দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিনটি নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। অন্যদিকে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম বাদে বাকি সাত বিভাগের অনেক জায়গায় ফের ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভারি এই বৃষ্টিপাত ও পাহাড়িঢলে ১০টি জেলার নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও আকস্মিক অথবা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেখা দেওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি দ্বিতীয় দফায় বন্যার শঙ্কায় থাকা জেলাগুলো হচ্ছে, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল।
গতকাল সোমবার বিকেল থেকে কোথাও কোথাও বৃষ্টি ঝরছে এবং আজ মঙ্গলবার বাকি জায়গাগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। পরদিন বুধবার থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টি বেশি হতে পারে। দক্ষিণের জেলা যেমন চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনায় বৃষ্টি বেশি হতে পারে। আগামীকাল রাজধানীতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে কোথাও কোথাও বিশেষ করে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
৫ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় প্রবল বৃষ্টি হয়। টানা এই বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটসহ (একাংশ) আটটি জেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়। টানা আটদিনের ওই ভয়াবহ বন্যার পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। দুর্যোগ কবলিত জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটেছে ৫৯ জনের, আহত হয়েছেন আরও ৪০ জন।
১০ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা: গতকাল সোমবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, সকাল নয়টায় সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি তিনটি জেলার চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি ছাতক (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার, মারকুলি (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কেন্দ্রটি বলছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সুরমার পানি সমতল বাড়লেও কুশিয়ারা নদীর পানি কমেছে। তবে নদী দুটির পানি আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত বাড়তে পারে পেতে পারে। তাতে আজ মঙ্গলবারই নদী দুটির কিছু স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। আর যেসব এলাকায় বন্যা চলছে, সেসবে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।
ভারতের মণিপুর রাজ্যের আঙ্গামি নাগা পাহাড় থেকে উৎপন্ন বরাক নদী সিলেট সীমান্তে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি স্রোতধারায় বিভক্ত হয়। এ দুই নদী কিশোরগঞ্জের ভৈরববাজারের কাছে মিলিত হয়ে মেঘনা নদী গঠন করে, যা চাঁদপুরে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, গতকাল সকাল নয়টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, জিঞ্জিরাম, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানি বেড়েছে, যা কাল বুধবার পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সময়কালে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় ভুগাই, কংস ও সোমেশ্বরী নদী এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জে সারিগোয়াইন, যাদুকাটা নদীর কিছু স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
তাতে নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আর যেসব এলাকায় বন্যা চলছে, সেসবে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।
এদিকে যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, সারি গোয়াইন ও ভোগাই নদীর উজানে ভারতের মেঘালয়ে গেল ২৪ ঘণ্টায় অতি ভারি বৃষ্টি হয়েছে। বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, রাজ্যটির উইলিয়ামনগরে ৩৭১ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ২৭৯ ও তুরায় ১০১ ও আর কে এম সোহরায় ২৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আসামের গোয়াহাটিতে ১৩৮ এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাছাড়া দেশের ভেতরে চট্টগ্রাম বাদে সব বিভাগে ভারি বৃষ্টির আভাস রয়েছে।
উত্তরেও পরিস্থিতির অবনতি: বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় উত্তরের রংপুর বিভাগে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়েছে। বুধবার পর্যন্ত তা আরও বাড়তে পারে এবং বৃহস্পতিবার গিয়ে তা স্থিতিশীল থাকতে পারে। এর ফলে ওই সময় পর্যন্ত নদীগুলোর কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপরে পানি প্রবাহিত হতে পারে এবং লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও আকস্মিক অথবা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
গত একদিনে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গার পানি সমতল বাড়লেও পদ্মার পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। শুক্রবার পর্যন্ত এসব নদ-নদীর পানিও বাড়তে পারে। ফলে বুধবারের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।
রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের করতোয়া, আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী, আত্রাই ও ঘাঘট নদীর পানিও সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে। এ সময়ে করতোয়া ও ছোট যমুনা নদীর পানি সমতল কমলেও বুধবার নাগাদ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বৃহস্পতিবারের মধ্যে নওগাঁ ও নাটোরে আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর কিছু স্থানে পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। গত একদিনে চট্টগ্রাম বিভাগেও সাঙ্গু নদীর পানি সমতল বাড়লেও হালদা নদীর পানির সমতল কমেছে আর মাতামুহরীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে। এসব নদীর পানি আজ মঙ্গলবার দ্রুত বাড়তে এবং পরবর্তী দুদিন দ্রুত বাড়তে পারে।
ভারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার শঙ্কা: গতকাল সোমবার বিকেল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। এর আগে বেলা ১১টায় দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার ভারি বৃষ্টির সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ভারি এবং কোথাও কোথাও অতিভারি বৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে কোথাও কোথাও বিশেষ করে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক জানান, সোমবার শুরু হওয়া সাত বিভাগে ভারি বৃষ্টি আজ মঙ্গলবারও থাকতে পারে। আগামীকাল বুধবার থেকে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বৃষ্টি বেশি হতে পারে। মূলত মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে বৃষ্টি হচ্ছে। তবে সাগরে আরেকটি মেঘমালা তৈরি হয়েছে, এরও প্রভাব রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৃষ্টি-পাহাড়িঢলে সুনামগঞ্জে দুর্ভোগ: সুনামগঞ্জে চলতি মাসের শুরু থেকে টানা এক সপ্তাহ অতিবৃষ্টিতে নদ-নদী ও হাওরে পানি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে নেমেছে উজান থেকে পাহাড়িঢল। এতে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেয়। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ খুলেছে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা। হাওরে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মাঝখানে এক সপ্তাহ বৃষ্টি কম হয়েছিল।
এখন দুদিন ধরে আবারও ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে নামছে উজানের পাহাড়িঢল। এতে জেলার নদ-নদীর পানি আবারও বাড়ছে। জেলার প্রধান নদী সুরমাসহ নদ-নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। ঢলের পানিতে জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ায় মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। তাহিরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়িঢলের তোড়ে রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা ও পাটলাই, জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর ও কুশিয়ারা, দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা, খাসিয়ামারা নদীর পানি বেড়েছে। এই উপজেলার সীমান্তবর্তী বড়ছড়া, চারাগাঁও, চানপুর এলাকায়ও ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে ব্যাপক পরিমাণে ঢল নেমেছে।
তাহিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, রবিবার রাত থেকে ব্যাপক পরিমাণে পাহাড়িঢল নামছে। এতে বেশ কিছু বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে। ঢলের পানি নামলেই এই সমস্যা হয়। দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজারের আবদুল মোতালেব জানান, উপজেলার খাসিয়ামারা, মৌলা ও চেলাই নদীতে ঢল নামছে। এতে করে পানি বেড়েছে। নিচু এলাকার রাস্তাঘাটে পানি থাকায় মানুষের ভোগান্তি আছে।
সুনামগঞ্জ পনি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত ভারি বৃষ্টির সঙ্গে উজানের পাহাড়িঢল নামলেই পরিস্থিতির অবনতি হয়। সুনামগঞ্জে এবং উজানে ভারতে চেরাপুঞ্জিতে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ভারি বৃষ্টি হয়েছে। এতে ঢলের পানি নামছে এবং নদ-নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। বৃষ্টি হলে পানি আরও বাড়বে। পাউবোর তথ্য অনুসারে, সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর এলাকায় গতকাল সোমবার দুপুর তিনটায় পানির উচ্চতা ছিল সাত দশমিক ৫৩ মিটারে। এখানে সকাল নয়টা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ২২ সেন্টিমিটার। রবিবার সকাল নয়টা থেকে গতকাল সকাল নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১১০ মিলিমিটার। জেলায় এবার মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় ৭ জুলাই, ২৬৫ মিলিমিটার।
সুনামগঞ্জে আপাতত বড় বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি বলেন, বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি হবে। এতে পানি আরও বাড়বে। কোনো এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, সার্বিক পরিস্থিতি তাঁদের পর্যবেক্ষণে আছে। বন্যা পরিস্থিতিতে করণীয় ও প্রস্তুতি সম্পর্কে উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার এক হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) তৈরি রাখা হয়েছে। উদ্ধারকাজ পরিচালনায় পর্যাপ্ত নৌযান, স্বেচ্ছাসেবক ও এক হাজার ৫৬টি মেডিক্যাল টিমও তৈরি আছে। জেলার ১২টি উপজেলায় এক হাজার ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, জিআর চাল পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত আছে।
নেত্রকোনায় ৪০ গ্রাম প্লাবিত: ভারি বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা নদ-নদী দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করায় কলামাকান্দার অন্তত ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুর্গাপুর উপজেলার গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রামও প্লাবনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পুকুরের পাড় ডুবে গিয়ে মাছ ভেসে যাওয়ায় খামারিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার গভীর রাত থেকে হঠাৎ করে সীমান্তবর্তী নদীগুলো দিয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ শুরু হয়। রাতারাতি বিভিন্ন এলাকায় পানি ছড়িয়ে পড়ে এবং আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তলিয়ে গেছে বিভিন্ন সড়ক, সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পানিবন্দি এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, পুকুর ও শাকসবজির খেতও। অসংখ্য পুকুরের পাড় ভেঙে চাষ করা মাছ ভেসে যাচ্ছে। তলিয়ে গেছে পানির চাপে গজারমারি থেকে খারনৈ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের শ্রীপুর এলাকায় অন্তত পাঁচটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে জানান খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক। তিনি জানান, খারনই ইউনিয়ন থেকে কলমাকান্দা উপজেলা সদরে যাওয়ার প্রধান সড়ক প্রায় ২০টি স্থানে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। পানির তীব্র স্রোতে কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার গভীর রাত থেকে মংলেশ্বরী নদ ও কয়েকটি নালা দিয়ে প্রচণ্ড বেগে পাহাড়িঢলের পানি প্রবেশ করছে। অনেক গ্রামের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে, কোথাও কোথাও বাড়িঘরের ভেতর দিয়েও পানি যাচ্ছে। কলমাকান্দা শহরে যাওয়ার প্রধান সড়কসহ প্রায় সব রাস্তাই তলিয়ে গেছে। পানি ক্রমাগত বাড়ছে এবং অনেক পুকুরের মাছ ভেসে যাচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছি।’
ঢলের পানিতে গণেশ্বরী নদীর তীরে থাকা গজারমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আধাপাকা ভবনের অর্ধেক অংশ ভেঙে পড়েছে। গতকাল সকালে সহকারী শিক্ষক আশরাফ উদ্দিন জানান, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কোমরসমান পানি আছে।
রংছাতি ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমান খান পাঠান বলেন, ‘মহাদেও নদ দিয়েও শুক্রবার রাত থেকেই পানি ঢুকছে। কয়েকটি গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক পুকুরের পাড় ডুবে গিয়ে মাছ বেরিয়ে গেছে।’ লেঙ্গুরা ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া জানান, গণেশ্বরী নদী দিয়ে মেঘালয়ের পানি প্রবেশ করায় ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত পানি বাড়ছে।
দুর্গাপুর উপজেলার গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের বন্ধঊশান গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘নেতাই নদীর পানি শুক্রবার রাত থেকেই প্রবল স্রোতে ঢুকছে। আশপাশের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অনেকের পুকুরের মাছ চলে গেছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে দিনের মধ্যেই বাড়িঘর প্লাবিত হবে।’
জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়িঢলে কলমাকান্দা-দুর্গাপুর উপজেলার খারনই, রংছাতি ও লেঙ্গুরা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত উব্দাখালী, মঙ্গলেশ্বরী, গণেশ্বরী, বাখলা ও মহাদেওসহ নদ–নদীর পানি বেড়েছে। তবে, এগুলোসহ সোমেশ্বরী, কংস, মগরা, ধনুসহ অন্য নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে। তবে, রবিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে হঠাৎ পাহাড়িঢল নামে। এতে পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এতে কলমাকান্দা উপজেলার প্রায় ১২ কিলোমিটার কাঁচা ও পাকা গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম।
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্বে থাকা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শামসুজ্জামান আসিফ বলেন, ‘সীমান্তবর্তী নদীগুলো দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশের খবর পেয়ে প্রশাসনের একটি দল খারনই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে। পরিদর্শন শেষে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানা যাবে। ইউপি চেয়ারম্যানদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সার্বিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।’ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। তিনিও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









