আগামী হজে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রী পাঠানোকে কেন্দ্র করে চরম বিপর্যয়ের আশংকা করা হচ্ছে। অতীতের ধারাবাহিকতা ভেঙে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীর সংখ্যা হঠাৎ করে এক লাফে সাড়ে ৪ হাজার থেকে প্রায় ২০ হাজারে উন্নীত করার সিদ্ধান্তে এ বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, মধ্যবিত্ত নাগরিকরা সহজেই পবিত্র হজ পালন করতে পারেন সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আগামী বছর হজ প্যাকেজের খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আইনি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, শর্ত শিথিল এবং ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়ার মতো কিছু প্রশাসনিক প্রণোদনার কথাও ভাবছে সরকার। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং অভিজ্ঞ অংশীজনরা বলছেন, কেবল কাগজের ওপর প্রণোদনা বা আইনি শিথিলতা দেখিয়ে এই মহাসংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকারের এমন হঠাৎ সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়তে পারে। এ জন্য দীর্ঘদিনের প্রচলিত সিস্টেমকে হঠাৎ ওলটপালট করার পেছনে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কতিপয় ‘ফ্যাসিস্ট আমলার’ সুদূরপ্রসারী নীলনকশা রয়েছে বলে দাবি করেছে হাব।
কারণ, অতীতে যেখানে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার হজযাত্রী সামলাতেই সরকারি ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার নজির রয়েছে, সেখানে চার গুণ বেশি অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার হজযাত্রীকে কিভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে পুরো হজ খাতে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এদিকে রাতারাতি এ পরিবর্তন হলে প্রায় ৩,৭০০ কোটি টাকার ব্যবসা হাতবদল হওয়ারও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় অতীতের সাড়ে ৪ হাজার হজযাত্রীর সংখ্যাকে এবার মোট হজযাত্রীর ২৫ শতাংশে (প্রায় ২০ হাজার) উন্নীত করার উদ্যোগে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর কপালে।
সূত্র জানায়, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি ট্রাভেল ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন গভীর ঝুঁকির সম্মুখীন। বছরের পর বছর ধরে বেসরকারি এজেন্সিগুলো যে বাজার গড়ে তুলেছে, তা এক কলমের খোঁচায় ধূলিসাৎ করার এই প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা যায় না। হাবের সাধারণ সভায় ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের কারণে মাঠপর্যায়ে যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হবে, তা কাটিয়ে ওঠা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব। প্রায় ৩,৭০০ কোটি টাকার এই বিশাল বাণিজ্য থেকে বেসরকারি খাতকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে প্রকারান্তরে দেশের ট্রাভেল ও পর্যটন শিল্পের একটি বড় অংশকে পঙ্গু করে দেওয়ার উপক্রম করা হয়েছে। কারণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের মোট কোটার প্রায় ৭৪ হাজার হজযাত্রী প্রেরণ করে নিবন্ধিত বেসরকারি এজেন্সিগুলো। সে হিসাবে হজযাত্রী প্রতি গড়ে ৫ লাখ টাকা করে ধরলেও এ সংখ্যা ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হয়।
যদিও সরকার অবশ্য দাবি করছে যে তারা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্যাকেজের মূল্য কমানোসহ নানা ধরনের উদ্যোগ ও প্রণোদনা গ্রহণ করেছে। তবে এই পুরো পরিস্থিতিকে একটি সুপরিকল্পিত আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন বেসরকারি হজ ব্যবস্থাপনার শীর্ষ নেতৃত্ব।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) মহাসচিব ফরিদ আহমদ মজুমদার দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরে হজে বিভিন্ন ভিআইপি বা রাজনৈতিক কোটায় সরকারি খরচে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যাওয়ার অনৈতিক সুবিধা ও লুটপাট একেবারেই বন্ধ রয়েছে। ঠিক এ কারণেই সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় ফ্যাসিস্ট আমলা বর্তমান সরকারকে মাঠপর্যায়ে চরম বেকায়দায় ও অপদস্থ করতে এই বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীর কোটা এক লাফে ২০ হাজারে নেওয়ার এই ভয়ংকর নীলনকশা সাজিয়েছেন। তাদের মূল চাল হলো—সরকারকে ওপর মহলে বোঝানো যে এত বিপুলসংখ্যক হজযাত্রী সামলাতে হলে মাঠপর্যায়ে বিশাল আকৃতির ‘হজ গাইড’ এবং ‘সহায়ক টিম’র জন্য লোকবল প্রয়োজন হবে। আর এই বিপুল লোকবলের আড়ালে এবং সুযোগ নিয়ে আমলা, কর্মকর্তা ও তাদের পছন্দের ব্যক্তিরা সরকারি টাকায় সম্পূর্ণ ফ্রিতে সৌদি আরব ভ্রমণের মওকা খুঁজছেন।’
হাব মহাসচিব বলেন, ‘নতুন সরকারের সুন্দর একটি হজ ব্যবস্থাপনাকে এক মহা বিপদের মুখে ঠেলে দিতেই একটি চক্র সরকারের সংশ্লিষ্টদের ভুল বুঝিয়ে এ পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার যদি স্বাভাবিক নিয়ম মেনে মোট কোটার ২৫ শতাংশ হজযাত্রী তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিতে চায়, তবে এতে হাব বা সাধারণ বেসরকারি এজেন্সির কোনো ধরনের আপত্তি বা সমস্যা নেই। আমরা সব সময়ই সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং ২৫ শতাংশের এই কোটা একটি যৌক্তিক সীমার মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সেই যৌক্তিক প্রথাগত সীমা লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া, লজিস্টিকস সাপোর্ট নিশ্চিত না করে হুট করে যদি ২০ হাজার হাজিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়, তবে পুরো হজ প্রক্রিয়া নিয়ে সেখানে একটি চরম ও নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটবে। এটি কেবল আমাদের ব্যবসার ক্ষতি নয়, বরং আল্লাহর ঘরের মেহমানদের চরম ভোগান্তিতে ফেলার এক আত্মঘাতী আমলাতান্ত্রিক খেলা।’
তবে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলছেন ভিন্ন কথা। এদিনকে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হাজিরা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তারা ভালো সেবা পাচ্ছেন। এ জন্য সরকার এবার অন্তত চার ভাগের এক ভাগ হাজি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘সরকার কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনা করে বা কাউকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়নি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ হজযাত্রীদের জন্য হজের খরচ কমিয়ে আনা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর জনগণের যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষা করা।
অতীতে কী হয়েছে বা কতজন হজযাত্রী সামলানো গেছে, সেটি বড় কথা নয়; বর্তমান প্রশাসন অনেক বেশি গতিশীল এবং স্বচ্ছ। আমরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এই ২০ হাজার হজযাত্রীর আবাসন, যাতায়াত, মোয়াল্লেম ফি এবং মিনা ও আরাফাতের তাঁবু ব্যবস্থাপনা সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য শতভাগ প্রস্তুতি নিচ্ছি। সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে এবং হজ গাইড বা সহায়ক টিমের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সুবিধা কাউকে দেওয়া হবে না।’
যদিও হজ খাতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ বিশ্লেষক এবং ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরা এই বিশাল কোটা সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় নির্দিষ্ট হজ মৌসুমে ভালো মানের হোটেল বা বহুতল ভবন ভাড়া করা অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। যেখানে সারা বিশ্বের লাখ লাখ মুসলিম একত্র হন, সেখানে কয়েক মাস আগে থেকে নিখুঁত পরিকল্পনা ছাড়া আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব।
অতীতে যখন মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার হাজি সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেতেন, তখনই মক্কা-মদিনার দূরবর্তী স্থানে নিম্নমানের বাড়ি ভাড়া করা, মিনার তাঁবুতে জায়গার সংকট হওয়া এবং সঠিক সময়ে খাবার ও চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার মতো অসংখ্য অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত শিরোনাম হয়েছে। সেই তিক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্ন জাগে, যে প্রশাসন অতীতে ৫ হাজার হাজির ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা ও সেবার মান ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, তারা কোন অলৌকিক ক্ষমতাবলে রাতারাতি চার গুণ বেশি অর্থাৎ ২০ হাজার হাজির বিশাল বহরকে মক্কা ও মদিনার পবিত্র ভূমিতে সঠিক সেবা দিতে পারবে? সরকারি আমলাতন্ত্রের যে মন্থর গতি এবং ফাইলের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, তাতে সৌদি আরবের মতো একটি কঠোর নিয়মের দেশে শেষ মুহূর্তে আবাসন ও মোয়াল্লেম চুক্তি সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এর ফলে বিমান শিডিউল বিপর্যয়, মক্কায় পৌঁছানোর পর হাজিদের বাসস্থান নিয়ে চরম ভোগান্তি এবং মিনায় তাঁবু ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া অবধারিত। এ ধরনের প্রশাসনিক ম্যাসাকার বা বিপর্যয় তৈরি হলে তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ওপরই বর্তাবে। আমলারা কেবল তাদের ফাইল কেবিনেটে বসে সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ের তপ্ত বালুতে হাজিদের যে কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। তাই হজের মতো একটি সংবেদনশীল ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে জেদের বশবর্তী না হয়ে বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
দেশের ভাবমূর্তি এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ-অনুভূতির কথা বিবেচনা করে, হাবের প্রস্তাবিত ২৫ শতাংশের যৌক্তিক কোটা পুনর্বহাল করা এবং বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের ওপর আস্থা রাখাই এই মুহূর্তে সংকটের একমাত্র সমাধান হতে পারে। অন্যথায়, এটি কেবল ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক বিপর্যয়ই ডেকে আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনার সুনামকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এদিকে দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় খুবই কমসংখ্যক হাজি যাচ্ছেন। বাংলাদেশের হজযাত্রীর মোট কোটা এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর এ কোটা আর পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরে দেশের হজযাত্রীর নির্ধারিত কোটা পূরণ হয়নি। গত ২৬ মে অনুষ্ঠিত হজে দেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন পবিত্র হজ পালনে যান। এর মধ্যে শুধু বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমেই যান ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় যান মাত্র চার হাজার ৫৬৫ জন, যা বেসরকারি এজেন্সির হাজির তুলনায় ১৬ ভাগের এক ভাগ মাত্র।
এ প্রেক্ষিতে হাব মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনা আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যবস্থাপনা এক নয়। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের ব্যবস্থাপনার সাথে আমাদের ব্যবস্থাপনায় অনেক তফাৎ রয়েছে। তাই বাংলাদেশ কোনো রকম বড় অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন কাজে হাত দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









