুকছে কোটি কোটি টাকার মাদক। আর এসব মাদকের সবচেয়ে বড় গন্তব্য ও বাজার হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। বর্তমানে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৮২ লাখ ছাড়িয়েছে, যার একটি বড় অংশই হলো ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী।
মাদকসেবীদের মধ্যে নারী-শিশুও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি মাদকসেবী ঢাকায়। মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান, কড়াকড়ির পরও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না। ফলে মাদক এখন গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায়ও উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের রাসায়নিক বা সিনথেটিক মাদকের বিস্তার। ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স’ (এনপিএস) নামে পরিচিত এমডিএমএ, এলএসডি, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ট্যাপেন্টাডল, বুপ্রেনরফিন এবং ‘কুশ‘-এর মতো উচ্চঝুঁকির মাদক দ্রুত দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবারিরা শুধু নতুন ধরনের মাদকই আনছে না, বিক্রির কৌশলেও বড় পরিবর্তন এনেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ, অনলাইন ব্ল্যাকমার্কেট এবং ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করছে। অনলাইনে মাদক কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথও মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, সম্প্রতি এমডিএমএ, কেটামিনসহ বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। আরো নতুন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু অভিযান নয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া মাদকের চক্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রাসায়নিক মাদক সেবন ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বড় অংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। তারা মাদকের জালে আটকে পড়ায় পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি অপরাধও বাড়ছে। মাদকাসক্ত অনেক তরুণ ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ডিএনসির উপপরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, পরিবার যদি সন্তানদের সময় দেয়, নজরদারি ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে অনেক তরুণকে মাদক থেকে দূরে রাখা সম্ভব। সেই সচেতনতাই তৈরি করতে হবে।
ডিএনসির সর্বশেষ প্রকাশিত ‘বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৫’-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের তিনটি প্রধান মাদক উৎপাদন অঞ্চল গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমার ও ভারতের বিস্তীর্ণ সীমান্ত ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো বাংলাদেশকে মাদকের ট্রানজিট ও বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সবচেয়ে বেশি মাদক দেশে ঢুকছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোকে মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি অনুযায়ী তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে—পশ্চিম সীমান্ত, উত্তর সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্বের মিয়ানমার সীমান্ত। এর মধ্যে পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে মূলত ফেনসিডিল, হেরোইন ও অন্যান্য মাদক দেশে ঢোকে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ঢোকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস)।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই এসব রুট সম্পর্কে অবগত। কিন্তু জনসচেতনতার অভাব, স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের সহযোগিতা, তথ্য গোপন এবং মাদক কারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে কার্যকরভাবে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় অভিযানের আগেই তথ্য পেয়ে যায় কারবারিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত পশ্চিমে সীমান্তের সাতক্ষীরার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কাকডাঙ্গা ও পলাশপুর; যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর ও শার্শা; চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা, দর্শনা ও জীবননগর; মেহেরপুরের দরিয়াপুর ও বুড়িপোতা; রাজশাহীর মনিগ্রাম, চারঘাট, সারদাহ, ইউসুফপুর, কাজলা, বেলপুকুরিয়া, হরিপুর, গোদাগাড়ী, বাঘা ও রাজশাহী সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, বিনোদপুর, সোনামসজিদ স্থলবন্দর ও কানসাট; জয়পুরহাটের পাঁচবিবি; দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, কামালপুর, বিরল, আশকারপুর, খানপুর, দাইনুর, মালিগ্রাম ও বানতারা; সিলেটের জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার করিমপুর, কসবা, আখাউড়া, সিংগারবিল, পাহাড়পুর ও বিজয়নগর; কুমিল্লার জগন্নাথ দিঘি, চৌদ্দগ্রাম, গোলাপশা, কালিকাপুর, জগন্নাথপুর, রাজাপুর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও বিবিরবাজার এবং ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরামকে মাদক চোরাচালানের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তর সীমান্তে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, বাঁশজানি, বলরহাট, বালাবাড়ী, কুটি চন্দ্রখানা, পাথরডুবি ও নাখারগঞ্জ; লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম ও বুড়িমারী; শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দাকেও ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বের মিয়ানমার সীমান্তের মাদক পাচারের সক্রিয় রুট টেকনাফের জালিয়াড়া, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ সদর, সাবরাং, দক্ষিণপাড়া, ধুনধুমিয়া, জোডিপাড়া, দক্ষিণ হ্নীলা, লেদাপাড়া, চৌধুরীপাড়া, নয়াপাড়া, হোয়াইক্যং, তমব্রু, উখিয়া, কাটাখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, কুতুপালং এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এসব সীমান্তপথে অভিযান চালিয়ে গত এক বছরে প্রায় ৩৩৭ কেজি হেরোইন জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা বড়ি, ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৪০ বোতল ফেনসিডিল এবং ৯৬ হাজার ৩৫৭ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ডিএনসির করা মামলার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই গাঁজাসংক্রান্ত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রতিবেদনে ইয়াবা ও আইসের (ক্রিস্টাল মেথ) উৎপাদনকেন্দ্র এবং বাংলাদেশে প্রবেশের পথও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ ইয়াবা চীন-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী শান ও কাচিন রাজ্যের সংলগ্ন এলাকায় এবং মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি গোপন পরীক্ষাগারে উৎপাদিত হয়। নাফ নদ ও উপকূলীয় এলাকা এসব মাদকের অন্যতম প্রধান উৎসপথ। ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত, বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্ত, ইয়াবা প্রবেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করিডর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ইয়াবার পাশাপাশি আইসের ব্যবহারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জব্দকৃত মাদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে প্রথমবারের মতো আইস জব্দ করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে ১৮৬ দশমিক ৬৩২ কেজি, ২০২৪ সালে ১১২ দশমিক ৩৪৪ কেজি এবং ২০২৫ সালে ২০ দশমিক ৪৪২ কেজি আইস জব্দ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও মাদকের অপব্যবহার এখন দৃশ্যমান। সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলা বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদকের বিস্তারে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। সচ্ছল পরিবারের কিছু বিপথগামী তরুণ নতুন ও উচ্চমাত্রার মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে এসব মাদক সহজে সংগ্রহ করা যাচ্ছে। তবে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক এখনো গাঁজা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে মেথামফেটামিন, হেরোইন এবং কোডিনভিত্তিক সিরাপ।
২০২৫ সালে জব্দ করা মাদকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে বড় মাদকবাজার ঢাকা। এছাড়া সবচেয়ে বেশি মাদকপ্রবণ জেলার তালিকায় রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, ফরিদপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা।
সার্বিক বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ এদিনকে বলেন, যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে মাদক পাচার হচ্ছে, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে তথ্য জানানো হচ্ছে, যাতে তারাও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। একই সঙ্গে মাদক পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কোনো মাদক স্পট নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনুসারে মাদকের স্পটের বিভিন্ন সংখ্যা অনেকেই বলে থাকেন। সে হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে মাদক বেচাকেনার জন্য স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৪৭টি স্থান। এ ছাড়া এসব মাদক কারবারের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের অন্তত ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদক প্রবেশ করছে। এর মধ্যে সম্প্রতি মেরুল বাড্ডার কাঁচাবাজার এলাকায় মাদকের নতুন স্পট চোখে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। বাড্ডা থানা ভবন থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরত্বে এই কাঁচাবাজার রোডে এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবা বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় পুলিশও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
অন্যদিকে সায়েদাবাদ জনপথের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের একটি রিকশা গ্যারেজ ঘিরে আরেকটি নতুন মাদক স্পটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, জনপথের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে সেই রিকশা গ্যারেজ। রিকশার গ্যারেজ হলেও এটি মূলত মাদকের আস্তানা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজের আড়ালে এখানে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা কেনাবেচা চলে। এমনকি যাদের রিকশার চালক হিসেবে এখানে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের সংশ্লিষ্ট থানার এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর পরও এই মাদক স্পটটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাভিত্তিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশ মাদকের অন্যতম প্রধান ও উন্মুক্ত হটস্পট। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা এখন মাদকের বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। মিরপুর ও পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, বাউনিয়া বাঁধ, আদর্শনগর, আগারগাঁওয়ের বস্তি এলাকা মাদকের পুরনো ও অন্যতম বড় স্পট। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি এবং গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকাও মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার অন্তত তিনটি মাদক স্পটকে অনেকটা মাদকের হাট হিসেবে ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টাই খোলাবাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় এসব স্পটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানও চালায়, কিন্তু তার পরও চলছে মাদক কেনাবেচা। এই তিনটি হটস্পটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের বসবাস কেন্দ্র মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি রাজধানীর সবচেয়ে ভয়াবহ মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড এবং হুমায়ুন রোড এলাকায় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবা-হেরোইন বিক্রি করা হয়। এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদক-ছিনতাইকারী চক্র ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপরও হামলা চালায়।
এদিকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন এলাকা আরেকটি ‘মাদকের বাজার’হিসেবে পরিচিত। ভাসমান খুচরা বিক্রেতারা এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। পাশাপাশি রেললাইনের আশপাশে এখানে মাদকসেবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাও বসে। এ ছাড়া মিরপুরের বিহারি ক্যাম্পগুলো আরেকটি অন্যতম প্রধান মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। এই ক্যাম্পগুলোতে রাতে হাঁকডাক ছেড়ে মাদক বিক্রি হয়। ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে থাকতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









