টানা বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার চকরিয়ার বরইতলী ও বান্দরবানের লামা আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় আবার পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। উখিয়ার বরইতলীতে মাটিচাপা পড়ে নিহত দুজনই শিশু। বসতবাড়ির ওপর আস্ত পাহাড় ধসে পড়লে ঘুমন্ত অবস্থায় তারা মাটির নিচে চাপা পড়ে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জেগে উঠে স্থানীয়দের সহায়তায় দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
আর লামার মিশনপাড়ায় এক পরিবারের শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা এবং ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। এ নিয়ে পাঁচদিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হলো।
এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় ছয়জন এবং গত রোববার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আটজন, জেলা সদরে একজন, পেকুয়ায় একজনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর বুধবার কক্সবাজারে পাঁচজন ও চট্টগ্রামে দুজন শিশু নিহত হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় দেওয়া বিবৃতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুও জানান, ভারি বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের চার জেলায় নিহত ৩০ জনের মধ্যে কক্সবাজারে ১৯ জন, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে পাঁচজন করে এবং রাঙ্গামাটিতে একজন মারা গেছেন। পাহাড়ধসে বারবার প্রাণহানির বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, 'খাসজমি ও অন্যান্য সরকারি জমিতে বাড়ি তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে সরকার প্রস্তুত। ভবিষ্যতে পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানান্তর উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করতে হবে।'
লামায় দুই পরিবারের ৫ জন : টানা বৃষ্টিতে বান্দরবানের লামা আজিজনগর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড মিশনপাড়ায় পাহাড়ধসে নিহতরা হলেন, মৃত আদম আলীর ছেলে মো. ইউনুস (২৮), তার স্ত্রী রানু আক্তার (২২) এবং নিহত ইউনুসের ছেলে মো. সোলেমান (৪)। তারা ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। আরেক পরিবার থেকে মারা যান মো. আলী হায়দারের ছেলে মো জুয়েল (৩৪) এবং জুয়েলের স্ত্রী কুলছুমা আক্তার(২৫)। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের হালিশহরের রামপুরায়। তারা মিশনপাড়ায় ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে উপজেলার এ ঘটনা ঘটে। পরে চারটার দিকে ঘটনা জানাজানি হলে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।
আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন মহরম জানান, ‘ভোর চারটার দিকে খবর পেয়ে ঘটনা স্থলে আসি। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করি।’ লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কায়ছার হামিদ জানান, মরদেহগুলোর সুরতহাল শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন জানান, ‘টানা বর্ষণের মধ্যে আমরা প্রতিনিয়ত পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছি।’
উখিয়ায় ঘুমন্ত দুই শিশুর প্রাণহানি : গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকে উখিয়ার বরইতলী মোহছনিয়া কাটা পাহাড়ি গ্রামে পাহাড়ধসে নিহত দুই শিশু হচ্ছে- মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে বরইতলী দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রূমি আকতার (১৫) ও আবদুল মজিদের ছেলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ ওয়াহিদুল ইসলাম তৌসিফ ( ১০)। তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই–বোন। স্থানীয়রা জানান, আবদুল মজিদ ও মোহাম্মদ কাজল দুই ভাই একই বসতঘরে বসবাস করেন। প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতেও দুই পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন।
টানা তিনদিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ের পাদদেশ নরম হয়ে যায়। বৃষ্টি বাড়লে রাত একটার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ বসতঘরের ওপর ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই শিশুর মৃত্যু হয়। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, পাহাড়ধসে নিহত দুই শিশুর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহত দুই শিশুর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় লোকজন বলেন, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় মহছনিয়াকাটা এলাকায় ব্যাপক পাহাড়কাটা হয়। এসব পাহাড়ের কিছু টিলা এখনো আছে। স্থানীয় লোকজন সেসব টিলার পাদদেশে বসতি গড়ে তোলেন। টানা বৃষ্টিতে সেসব টিলা-পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









