শ্রাবণের সকাল। রাতভর বৃষ্টির পর গ্রামের আকাশটা ধুয়ে-মুছে নীল হয়ে উঠেছে। তালগাছের মাথায় রোদ চিকচিক করছে, পুকুরের পানিতে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর কাঁচা রাস্তার ধারে জমে থাকা ছোট ছোট পানির গর্তে চড়ুই পাখিরা গোসল নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।
এমন সকালে গ্রামের সবাই বাজারে যায়। কেউ শাক নিয়ে, কেউ মাছ নিয়ে, কেউ শুধু আড্ডা দিতে। কিন্তু এগারো বছরের মাহিন বাজারে যায় অন্য কারণে। সে মানুষের অদ্ভুত সব অভ্যাস দেখে। কে হাঁটতে হাঁটতে নিজের সঙ্গেই কথা বলে, কে লাউ কিনতে এসে কুমড়া নিয়ে ফেরে—এসবই তার ভারী মজা লাগে।
সেদিনও সে বাজারের এক কোণে পুরোনো বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ দেখে, সেখানে একটা দোকান বসেছে। অথচ আশ্চর্যের কথা, দোকানে কোনো জিনিসপত্র নেই। শুধু সারি সারি কাঁচের শিশি। প্রতিটি শিশির ভেতর যেন ছোট্ট সাদা মেঘ নড়ছে।
দোকানদারের গায়ে নীল পাঞ্জাবি, মাথায় গোল টুপি, গোঁফ দুটো এমন পাকানো যেন দুই পাশে দুটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, ‘এসো, এসো! একদম টাটকা হাঁচি! আজকের সকালের!’
মাহিন ভুরু কুঁচকে বলল, ‘হাঁচিও আবার বিক্রি হয়?’
লোকটা বুক ফুলিয়ে বলল, ‘আমি হাবুল হাঁচি সওদাগর। পৃথিবীতে যার যা দরকার, আমি তাই বিক্রি করি। কারও দরকার হাসি, কারও সাহস, আর আজকাল অনেকেরই দরকার... একটা জম্পেশ হাঁচি!’
মাহিন অবাক। ‘হাঁচি দিয়ে কী হবে?’
হাবুল মুচকি হেসে একটি শিশির ছিপি খুলল। ফুস! একটা ছোট্ট তুলোর মতো সাদা মেঘ বেরিয়ে পাশের ছাগলের নাকে ঢুকে গেল। ছাগলটা একবার মুখ তুলে... ‘হ্যাঁচ্ছোওও!’ এমন হাঁচি দিল যে মাথার ওপর গাছ থেকে পাঁচটা কাঁঠালপাতা ঝরে পড়ল। ছাগল নিজেই ভয় পেয়ে ‘ম্যা-এ-এ!’ বলে দৌড় দিল।
মাহিন হো হো করে হেসে উঠল। হাবুল গর্ব করে বলল, ‘দেখলে? এক নম্বর মাল।’
এরপর থেকে মাহিন রোজ বিকেলে হাবুলের দোকানে আসে। একেক শিশিতে একেক রকম হাঁচি। কোথাও ফুলের গন্ধের হাঁচি, কোথাও গোলমরিচের, কোথাও আবার হাসতে হাসতে হাঁচি। কিন্তু হাবুল কড়া নিয়ম করে দেয়, ভালো মানুষের ওপর জাদু চালানো নিষেধ। শুধু যারা অন্যকে কষ্ট দেয়, তাদের একটু শিক্ষা দেওয়া যায়।
কয়েক দিন পর গ্রামের এক বদমেজাজি লোক বাজারে এসে সবাইকে ধমকাতে শুরু করল। ‘এই! রাস্তা ছাড়ো! ওই ছেলে! সাইকেল সরাও!’
হাবুল মাহিনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। তারপর বাতাসে আলতো করে একটা শিশি খুলে দিল। সাদা মেঘটা উড়ে গিয়ে লোকটার নাকে ঢুকল। লোকটা বলল, ‘আমার কিছু...’ তারপর ‘হ্যাঁচ্ছো!’ একবার, দুইবার। এরপর এমন হাঁচি শুরু হলো যে, প্রতিবার হাঁচি দিলেই তার মুখ থেকে বেরোতে লাগল, ‘ধন্যবাদ!’, ‘মাফ করবেন!’, ‘আপনি আগে যান!’
লোকটা নিজেই অবাক। সে বলতে চায়, ‘সরে দাঁড়াও!’ কিন্তু বেরিয়ে আসে, ‘আপনি খুব ভালো মানুষ!’ চারপাশে লোকজন হাসতে হাসতে কাহিল। বদমেজাজি লোকটা শেষে লজ্জা পেয়ে সত্যিই নম্র হয়ে গেল।
মাহিন ফিসফিস করে বলল, ‘এটা তো দারুণ জাদু!’
হাবুল বলল, ‘হাঁচি কখনো কখনো নাকই পরিষ্কার করে না, স্বভাবও পরিষ্কার করে।’
এর এক সপ্তাহ পর আরও বড় বিপদ ঘটল। গ্রামের মিষ্টির দোকান থেকে সন্দেশ উধাও। সবাই একজন আরেকজনকে সন্দেহ করছে। হাবুল চুপচাপ একটা রুপালি শিশি বের করল।
‘এটা সত্যি-হাঁচি। যে মিথ্যা বলবে, সে হাঁচি থামাতে পারবে না।’
সন্ধ্যায় বাজারে সবাই জড়ো হলো। একে একে সবাই বলল, ‘আমি নিইনি।’ কিছুই হলো না। শেষে এক কিশোর বলল, ‘আমিও নিইনি...’ সঙ্গে সঙ্গে ‘হ্যাঁচ্ছো!’ আবার ‘হ্যাঁচ্ছো!’ তারপর আর লুকিয়ে রাখতে পারল না। মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি নিয়েছিলাম। ছোট ভাইয়ের খুব খেতে ইচ্ছে করছিল।’
দোকানদার রাগ না করে বললেন, ‘আগে বললে একটা সন্দেশ এমনিতেই দিতাম।’
ছেলেটা লজ্জায় কেঁদে ফেলল। হাবুল শিশির ছিপি লাগিয়ে দিল। হাঁচি থেমে গেল। সেদিন মাহিন বুঝল, জাদুর আসল কাজ কাউকে ভয় দেখানো নয়; মানুষকে সত্যের কাছে ফিরিয়ে আনা।
শরৎ এসে গেল। কাশফুল দুলছে। এক সকালে বটগাছের নিচে গিয়ে মাহিন দেখল, দোকান নেই। শুধু একটা কাঁচের শিশি পড়ে আছে। ভেতরে একফোঁটা সাদা মেঘ ঘুরছে। শিশির গায়ে ছোট্ট করে লেখা, ‘যেখানে হাসি কমে যায়, আমাকে সেখানে নিয়ে এসো।’
মাহিন শিশিটা বুকের কাছে চেপে ধরল। আজও গ্রামের কেউ যদি খুব রাগ করে কথা বলতে শুরু করে, মাহিন শুধু মুচকি হাসে। তার মনে হয়, বাতাসে কোথাও না কোথাও পাকানো গোঁফে হাত বুলিয়ে হাবুল হাঁচি সওদাগর নিশ্চয়ই বলছেন, ‘একটা হাঁচি হলে মেজাজটা ঠিক হয়ে যেত!’
লেখক : শামীমা নাসরিন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









