অযোধ্যা সীমান্ত সড়কটি পাড়ি দিতে দিতে পশ্চিমাকাশে সূর্যটা তেজ হারিয়ে নয়া বউয়ের মতো লাল টুকটুকে রূপ ধারণ করল। সেই রূপের ঝলক বর্ণনাতীত; যা শুধু দুই নয়নে দেখেই অনুভব করা যায়। এমনিতেই পাহাড় থেকে সূর্যাস্তের সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অনন্যা। পাহাড়ি সড়কে পথচলার একরাশ মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই অযোধ্যা সীমান্ত সড়কের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাই।
অযোধ্যা, এই নামটির সঙ্গে দেশের মানুষের পরিচিতি ভারতের বাবরি মসজিদের সুবাদে। অথচ আমাদের দেশেও যে অযোধ্যা নামক একটি অঞ্চল রয়েছে। যা এক নৈসর্গিক প্রকৃতির ভান্ডার। আশ্চর্য ব্যাপার সেটা গুণী মানুষে নেই। শুধু আমরা খুঁজে খুঁজে বের করব দেশের ভেতর থাকা অচেনা-অজানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সেই ভাবনা থেকেই ছুটে যাই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া খাগড়াছড়ি জেলার তবলছড়ি। সারা রাত বাস জার্নি করে সকালে নেমে পড়ি তবলছড়ি। সেখান থেকে যামিনীপাড়া গ্রামের পথে হাঁটা। সকালের সোনাঝরা রোদে, পাহাড়ি গ্রামীণ পথ, গাছের পাতার ফাঁক গলে সূর্যের কিরণ, অচেনা পাখির কলতান- সব মিলিয়ে অসাধারণ বিশাল-বিশ মিনিট হেঁটে পরিপাটি এক মাটির ঘরের সামনে হাজির। পূর্ব পরিচিত শাহজাহানের সুবাদে আজকের রাতটা এখানেই কাটবে। তাই সঙ্গে থাকা ট্রাভেল ব্যাগগুলো ঘরের ভেতর গুছিয়ে রেখেই বড় ঘুমের পথে বেরিয়ে পড়ি। তেকাতী রোদে ইটের সলিংয়ের ওপর ঘন্টাখানেক হেঁটে, তিপরা পল্লীর বড়পাড়া পৌঁছাই। পাহাড়িয়াদের জুমচাষের তরমুজ খেয়ে তৃষ্ণা মিটাই। এরপর তরতর করে সেগুন বনে ঢুকে পড়ি। ঢুকেই দেখি বিশাল অরণ্য।
দুর্গম পথ পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অভিযাত্রীরা। বুনোমহিষ মায়াহলে তাকালে, হৃদয়ে অদ্ভুত শিহরন জাগে। শিহরিত মন নিয়েই শুরু মূল হাইকিং-ট্র্যাকিং। কমবেশি প্রত্যেকের হাতে, কাঁধে ও মাথায় হাঁড়ি-পাতিলসমেত বাজার সদাই। বেশি কার শরীরে কত তেল আছে। হাঁটার সময় গরাপাতার মর মর শব্দ। পাতার স্তূপ জমে কোথাও কোথাও দুই-তিন ফিট উঁচু। সে এক ভিন্ন রকম অনুভূতি। সেগুনপাতা মাড়িয়ে যেতে যেতে পা পিছল ত্রিবির জলে। তারই মাঝ বরাবর ছোট-বড় পাথুরে সারি। নামানিক্রাম ঝিরিপথ। দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। সেই পাহাড়ে পাতাবিহীন দিগম্বরোত্থ শতসহস্র সেগুন বৃক্ষ। চোখেমুখে ঝিরির শীতল পানির ঝাপটা দিতেই ক্লান্তি উবে যায়। সামনেই খাড়া পাহাড়। আবার ট্র্যাকিং শুরু। প্রায় ঘণ্টা দুই হাইকিং-ট্র্যাকিং শেষে দেখা মিলে বড় ঘুম ঝরনার। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। চৈত্রর প্রচণ্ড খরত মাঝেও বড় ঘুম ঝরনার পানি প্রবহমান। রিমঝিম শব্দ তুলে অবিরাম ঝরনা, ঝরনার পানি ছুটে চলে তার আপন গতিতে। পানি পড়তে পড়তে ঝরনার সামনে বিশালকার বেসিনের মতো সৃষ্টি হয়েছে। সেই কারণেই জুফ নূয়োন্ডী ত্রিপুরা আদিবাসীরা এটাকে বড় ঘুম বলে। সকাল গড়িয়ে ভরদুপুর। যাই এবার গলাচিপা ঘুম।
পরম তৃপ্তির সঙ্গে ধোয়া-দেমে এবার ছুটে চলা গলাচিপা ঘুমের পথে। পথ চলতে চলতে দূরন্ত জিপিং রোমাঞ্চ ছড়াচ্ছে। তাই আরেকটু গতি বাড়িয়ে পা চলল। অবশেষে গলাচিপা ঘুমের প্রান্তরে। এই জীবনে বহু ঘুম দেখেছি। কিন্তু গলাচিপার আকৃতিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকটা ইংরেজী ‘এস’-এর মতো। দেখতে যেমনি নান্দনিক, তেমনি ভয়ানক আকৃতি ধারণ করে আছে। গলাচিপার ওপর দিকে টানছে খাড়াখাড়ি। কিন্তু পার হতে হবে বেশ কণ্টকাকীর্ণ পথ। সামান্য ভুল হলেই সোজা ঘুমের গহ্বরে। আদতে পাহাড় ভ্রমণে এ রকম সংকুল পরিবেশ পরিচিতির মুখোমুখি না হলে মনের মাঝে একটা উত্তেজনার ভাব আসে না। এ রকম পরিস্থিতির পাহাড়প্রেমীদের জন্য রোমাঞ্চকর অনুভূতির জন্ম দেয়। পথের চড়াই-উতরাই সবটাই মেঘে ঢাকা তপ্ত ফাঁকা। সরু পথ। খাড়া মঙ্গো তেমন শক্ত শেকড়-বাকড় নেই। তিন-চার ইঞ্চি পা এদিক-ওদিক হলেই তলপেটের পেটে। প্রকৃতিই সদক্ষ হিংস্র এখনও সাধারণ পর্যটকদের, আগমন ঘটেনি গলাচিপা ঘুমের আগার ঠিক। লোভ সামলাতে না পেরে, ঝিরির শীতল পানিতে জলকেলিতে মেতে উঠি। আর দেহ, মন ও চোখের প্রশান্তি। পাহাড়ে সদ্ব্যবহার নামে আসে, নৈশ নক্ষত্রেই চটকাদলি ফিরতি পথ ধরি।
তবে সেটা ভিন্ন পথে। যা আরও রোমাঞ্চকর। কিছুটা সময় হাইকিং করেই সুমুযূঙ ঝিরির বাঁকে এসে, ট্র্যাকিং করে সোজা এক খাড়া পাহাড়ের ওপর উঠে পড়ি। আনুমানিক হাজার-বারোশ ফিট উচ্চতা হবে। টর্চের আলোয় পাথুরে ঝিরিতে হাঁটি। ফিরতি পথে পাহাড়টার চূড়ায় না উঠলে হয়তো অচেনা-অজানা গিরিপথটার সৌন্দর্য অবশ্যই রয়ে যেত। রাতে যামিনীপাড়া ফিরেই পরের দিনের ভ্রমণসূচির প্রস্তুতি। বাঁশ চ্যাঁলের মিঠা জোলাদার গভীর রাত অবধি ভরপুর আড্ডা মেরে, ঘুমের বাড়ি সবাই পাড়ি দিই। এন্ড ঘুমেই মিষ্টি সকাল। নাস্তা সাজতে সাজতেই মাচেরা এসে হাজির। গন্ধব্য আলেখ্য। তবে তার আগেই খাম্বি ঝরনা ঢোলা। উঁচু-নিচু ঢালু সড়ক পেরিয়ে খুব অল্প সময়েই মাঝেই পৌঁছে যাই গৌরবপাড়া। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করি বন্যনদীলা। এটি একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিচালিত পাহাড়চূড়া। যাই এবার নৈসর্গিক জনপদ পূর্বোদ্যে বাজাছড়ি।
যেতে যেতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ের সারি দেখি। গাড়ি ব্রেক করতেই দেখি সীমান্ত পিলার। শুধুমাত্র একটি সীমানা পিলার মানচিত্র ভাগ করে দিয়েছে। কিন্তু মন, সেটা ভাগ করার সাধ্য কার! তার ত্রিপুরা রাজ্যে বিজিবি চৌকিতে না দেওয়া পর্যন্ত হেঁটে বেড়াই। সীমান্ত প্রহরীকে সামান্য কৈফিয়ত দিতেই সতর্ক পাড়ি। পাহাড় থেকে সূর্যাস্তের সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অনন্যা।
গাড়ি স্টার্ট। ড্রাইভার এবার অসন্তোষ। মাঝে রামশিরা এলাকায় ব্রেক দিয়ে দূরির ঝিল বসে জলপায়রা দুপুরের আহার সারলাম। যেতে যেতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ অযোধ্যা বিওপি পিলারের কাছে ব্রেক। অসাধারণ পরিবেশ। নয়নাভিরাম প্রকৃতির ভান্ডার। যতদূর চোখ যায় শুধু অবারিত প্রকৃতি। পাশেই পাহাড়ের ওপর খাগড়াছড়ি জেলা অযোধ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অযোধ্যা গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হতেই হবে। অথচ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখনও প্রকৃতির নিসর্গ অযোধ্যা গ্রামটি রয়েছ অচেনা।
যাই এবার সদ্য নির্মিত অযোধ্যা সীমান্ত সড়কে। চুক্কা যাই, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০ ইসিবি কর্তৃক নির্মিত অযোধ্যা সীমান্ত সড়কে। প্রকৃতি, পরিবেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে মস্তবড় সপ্তর উঁচু উঁচু পাহাড় কেটে পিচঢালা সড়ক নির্মাণ করেছে। সীমান্ত সড়কটির একপাশে সিনা টান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, জন্মঙ্ক পাহাড়ের মতো আমাদের পাহাড়। আরেক পাশে পাহাড়ের পাদদেশে সীমানা ভাগ করে দেওয়া ফেনী নদী। মায়াবী পথটির কোথাও কোথাও এতটাই উঁচু আর ঢালু যেন মাহেন্দ্র গাড়িতে নয়, রোলার কোষ্টারেই বসেছিলাম।
অযোধ্যা সীমান্ত সড়কটি পাড়ি দিতে দিতে পশ্চিমাকাশে সূর্যটা তেজ হারিয়ে নয়া বউয়ের মতো লাল টুকটুকে রূপ ধারণ করল। সেই রূপের ঝলক বর্ণনাতীত; যা শুধু দুই নয়নে দেখেই অনুভব করা যায়। এমনিতেই পাহাড় থেকে সূর্যাস্তের সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অনন্যা। পাহাড়ি সড়কে পথচলার একরাশ মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই অযোধ্যা সীমান্ত সড়কের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাই।
লেখক : মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









