সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রায় ১১ শতাংশ বাসাবাড়িতেই ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। মোট লার্ভার অধিকাংশই মিলেছে বাসাবাড়ির ভেতর ও চারপাশের নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রে। এতে ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে রয়েছে নগরবাসী। সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত লার্ভার সিংহভাগই মিলেছে বাসাবাড়ির প্লাস্টিক ড্রাম, পানির বালতি, ফুলের টব এবং টবের নিচের ট্রেতে। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করায় এসব পাত্র এখন মশার নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশন-এর পক্ষ থেকে ছিটানো অষুধের মান নিয়েও জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। অবশ্য সিসিক কতৃপক্ষের দাবি, ওষুধের মান নয়, বরং ছিটানোর প্রক্রিয়া ও জনবল সংকটের কারণেই ওষুধের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা না হলে সিলেট নগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।
সিটি কর্পোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এডিস মশার বিরুদ্ধে তাদের চিরুনি অভিযান অব্যাহত আছে। তবে নাগরিকদের এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া ডেঙ্গ মোকাবিলা প্রায় অসম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার পর্যন্ত সিলেটর বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাকাত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ১২ জন, সুনামগঞ্জে ১৪ জন, মৌলভীবাজারে ৬ জন, হবিগঞ্জে ৩২ জন এবং অন্য জেলার ৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনের ৫৯৩টি বাসাবাড়ির মধ্যে ৬২টিতে, অর্থাৎ ১১ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপ চালানো এসব বাসাবাড়ির বেশিরভাগই জমে থাকা পানিতে, অর্থাৎ প্লাস্টিক ড্রাম, পানির বালতি, ফুলের টব এবং টবের নিচের ট্রেতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।
সিসিকের স্বাস্থ্য শাখার তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডের প্রায় ১০ লাখ মানুষের সুরক্ষায় মশক নিধনে কাজ করছেন মাত্র ৪০ জন কর্মী। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ওয়ার্ডে একজন কর্মীও নেই। আবার এই কর্মীদের একটি বড় অংশই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন এবং মশক নিধনের কাজে তাদের তেমন কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। যদিও সিসিক কর্তৃপক্ষের দাবি, মাঠে নামানোর আগে এই কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে।
জনবল সংকট ও দক্ষ কর্মীবাহিনীর অভাবে মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তিনি এদিনকে জানান, অপর্যাপ্ত লোকবলের কারণে নগরীর সবকটি ওয়ার্ডে একসঙ্গে একযোগে মশক নিধন অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে মশার সাথে রীতিমতো এক ‘‘লুকাচুরি’’ খেলা তৈরি হয়েছে। যখন একটি ওয়ার্ডে ওষুধ ছিটানো হয়, তখন মশাগুলো উড়ে পাশের অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
পরবর্তীতে ওই ওয়ার্ডে ওষুধ দিলে মশা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। মূলত এই সমন্বয়হীনতার কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে, ‘‘এখন আর ওষুধে মশা মরে না’’। তার দাবি, ওষুধের মান নয়, বরং ছিটানোর প্রক্রিয়া ও জনবল সংকটের কারণেই ওষুধের কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
এডিস মশার বংশ সম্পূর্ণ নির্ম‚ল করতে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, খন্ড খন্ড অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গুর এই ভয়াবহতা রোধ করা সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজনন চক্র ধ্বংস করতে হলে পর্যাপ্ত জনবল নিয়ে পুরো নগরীতে টানা দুই মাস একযোগে ওষুধ ছিটানোর বিশেষ কর্মসূচি পালন করা জরুরি।
ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি যাতে তারা সপ্তাহে দুবার তাদের নিজ নিজ বাসস্থান পরিষ্কার করে। পাশাপাশি আমাদের মশন নিধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব নয়। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাসা বাড়িতে বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা বৃষ্টি ও এসির পানি দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। এখনই সচেতন না হলে ডেঙ্গু শীতকালে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









