দেশজুড়ে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু এবং হাম ও এর উপসর্গের সংক্রমণ। হাম ও ডেঙ্গুর উপসর্গ খুব কাছাকাছি হওয়ায় অভিভাবকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এতে রোগ শনাক্তে দেরি হচ্ছে এবং বাড়ছে জটিলতা। চিকিৎসকদের পরামর্শ, তিনদিনের বেশি জ্বর থাকলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হতে হবে। এদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘন্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ২৭১ জন, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৮৭১ জনে, মৃতের সংখ্যা আগের মতোই ১৯ জন।
আর হাম রোগের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরও সাতজন শিশু। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১১২ দিনে হাম ও রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩৮ জনে। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ৯৩ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৬৪৫ জন। ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে আরো ৯২৫ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে আর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১০৬ জন শিশুর শরীরে।
এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৬১৮ জনে আর ১২ হাজার ৬৩২ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার ২৫০ জনে।
বাড়ছে জটিলতা: জ্বর, শরীরে র্যাশ, ব্যথা এবং দুর্বলতা এরকম সব উপসর্গ দেখা দিলে, অভিভাবকদের প্রথম চিন্তা হচ্ছে হাম। কিন্তু একই সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলমান। এই পরিস্থিতিতে, একই ধরনের প্রাথমিক লক্ষণের কারণে বিভ্রান্তিতে পড়ছেন অভিভাবকরা। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাম এবং ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুদের লক্ষণ প্রায় একই। কারও জ্বর থেকে র্যাশ দেখা দিয়েছে, আবার কারও তীব্র জ্বরের সঙ্গে নিউমোনিয়ার উপসর্গও রয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, দুটিই ভাইরাসবাহিত রোগ, উপসর্গও অনেকটা কাছাকাছি। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, র্যাশের ধরণ, চোখের সংক্রমণসহ কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণের দিকে। তাই তিনদিনের বেশি তীব্র জ্বর আসলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
চিকিৎসকেরা জানান, যে শিশুদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে, তাদের মধ্যে প্রতি দশজন শিশুর অন্তত দুজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘যদি জ্বর বেশি হয়, অর্থাৎ তাপমাত্রা ১০৩ বা ১০৪ ডিগ্রি হয়, তাহলে সেটি স্বাভাবিক জ্বর নয়। তখন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে আমাদের কাছে আসা শিশুদের পরীক্ষা করলে ৫ বা ১০ জনের মধ্যে দু-একজনের শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ছে।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতের কথা বলেন চিকিৎসকরা। হাম প্রতিরোধে শিশুদের সময়মতো টিকা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতেরও পরামর্শ দেন তারা।
টিকাদানের গাফিলতিতে হামের সংক্রমণ: দেশে চলতি বছরের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। কিন্তু তখন এ প্রকোপ মোকাবিলায় কোনো প্রচেষ্টাই নেওয়া হয়নি। মারাত্মক ভাইরাসজনিত এ রোগের সংক্রমণ বাংলাদেশ একেবারেই কমে এসেছিল। গত প্রায় সাত বছরে কোনোবারই হামে ৪০০–এর বেশি সংক্রমণ হয়নি কোনো বছর। আর মৃত্যু তো ছিলই না। এর কারণ ছিল নিয়মিত টিকাদান। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দিতে চরম অবহেলা করা হয়। এ কারণেই এবারের হামের এত সংক্রমণ ও মৃত্যু। জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকাদানে অবহেলার কথা বলেছে তাদের একাধিক প্রতিবেদনে।
টিকাদানে সফল বিবেচিত বাংলাদেশে হামে এত সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। টিকাদানের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত মে মাসে বলেছিলেন, হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ।
হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের মুখে গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০টি স্থানে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়। আর ১৫ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপরও হামের প্রকোপ যেমন কমেনি, তেমনি কমেনি শিশুর মৃত্যু। প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে হামকে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার দাবি জানান জনস্বাস্থ্যবিদরাও। তবে সরকার এসব উদ্বেগে কর্ণপাত করেনি।
এদিকে সরকারের হামের টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তত ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে গেছে। সরকারের সাম্প্রতিক ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের আওতায় যত শিশু পৌঁছেছিল, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত তার তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ কম শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ঘাটতি দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকার একটি কারণ হতে পারে।
দ্বিগুণ হারে বাড়ছে ডেঙ্গু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত শনিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল রবিবার সকাল আটটা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২৭১ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৩ জন করে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের। এছাড়া সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে ৪৫ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৩০ জন, উত্তর সিটিতে ২৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে সাতজন, রাজশাহী বিভাগে চারজন ও সিলেট বিভাগে দুজন রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ৮৭১ জন। কেবল জুনেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৯০৭ জন। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় ২৭৪ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ছয় হাজার ৪০৪ জন। আক্রান্ত রোগীদের ৬১.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮.৪ শতাংশ নারী এবং মৃতদের ৫২.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৪৭.৪ শতাংশ নারী।
বেড়েই চলেছে হামের প্রাদুর্ভাবও: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত শনিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল রবিবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত সাতজন শিশুর চারজনই ঢাকা বিভাগে এবং সিলেট, বরিশাল ও খুলনা বিভাগে একজন করে শিশু মারা গেছে। জেলা হিসেবেও ঢাকায় সর্বোচ্চ চারজন শিশু মারা গেছে। ওই একদিনে হামের লক্ষণ নিয়ে ৮৭৮ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের ৩৩৪ জন চিকিৎসাধীন ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে। এরপর আছে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৮৯ জন, বরিশাল বিভাগের ১২৮ জন, খুলনা বিভাগের ৪৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের ৫১ জন, সিলেট বিভাগের ৭৯ জন, রাজশাহী বিভাগের ৩৮ জন এবং সবচেয়ে কম ১০ জন ভর্তি হয়েছে রংপুর বিভাগে।
অন্যদিকে, বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুসারে, ওই একদিনে সবচেয়ে বেশি ৩৮৪ জন সন্দেহজনক ও ৫৬ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৯ জন সন্দেহজনক ও ৪২ জন নিশ্চিত, বরিশালে ১২৮ জন সন্দেহজনক, খুলনায় ৪৯ জন সন্দেহজনক, ময়মনসিংহে ৫১ জন সন্দেহজনক ও আটজন নিশ্চিত, সিলেটে ৭৯ জন সন্দেহজনক, রাজশাহীতে ৩৫ জন সন্দেহজনক এবং রংপুরে ১০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯০৪ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৮৮ হাজার ৮৪৪ জন শিশু, যাদের ৮৫ হাজার ১২২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৩৫ জন ও আক্রান্ত হয়েছে ৫৬ হাজার ৫২৫ জন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









