টানা বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আবার পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে; এতে অন্তত আটজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল বুধবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-‘এ’তে মেয়েদের একটি হেফজ খানার (মাদ্রাসা) ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। মাটিচাপা পড়া ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনকে ভর্তি করা হয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালে। অপরদিকে চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুসহ ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি ও সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে এই দুই দুর্ঘটনা ঘটে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সাতজন শিক্ষার্থী এবং একজন শিক্ষক। তবে আহতের সংখ্যা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেননি আরআরআরসি। তিনি বলেন, কতজন আহত হয়েছেন, সেটি এখনই বলতে পারছি না। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা সেখানে উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। ঘটনাস্থলে এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার পরপর ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) দিল মোহাম্মদ বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দিল মোহাম্মদ বলেন, ভূমিধসের সময় হিফজ খানার ভেতরে ৩০ জনের বেশি ছাত্রী ছিল। এখন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত ৮ জনের লাশ উদ্ধারের কথা জানতে পেরেছি। উদ্ধার কাজ চলছে, তবে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন— রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) এবং উমাইসা বিবি (১৩)। রাশিদা থাকত ক্যাম্প-৫-এর এ-১১ ব্লকে। তার বাবা হাসিম উল্লাহ ও মা রফিকা বেগম। উম্মে নেজাতুল ও উম্মে সালমা দুই বোন। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এর এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুর ও মা সাদেকার মেয়ে। আর নিহত উমাইসা বিবি ক্যাম্প-৫-এর এ-৮ ব্লকের মোহাম্মদ ইলিয়াছের মেয়ে। আহতদের মধ্যে আছে আসরা (৯), বেগম জান (১৫) ও ফারেসা বিবি (১২)।
রোহিঙ্গা মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। হিফজ খানার ভেতরে আরো অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. মোস্তাফা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী দ্রুত বেরিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পাহাড়সংলগ্ন একটি কক্ষে থাকা কয়েকজন মাটিতে চাপা পড়ে।
ক্যাম্প-৫ এর বাসিন্দা মৌলভি ইউনুস জানান, মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল। ঠিক তখনই পাহাড়ের মাটি ধসে ভবনের ওপর এসে পড়ে। তার অভিযোগ, মাটি ভরাট করে পাহাড়ের গা ঘেঁষে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
এর আগে গত রবিবার গভীর রাতে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। এতে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) ও তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। দুর্ঘটনার সময় ঘরটিতে পরিবারের ১০ সদস্য অবস্থান করছিলেন। আহত এক কিশোরীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাত ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে মোহাম্মদ রশিদের ছেলে একরাম (৭) নিহত হয়।
এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন- উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরো একজন আহত হন। কয়েক ঘণ্টা পরই সোমবার ভোররাতে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে নিহত হন আলী আকবর নামে এক ব্যক্তি। একই পরিবারের আরো দুই সদস্য আহত হয়েছেন। এদিন বিকালে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলমের ঝিরি এলাকায় পাহাড় ধসে ঘরের ভেতর মাটিচাপা পড়ে মারা যায় ৭ বছরের মিনহাজ।
চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুসহ ৩ জনের মৃত্যু
চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি ও সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে এ দুই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৯টায় জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় একটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম ওরফে তানভীরের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় ওই শিশুর মা লামিয়া আক্তার মাটিচাপা পড়ে আহত হন। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। নিহত শিশু আশরাফুল ইসলাম ওই এলাকার মঈন উদ্দিনের ছেলে।
তানভীরের মৃত্যুর বিষয়টি সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, চার দিন ধরে সীতাকুণ্ডে টানা হচ্ছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়েছে। তবুও অনেক বাসিন্দা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছেন। ইউএনও বলেন, গতকাল সকালে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূলের ৬ নম্বর সমাজে পাহাড়ধসের ঘটনা শুনে তিনি ঘটনাস্থলে যান। নিহত শিশুর মায়ের চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
এদিকে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে এই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের বায়েজিদ বোস্তামী ফায়ার স্টেশনের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, পাহাড়ধসে চাপা পড়ে শিশুটির মৃত্যু হয়। দুপুরে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









