এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল করা কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স মুখোমুখি হবে সবচেয়ে কম গোল হজম করা লামিন ইয়ামালের স্পেনের। এমবাপ্পের দল বলছে, ‘সমীহ থাকলেও স্পেন-ভীতি নেই ফ্রান্সের।’ অন্যদিকে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের বিশ্বাস, বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবেন ইয়ামাল, যা সবার মনে ছাপ রাখবে। তাঁর ভাষায়, ‘লামিনের সেরা পারফরম্যান্স এখনো দেখা বাকি বিশ্ব-ফুটবলপ্রেমীদের।’
এবারের আসরে সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগের একটি ফ্রান্সের। গত ছয় ম্যাচে, প্রতিপক্ষের জালে ১৬ গোল করে দলটি দেখিয়েও দিয়েছে নিজেদের সামর্থ্য। স্পেনের আক্রমণভাগও দুর্বল নয় মোটেও; সেরা চারে তারা উঠে এসেছে ১১ গোল করে। পরিসংখ্যানের এই পাতায় ফ্রান্স এগিয়ে থাকলে, গোল কম হজমের পাতায় এগিয়ে স্পেন। ছয় ম্যাচে তারা খেয়েছে মাত্র একটি। এর অর্থ, বাকি পাঁচ ম্যাচে ক্লিনশিট নিয়ে মাঠ ছাড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দল দুটি। বাংলাদেশ সময় ১৫ জুলাই ১টায় (এএম) শুরু হবে ম্যাচটি।
এই ম্যাচের আগে ঘুরে ফিরে আসছে দল দুটির সবশেষ কয়েকটি মুখোমুখি লড়াই। ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও গত আসরের রানার্সআপ দলটির যে, স্পেনের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সাক্ষাতের স্মৃতি সুখকর নয় মোটেও। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ চারে ও নেশন্স লিগের সেমি-ফাইনালে স্প্যানিশদের বিপক্ষে হেরেছিল দিদিয়ে দেশোঁর দল। ওই দুই আসরের মধ্যে, ইউরোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। নেশন্স লিগে হয়েছিল রানার্সআপ। ২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জেতা ‘লা রোজা’রা এবার দ্বিতীয়বার এই স্বাদ নিতে মুখিয়ে।
সব বিভাগে নির্ভযোগ্য ফুটবলার থাকায় দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ দল স্পেন; তাদের রক্ষণ প্রতিপক্ষের জন্য রীতিমতো দূর্ভেদ্যই। কোয়ার্টার-ফাইনালে এসে বেলজিয়াম কেবল সেখানে পেরেছে একটু চিড় ধরাতে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ধারাল, ক্ষিপ্র। লামিন ইয়ামাল, মিকেল ওইয়ারসাবালের উপস্থিতিতে স্পেনের অ্যাটাকিং লাইন-আপ অতটা গতিময় না হলেও, দলের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকরী।
তাই ইব্রাহিমা কোনাতে, দাইয়ু উপামেকানোদেরও ডালাসের ডামাডোলে দৃঢ়তার পরীক্ষা দিতে হবে। ফরাসি সেন্টার-ব্যাক কোনাতে প্রত্যয়ের সুরে বললেন, প্রস্তুত তারা। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি কাউকে ভয় পেতে পারেন না। এখন আমরা সম্ভাব্য সেরা উপায়ে প্রস্তুতি নিব এবং আশা করি, ম্যাচের ফল দিন শেষে আমাদের পক্ষে আসবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যক্তিগত নৈপুণ্যনির্ভর খেলোয়াড়দের নিয়ে স্পেন ব্যতিক্রমী একটা দল। তো, আমরা কেবল একজন খেলোয়াড়ের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি না, যদিও লামিন (ইয়ামাল) দুর্দান্ত একজন খেলোয়াড়।’
নরওয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বদলি নেমেছিলেন কোনাতে। রক্ষণে তার চেয়ে দেশোঁর বেশি পছন্দ উপামেকানো ও উইলিয়াম সালিবা। পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে মুখিয়ে থাকা ফ্রান্সের রক্ষণভাগ আগলে রাখার দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে। মাটিতে পা রাখতেন চান কোনাতে। পরিসংখ্যান বা ইতিহাসের চক্করেও পড়তে চান না তিনি কোনোভাবেই। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা বিনয়ী আছে, সেরকম কোনো ফাঁদে পা দেব না।’
ইয়ামাল-ওইয়ারসাবালদের ফাঁদে ফেলার পথ অবশ্য খুঁজতে হবে ফ্রান্সকে। আরেক সেন্টার-ব্যাক মাক্সোস লাকোয়াও বিগত ম্যাচের পরিসংখ্যান টেনে, স্পেনকে নিয়ে কথা বললেন সমীহের সুরে। তবে, তিনিও পাত্তা দেননি ভয়-ভীতি পাওয়ার বিষয়টি।তাঁর ভাষায়, “আমি ‘ভয়’ শব্দটা বলব না, কিন্তু তাদের মান নিয়ে আমরা সতর্ক। কেপ ভার্দের বিপক্ষে লড়াই ছাড়া, তারা তাদের সব ম্যাচ জিতেছে। তো, আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি। তাদের দলে উঁচু মানের খেলোয়াড় আছে, কিন্তু আমরা জিততে চাই।’
চলতি আসরে স্পেনের ‘বিস্ময়বালক’ ইয়ামাল অবশ্য এখনো আছেন নিজের ছায়া হয়ে। তার পাশে এখন পর্যন্ত স্রেফ এক গোল। একটু বেমানানই। ওইয়ারসাবাল দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৪টি)। লাকোয়া অবশ্য ১৮ বছরের টগবগে তরুণ ইয়ামালকে নিয়ে সতর্ক। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ভালোভাবে, সেরা উপায়ে রক্ষণ সামলাবো। লামিন খুবই ভালো একজন খেলোয়াড় এবং এই বিশ্বকাপে দেখিয়েছে, সে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারে। (তাকে আটকাতে) যা যা করা দরকার, সেটাই করব আমরা।’
‘লামিনের সেরা পারফরম্যান্স এখনও দেখা বাকি’
নিজের প্রথম বিশ্বকাপে এখনো সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেননি লামিন ইয়ামাল। তবে মাঠে যতক্ষণ থাকছেন, প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভীতি ছড়াচ্ছেন। স্প্যানিশ তারকার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট থাকার কথা বললেও, তার কাছ থেকে আরো ভালো কিছুর আশায় আছেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে। স্পেন কোচ মনে করছেন, বিশ্বমঞ্চে এখনো নিজের সেরা ম্যাচটা খেলা বাকি আছে ইয়ামালের।
এবারের বিশ্বকাপে ইয়ামালের শুরুটা সুখকর হয়নি। চোটের কারণে আসরের শুরুর দিকে খুব বেশি সময় খেলতে পারেননি তিনি। কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে শেষ দিকে তাকে মাঠে নামান দে লা ফুয়েন্তে। আর সৌদি আরবের বিপক্ষে খেলান কেবল প্রথমার্ধ। ওই ম্যাচেই বিশ্বকাপে গোলের খাতা খোলেন ১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল।এখন পুরোপুরি ফিট ইয়ামাল। সবশেষ দুই ম্যাচেই খেলেছেন পুরো সময়। ছন্দ পেতেও শুরু করেছেন তিনি। সেরা চেহারার ঝলকও দেখাচ্ছেন মাঝেমধ্যে। এখনো স্বরূপে ফিরতে পারেননি এই রাইট-উইঙ্গার।
এখন পর্যন্ত ওই একটি গোলই বিশ্বকাপে ইয়ামালের অর্জন। অ্যাসিস্ট করতে পারেননি একটিও। তবে স্পেনের সেমি-ফাইনালে ওঠার পথে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাকে আটকে রাখতেই যে প্রতিপক্ষকে দিতে হচ্ছে বাড়তি মনোযোগ। এর সুবিধা পাচ্ছেন স্পেনের অন্য খেলোয়াড়রা। কাদেনা এসইআরের একটি অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমি-ফাইনাল সামনে রেখে একটি সাক্ষাৎকার দেন দে লা ফুয়েন্তে। সেখানেই ইয়ামাল নিয়ে প্রশ্নে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন স্পেনের কোচ।
তাঁর ভাষায়, ‘এই বিশ্বকাপে লামিনের সেরা পারফরম্যান্সটা এখনো আসা বাকি, আপাতত এতোটুকুই বলব। সে ভীষণ অনুপ্রেরণা নিয়ে খেলে, তার দিকে তাকালেই সেটা দেখা যায়। তার ভেতর দারুণ আগ্রহ ও ক্ষুধা কাজ করে। আমাদের কেবল তার অস্থিরতা একটু সামলাতে হবে, যেন অতিরিক্ত চাপে সে ভেঙে না পড়ে। এটা অভিজ্ঞতা অর্জন ও পরিপক্ব হওয়ার একটা প্রক্রিয়া, এমবাপ্পে ও হালান্ড সম্ভবত কয়েক বছর আগেই এমন পরিস্থিতি পার করেছে। লামিন সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর আমরা তার সঙ্গে এ নিয়ে অনেক কথা বলি।
বিশ্বকাপের বাকি সময়টায় সে এমন কিছু করে দেখাবে, যা সবার মনে ইতিবাচক ছাপ ফেলবে।‘ দুই বছর আগে স্পেনের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন ইয়ামাল। ওই টুর্নামেন্টে চারটি অ্যাসিস্ট ও একটি গোল করেছিলেন তিনি। আসরের সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার উঠেছিল তার হাতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









