রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে পল্লবীর কালশী মোড় সংলগ্ন কলাবাগান বস্তির জমি নিজেদের দাবি করে সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযান চালায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এ সময় বস্তিবাসীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হয়। ঘটনার পরম্পরায় মামলায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়া ওই বস্তিতে একদিন পর (২৫ মে) লাগিয়ে দেওয়া হয় আগুন। পুড়ে ছাই হয় তিন শরও বেশি বস্তিঘর। প্রাণে বেঁচে গেলেও আগুনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় বস্তিবাসী।
এই দৃশ্যপটে ১৩ একর এই বস্তিটি ঘিরে আবির্ভাব হয় সেখানকার স্থানীয় প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক নেতার। যাদের একজন সরকারের টেকনোক্র্যাট কোটায় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। অন্যজন ঢাকা-১৬ (পল্লবী-রূপনগর) আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য লে. কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন। তবে ভোটের মাঠে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হলেও বাস্তবের মাঠে বাতেন-আমিনুলের ইঁদুর-বিড়াল খেলার দ্বৈরথ এখন তুঙ্গে। বলা চলে যেকোনো উপলক্ষে আমিনুল মাঠে ছোটেন তো বাতেন ছোটেন ঘাটে। আর তাদের এই ‘নাম কামানোর নেশায়’অবিরাম প্রতিযোগিতায় ছুটে চলেন দুজনেরই অনুসারী কর্মীরা, যারা নিয়মিতই দুই নেতার নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিরলস জয়ধ্বনিতে ব্যস্ত। সর্বশেষ কালশীর বস্তিকে ঘিরে সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে ফের আলোচনায় এখন এই দুই নেতা।
কারণ, এই দৃশ্যপটে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ও এমপি বাতেন অসহায় বস্তিবাসীর পাশে না দাঁড়িয়ে তাঁরা মাঠে নামেন গৃহায়ণের পক্ষ নিয়ে। দুজনই বস্তিবাসীকে বোঝাতে শুরু করেন যে এই এলাকা তাদের জন্য নিরাপদ নয়। কাজেই সরে যেতে হবে অন্যত্র। এই ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুলের লোকজন যেন এককাঠি সরেস। তারা বোঝাতে থাকেন ‘আমিনুল ভাই আপনাদের জন্য গৃহায়ণকে বলে ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দেবেন।’অপরদিকে এমপি বাতেনও নামেন আদাজল খেয়ে। তার লোকজন বলেন, ‘কিভাবে পোড়া বস্তির জমিটা গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া যায়’সে ব্যাপারে কাজ করছেন এমপি সাহেব।’ দুজনের এই কর্মকাণ্ডে বিষয়টা এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে, ‘কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান।’

এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক গত ১৮ জুন নিজ মন্ত্রণালয়ের প্যাডে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী বরাবর একটি ডিও লেটার (নম্বর-৩৪.০০.০০০০.০১০.০৪.০৩৭.২৩-২১৩) দেন। সেখানে তিনি মন্ত্রীর কাছে জোর সুপারিশ করেন যেন সেই পোড়া বস্তিতে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বহুতল ভবন নির্মাণের অতিদ্রুত উদ্যোগ নেন। তার এই ‘শুভ উদ্যোগের’চিঠি ফেসবুক সয়লাবে নামেন দলের নেতা-কর্মীরা। এই খবর এমপি আব্দুল বাতেনের কাছে পৌঁছতেই তিনিও নেমে পড়েন ফেসবুকে নিজের ‘সুকীর্তি’ প্রচারে। নিজেই লিখেন- সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের পর তাঁর উদ্যোগে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেয়। অতঃপর দেয়াল নির্মাণ শুরু করে।তবে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের চিঠির সূত্র ধরে দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আসল থলের বিড়াল।
এতে দেখা যায়, যে দাগের জমিগুলো প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় এমপি গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে ‘বুঝিয়ে দিতে’উতলা, সেই জমিতে গৃহায়ণের প্রবেশের আপাতত কোনো অধিকারই নেই! কারণ এই জমির পুরো অংশেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা জারি করা। বাদী আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ এস্টেট। ওই এস্টেটের মোতোয়ালির করা (সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ১৫২১/২০২১) মোকদ্দমার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর পুরো এলাকায় স্থিতাবস্থা জারি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সেই আদেশ এখনো বহাল।

মামলার বিবাদী গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, রাজউক চেয়ারম্যান, ঢাকা জেলা প্রশাসকসহ আরো অনেকে। মামলার নথি ও আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নতুন করে উচ্ছেদ কিংবা প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। জমি যেখানে যে অবস্থায় আছে সেভাবেই থাকবে। মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের কালশী বস্তিতে উচ্ছেদকৃত জমির পরিমাণ ১৩ একর। সেই ১৩ একর জমি বাউনিয়া মৌজার যে অংশে পড়েছে তার সিএস দাগ নম্বর ৩২১৬, ৩২১৭, ৩২১৮, ৩২১৯, ৩২২০, ৩২২১, ৩২২২, ৩২২৩, ৩২২৪, ৩২২৫, ৩২২৬, ৩২২৭, ৩২২৮, ৩২২৯, ৩২৩০, ৩২৩১, ৩২৩২, ৩২৩৩, ৩২৩৪, ৩২৩৫, ৩২৩৬, ৩২৩৭, ৩২৩৮, ৩২৩৯, ৩২৪০, ৩২৪১, ৩২৪২, ৩২৪৩, ৩২৪৪, ৩২৪৫, ৩২৪৬, ৩২৪৭, ৩২৪৮, ৩২৪৯, ৩২৫০, ৩২৫১, ৩২৫৭, ৩১৬৯, ৩১৭১, ৩৪৭৪। যার পুরোটাই মামলাধীন। এ ব্যাপারে জানতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও দেননি কোনো জবাব। পরে একবার কল রিসিভ হলেও কোনো কথা বলা সম্ভব হয়নি। এরপর আবার বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ এদিনকে বলেন, ‘আমাদের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ আছে। এর পরও যদি সেটা উপেক্ষা করে গৃহায়ণ জোর করে জমির দখল নিতে চায় তাহলে আদালতের কাছে তারাই জবাবদিহি করবে। এই দেশে কেউ তো আর আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আগ বাড়িয়ে নিজেদের ‘হাইলাইট’করতে গিয়েই মন্ত্রী ও এমপি বিপদে ফেলেছেন হাজারো অসহায় মানুষকে। তাদের নাম ‘ফুটানোর’খায়েশের শিকার হয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে গেছে শত শত ছিন্নমূল পরিবার।
সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় কালশীর পোড়া বস্তির লোকজনের সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ষাটোর্ধ্ব এক নারী এদিনকে বলেন, ‘হাউজিং (গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ) আমাগো গায়ে টাচ করার সাহস করত না। যদি মন্ত্রী-এমপি পাল্লাপাল্লি কইরা হেগো পক্ষ না নিত। খালি হাউজিং না, আর্টিকেলরেও ব্যাকিং দেন আমিনুল।’আর্টিকেল আবার কী- এমন প্রশ্নে তার জবাব, ‘আর্টিকেল হইল এই এলাকার সবচাইতে বড় দখলবাজ ভূমিদস্যু। হাউজিংরে দিয়া জায়গা খালি করাইয়া তারা এখন বাউন্ডারি ওয়াল করতাছে। দেখেন না ওই যে ইট-বালি, ভেকু আনছে।’ এই ইট-বালি তো গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের আনা- এমপির ফেসবুকে তো সে রকমই দেখা গেছে। এমন প্রশ্নে আগ বাড়িয়ে উত্তর দিলেন আরেকজন মাঝবয়সী পুরুষ। বললেন, ‘আরে এমপির কাছে কি এইসব খবর আছে! উনি তো ফেসবুকে লেইখাই খালাস, হ্যারে জিগায়েন তো নতুন ওই টিনের ঘরটা কে তুলছে? নাম জানতে চাইলে বললেন, ‘ভাই, আগুনে পুইড়া সব হারাইছি। অহন আপনারা কি চান জানডাও হারাই!’

স্থানীয় একাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই জমির মামলার কথা মন্ত্রী-এমপি সবাই জানেন। কিন্তু ‘কৃতিত্ব হাতছাড়া’ হওয়ার আশঙ্কায় দুজনই গৃহায়ণের পক্ষে সাফাই গাইছেন। লতিফা বানু নামের একজন বলেন, “হুনছি ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করা পুরাপুরি ‘হারাম’। মামলা আছে বইলা তো আরো বেশি হারাম। হেই হারাম জমিতে মন্ত্রী-এমপি আইছে নিজেগো নাম ফুটাইতে। হেগো যে কত্ত নাম লাগে!’
জানতে চাইলে ঢাকা-১৬ আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘আমি জানি যে এটা সরকারি সম্পত্তি। সে জন্য সরকার এটাকে অধিগ্রহণ করে ঘেরাও দিচ্ছে। পাশাপাশি এটা যে ওয়াকফর সম্পত্তি হিসেবে দাবি আছে, সেটাও শুনি।’
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে আমি তো ব্যক্তিগতভাবে সরকারকে প্রভাবিত করতে পারি না। তবে আমি শুনেছি ওয়াকফ যে এটার দাবিদার তারাও সরকারের কাছে আবেদন করেছে। এটা নিয়ে সমন্বয় মিটিংও হয়েছে বা হবে। হওয়ার পর সরকার যেটা সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই হবে। তা ছাড়া এটা নিয়ে সরকারের পক্ষে গেজেট আছে বলেও আমি জানি।’
তিনি বলেন, ‘এখানে তো এ রকম আরো অনেক সম্পত্তি আছে। যেগুলো বাইরে বেচাকেনা হচ্ছে। এর আগেও এই জায়গায়টায় একটা ডেভেলপার কোম্পানি টিনের ঘেরাও দিয়েছিল। আরো একটা ডেভেলপার কোম্পানির ঘেরাও এখানে আছে। সবকিছু মিলিয়ে একজন ব্যক্তি হিসেবে এর বেশিকিছু বলা মুশকিল।’
বিষয়টি নিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম এদিনকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশের বিষয়টি আমার জানা নেই।’ এরপর আইনি বিষয়ে তিনি গৃহায়ণের আইন শাখায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









