ফের বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, কমছে না হাম ও এর উপসর্গের সংক্রমণও। সংক্রামক রোগ হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের ব্যর্থতা আর মশাবাহিত রোগ বাড়ার পেছনে অসচেতনতাকে দায়ী করছেন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরও দুজন শিশু এবং নতুন করে রোগটি শনাক্তসহ আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১৪ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১৩০ দিনে হাম ও ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৫ জনে, যা অন্তত তিন দশকের ইতিহাসে বিরল। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ৯৫ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৭১০ জন। ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ এবং এর ২৬ দিনের মাথায় বুধবার মৃত্যু ৮০০ ছাড়ায়।
অন্যদিকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন আর ৪৫০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২০ জনে। আর এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৯ জন, যাদের ২১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে চলতি মাসের ২৩ দিনে, যা মাসওয়ারি সর্বোচ্চ। এর আগে গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের।
হাম ও উপসর্গে মৃত্যু বাড়ছেই: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত বুধবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত দুজন শিশুর একজন সিলেট ও অন্যজন রংপুর বিভাগের। জেলা হিসেবে সুনামগঞ্জ ও গাইবান্ধায় একজন করে শিশু মারা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৩৬৬ জনের। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৬ জন, বরিশাল বিভাগে ৬২ জন, খুলনা বিভাগে ৩১ জন ও রংপুর বিভাগে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, ওই একদিনে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৮৪৮ জন শিশু, তাদের ৭৮৫ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬৬ জন শিশুর শরীরে। আক্রান্ত শিশুদের ঢাকা বিভাগে ৬২ জন নিশ্চিত ও ৩৩৩ জন সন্দেহজনক, চট্টগ্রামে ৩৭ জন নিশ্চিত ও ১৭১ জন সন্দেহজনক, খুলনায় নয়জন নিশ্চিত ও ৫২ জন সন্দেহজনক, ময়মনসিংহে ১০ জন নিশ্চিত ও ৪৬ জন সন্দেহজনক, রংপুরে ১০ জন নিশ্চিত ও ১৮ জন সন্দেহজনক, সিলেটে আটজন নিশ্চিত ও ৭৪ জন সন্দেহজনক এবং বরিশালে ১২২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২১ হাজার ২০০ জনে আর ১৫ হাজার ৭ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এতে চারমাসের বেশি সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ২০৭ জনে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৮৯৪ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৩ হাজার ৮৬৩ জন, যাদের এক লাখ ১৮৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। গত বছর মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০ জন, ২০৩ জন, ৩১১ জন, ২৮১ জন ও ২৪৭ জন। এ সময়ে মৃত্যুর ঘটনা ছিলই না।
টিকাদানে ব্যর্থতাই মূল কারণ: সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানের স্বল্পতাও এবার হামের এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছর তারা আট বিভাগে ১০৩ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় এনেছে। অর্থাৎ টিকা দেওয়া হয়েছে এক কোটি ৮৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৫ ডোজ। তবে, শহর ও গ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে কাজ না করলে হাম কমানো যাবে না। তিনি বলেন, প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের জ্বর হলে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হবে। সেখানে তাদের ডেঙ্গুর পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু না হলে তাদের হাম সন্দেহ করে হাসপাতালে রেখে দিতে হবে। চার দিন পর যদি দেখা যায় হাম নেই, তাহলে বাসায় চলে যাবে। তা ছাড়া হাসপাতালে দুর্বল শিশুরা যত্ন, খাবার, চিকিৎসা পাবে। এটা করা গেলে হামে মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে। ডা. মুশতাক বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি ভিত্তিতে অনেক কাজ করেছে। কিন্তু ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে এ কাজ সরকারের পক্ষে করা সম্ভব; বিশেষ করে দ্বিতীয় ডোজের টিকার ক্ষেত্রে এ কাজ করতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত বুধবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত মারা যাওয়া একজন পুরুষ রংপুর বিভাগের। এ বছর মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এরপর ঢাকা উত্তর সিটিতে ছয়জন, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচজন করে, চট্টগ্রাম বিভাগে চারজন, বরিশাল বিভাগে তিনজন এবং রংপুর, সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগ ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মারা গেছেন রোগটিতে। অন্যদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪৫০ জনের মধ্যে ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০২ জন সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগের। এরপর ৬৬ জন খুলনা বিভাগের, ৬৪ জন বরিশাল বিভাগের, ৫১ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৪৪ জন রংপুর বিভাগের, ১৯ জন ময়মনসিংহ বিভাগের এবং ১১ জন রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে নতুন করে ৫০ জন ও উত্তর সিটিতে ৪৩ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় ৪১৭ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১০ হাজার ৯১১ জন। এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক হাজার ৭০ জন। মশাবাহিত এই রোগটিতে চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্ত ১২ হাজার ২০ জন রোগীর মধ্যে ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। এই বছর মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে ৪১ পুরুষ ও ৫৯ শতাংশ নারী।
সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









