ঘণ্টাখানেক ভারী বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার কোমরসমান। বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। সৃষ্টি হয় দুঃসহ যানজট। কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী– সবাইকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। এত দিন এমনই ছিল রাজধানী ঢাকার বৃষ্টিচিত্র। তবে গত দুই দিনের টানা বর্ষণ যেন ছাড়িয়ে গেছে সবকিছুকে। বৃষ্টিতে পথঘাট ডুবে গিয়ে ভীতিকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পানির আতঙ্কে মনে হয়েছে, এই বুঝি নেমে এলো মহাপ্লাবন। মানুষের মনে যেন রীতিমতো ভর করেছিল ‘জলাতঙ্ক’। ডুবে গিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। পানির নিচে বিভিন্ন মোড়, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে যানবাহন, কোথাও বিকল হয়ে পড়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন। গতকাল সোমবারও সকাল থেকে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা পুরোপুরি কাটেনি। এই জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহপথ হারিয়ে যাওয়া।
রাজধানীতে টানা বৃষ্টিতে স্থবির জনজীবন
দ্বিতীয় দিনের মতো টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার পর নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দুঃসহ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে অফিসগামী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। সকালের দিকে আকাশ ছিল মেঘলা। বাতাসে আর্দ্রতা ও গুমোট আবহাওয়ার কারণে অস্বস্তি অনুভূত হলেও সকাল ৮টার পর শুরু হয় বৃষ্টি। বৃষ্টির প্রভাবে মিরপুর, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি, মগবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যানবাহনের গতি ধীর হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
এদিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা চলমান থাকায় শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়। অনেককে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। একই সঙ্গে অফিসগামী যাত্রীদেরও অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা স্থগিত করে অনলাইন ক্লাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে টানা বৃষ্টি ও যানজটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দিনমজুর, রিকশাচালক ও অন্যান্য খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও জীবিকার তাগিদে তাদের কাজে বের হতে হয়েছে।
২৭ ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি, বৃহস্পতিবার থেকে আরো বাড়তে পারে
টানা ঝরছে বৃষ্টি। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো ঝমঝমিয়ে। এর মাঝে কখনো কখনো দিচ্ছে স্বল্প বিরতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় গত ৫ জুলাই থেকে এই বৃষ্টি। গতকালের পূর্বাভাস অনুসারে, আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী বর্ষণে ঢাকা মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে ভারী ও একই সময়ে ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে অতি ভারী বর্ষণ বিবেচনা করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, ১৫ জুলাই (আগামীকাল) পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তুলনামূলক কম থাকবে। তবে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ১৬ জুলাই (বৃহস্পতিবার) থেকে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আবারও বাড়তে পারে।
ভারি বর্ষণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা হারিয়েছে ঢাকা
দুই দিনের অতিভারি বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও স্থানে পানি জমে জনজীবন কার্যত অচল ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারি ও অতিভারি বর্ষণে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারিয়েছে কংক্রিটের নগরী। জলাবদ্ধতা নিরসনে কৌশলগত পরিকল্পনায় থাকা রাজধানীর পাঁচটি স্থায়ী জলাধার বা ওয়াটার রিটেনশন পন্ডও সংরক্ষিত হয়নি। অনেক জায়গায় সংরক্ষণের আগেই গত আড়াই দশকে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়ে গেছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় ঢাকায় জলাবদ্ধতা আরো তীব্র রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
রাজধানীর এমন জলাবদ্ধতার ব্যাপারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয় এমন দিনের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু একদিনে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। বর্ষায় রাজধানীতে এমন ভারি ও অতিভারি বর্ষণ হলে সে পানি নিষ্কাশনের কোনো সহজ সমাধান দুই সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘রাজধানীতে ভারি বর্ষণ হলে বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে পানি নামতে সময় লাগছে। বিশেষ করে যে স্রোতে পানি নামার কথা তার নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেক জায়গাতেই নেই। আবার বৃষ্টির পানি কোথাও জমা হবে, কোথাও ভূগর্ভস্থ লেয়ারে চলে যাবে এমন সলিড মাটির পরিমাণও কমে এসেছে। ফলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে পরিকল্পনা করছি। আমরা নতুন রিটেনশন পয়েন্ট, আউটলেট পয়েন্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণের কথা ভাবছি।’
ক্রমাগত খোলা জায়গা, সবুজ ও জলাশয় কমার কারণে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আগামী দিনে আরো জটিল আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনবিদরা। তাদের ভাষ্যে, শুধু বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সংযোগপথই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং ভারি বৃষ্টি হলে সে পানি কোথায় গিয়ে জমা হবে সেজন্য স্থায়ী জলাধারও প্রয়োজন। ঢাকায় এমন পাঁচটি স্থায়ী জলাধার বা রিটেনশন পন্ড চিহ্নিত থাকার পরও সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে গত আড়াই দশকে এ রিটেনশন পন্ডগুলোর নির্ধারিত স্থানে অনেক স্থাপনা নির্মিত হয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য যে কয়টি জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো রিটেনশন পন্ডগুলো পুনরুদ্ধার করা। এগুলো শুধু বৃষ্টির পানিই ধারণ করবে না, বরং তাপ শোষণ, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ, জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ আরো অনেক কাজ করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এগুলো দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতার কারণ
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এখানে ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস। অথচ ওয়ার্ডগুলোর পানি নিষ্কাশনে মাত্র চারটি আউটলেট আছে। এর মধ্যে মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গায় যায় পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি। গ্রিন রোড, তল্লাবাগ ও পান্থপথ এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে যায়। এছাড়া যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডি এলাকার কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশন করা হয়। ফলে ঢাকায় টানা এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে ওই পানি একসঙ্গে মাত্র চারটি আউটলেট দিয়ে নিষ্কাশন সম্ভব নয়।
ঢাকার বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৫৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নগরীর বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ১৭ দশমিক ৭ মিলিমিটার। বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাত ও দৈনিক সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা সামান্য কমলেও বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত প্রকৃতি এবং তীব্র বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। ঢাকায় একদিনে সর্বোচ্চ ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। একই সময়ে দুদিনে সর্বোচ্চ ৪৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫৩ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ৪৭ বছরে মাত্র তিনবার একদিনে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। অথচ ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র ২৪ বছরে একই মাত্রার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় তিনবার। ১৯৮৮ সালে ওই জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার ২৬টি খালের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসাকে দেয় সরকার। তারপরও নগরের খালগুলো ক্রমেই বেদখল হয়ে যায়। অনেক খাল ভরাট করে গড়ে ওঠে বহুতল ভবন। পরিস্থিতির বেগতিক দেখে ২০২১ সালের ওই খালগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে ওয়াসা। কিন্তু এখন পর্যন্ত খালগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি। ফলে বৃষ্টি হলে শহরের পানি বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না।
জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আগে ঢাকার ভেতর অসংখ্য জলাশয় ছিল। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে একে একে তা দখল, ভরাট হয়ে গেছে। এখন বৃষ্টির পানি যাওয়ার জায়গা নেই। আবার গত ২০ বছরের মধ্যে ১৬ বছর ঢাকার খালগুলোর ওয়াসার অধীনে ছিল; পরে চার বছর সিটি করপোরেশনের কাছে। তারা জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্লু নেটওয়ার্কটা তৈরি করেনি। ওপর থেকে রহমতের বৃষ্টি পড়বে। এটা গড়িয়ে গড়িয়ে খাল হয়ে নদীতে যাবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পানি বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। তাই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে ব্লু নেটওয়ার্ক তৈরির বিকল্প নেই।
ডিএসসিসির জলাবদ্ধতার হটস্পট ও তা নিরসনে উদ্যোগ
ডিএসসিসিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগ। সম্প্রতি তারা ডিএসসিসির জলাবদ্ধতাপ্রবণ ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নায়েম রোড, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশী এস এম হলের সামনে, সাকুরা মার্কেট এলাকা, মোকাররম ভবনের সামনে, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কমলাপুর রেলস্টেশন, শাপলা চত্বর, নটর ডেম কলেজ এলাকা, পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, চানমারির মোড়, শান্তিবাগ, আলমবাগ, পশ্চিম জুরাইন এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সড়ক অন্যতম। গত রবিবার টানা বৃষ্টিতে ওই ২৯টি হটস্পট ছাড়াও আরো শতাধিক জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। পুরানা পল্টনের বাসিন্দা আসাদ তালুকদার বলেন, গতকাল বৃষ্টিতে পল্টনের প্রায় সব সড়ক ডুবে যায়। পানির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল, নৌকা চলবে। একটি দেশের রাজধানীর চিত্র এমন হতে পারে না। সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা নিতে হবে।
গত ৬ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে ডিএসসিসির উদ্যোগে ‘নাগরিক ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার হয়। সেমিনারের প্রথম সেশনের বিষয় ছিল ‘ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা: বাস্তবতা ও করণীয়’, যেখানে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণ, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানের উপায় নিয়ে। ওই সেমিনারের মূল প্রবন্ধে নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএসসিসি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানায়। কিন্তু এতে সব উদ্যোগের পরও কেন বৃষ্টিতে ঢাকা ডুবে তা জানতে চাইলে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘বর্ষায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা পারব না। এখন যেটা হলো, বৃষ্টির পানি ব্যাপারে আমরা বহুবার বলছি, ঢাকা শহরে খাল-বিলগুলো নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই ওপেন নিষ্কাশনের পানি অপসারণে সময় লাগে।’তিনি বলেন, ‘এখন বৃষ্টির পানি যেসব স্থানে জমে, সেগুলো দ্রুত সময়ে অপসারণে আমরা চেষ্টা করছি। তবে আমাদের পানি নদীতে নামার পথ কম। সেগুলো আমি বাড়াতে চেষ্টা করছি। এটা আমি করপোরেশনে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বলেছি। এ বছর কতটা সুযোগ দিতে পারব জানি না। তবে আগামী বছর হয়তো অনেকটা সুযোগ আসবে।’
ডিএনসিসিতে জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি
ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। এর মধ্যে মিরপুরের বিভিন্ন অংশ, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কালশী, আগারগাঁও, মহাখালী, বনানী, বাড্ডা, ভাটারা, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরের কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টির সময় পানি জমে থাকে। নিচু এলাকা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ এবং খাল-সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব স্থানে পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। গত রবিবারের বৃষ্টিতে ডিএনসিসির শতাধিক এলাকার সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। গতকাল সোমবার বনানীসহ ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। কিন্তু ড্রেন ও ম্যানহলের মুখ পরিষ্কার ছাড়া সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন-নালা পরিষ্কারসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে ডিএনসিসি। জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে রবিবার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ডিএনসিসি খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কার এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
অপরিকল্পিত উন্নয়নের জেরে জলাবদ্ধতা
টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমর সমান পানি। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক-সবখানেই জলাবদ্ধতার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন রাজধানীর বাসিন্দারা।
স্থানীয়রা বলেন, গত ১৭ বছরের উন্নয়নের ফসলই আজকের এই জলাবদ্ধতা। কাগজে-কলমে উন্নয়নের গল্প শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে দেখেছি ভাঙা রাস্তা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নর্দমা। শনির আখড়ার বাসিন্দা জহিরুল বলেন, রাজধানীতে বসবাস করছি—এটা ভাবতেই কষ্ট হয়। গত ১৭ বছরে রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো টেকসই উন্নয়ন হয়নি। নিয়মিত কর-খাজনা দিলেও আমরা নাগরিক সুবিধা পাইনি। রাস্তা সংস্কারের নামে লোক দেখানো কাজ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সিমেন্ট উঠে আবার রাস্তা ভেঙে গেছে। ড্রেনগুলো বছরের পর বছর ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকলেও সিটি করপোরেশনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না।
মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা নার্গিস আক্তার বলেন, ড্রেন পরিষ্কার না করে বারবার শুধু রাস্তা উঁচু করা হয়েছে। ফলে আমাদের বাড়িগুলো এখন রাস্তার চেয়ে নিচু হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই একতলা ডুবে যায়। বাসায় যাতায়াতই কঠিন হয়ে পড়ে। সারা বছর শিশুদের ঠান্ডা ও বিভিন্ন রোগে ভুগতে হয়। একই এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আমিনুল হক বলেন, আমি প্রায় ৪৫ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এরশাদ ও খালেদার আমলে কিছু উন্নয়ন হয়েছিল। এরপর আর তেমন উন্নয়ন চোখে পড়েনি। শুনেছি গত ১৭ বছরে ড্রেনেজ ও সড়ক উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু সেই উন্নয়ন কোথায়? সেই টাকা গেল কোথায়?
শ্যামপুর এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের বেশিরভাগ সময়ই রাস্তায় পানি জমে থাকে। টানা বৃষ্টিতে পুরো এলাকা হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। এই পানি মাড়িয়ে চলাচল করায় বাসিন্দারা ঠান্ডা, কাশি, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বহুবার সিটি করপোরেশনের হস্তক্ষেপ চাইলেও কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









