চট্টগ্রাম মহানগরে ভবন নির্মাণে আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পরিকল্পিত নগরায়ণে বিভিন্ন শর্ত ও নিয়মকানুন থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে। সূত্রগুলো বলছে, নগরীতে প্রায় দেড় লাখের বেশি ভবন থাকলেও এর মধ্যে অধিকাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে অনুমোদিত নকশা, সেটব্যাক, পার্কিং, উন্মুক্ত স্থান কিংবা অন্যান্য শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। এমনকি শতভাগ নিয়ম মেনে নির্মিত ভবনের সংখ্যা কার্যত শূন্যের কোটায়। ফলে জলাবদ্ধতা, যানজটসহ নাগরিক ভোগান্তিই যেন নিত্যসঙ্গী।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগর গড়তে পরিকল্পিত নগরায়নের তাগিদ বিশেজ্ঞদের। আর নগরবাসীর দাবি, নতুন ভবনের অনুমোদন ও বিদ্যমান ভবনগুলোরও সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নকশা বহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিয়মিত মনিটরিং এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে চট্টগ্রামকে একটি বাসযোগ্য ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি পরিকল্পিত শহরে ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খালি জায়গা রাখা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য জমি সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম উপেক্ষা করেই অধিকাংশ ভবন নির্মিত হচ্ছে। সূত্র জানায়, সিডিএ ভবন থেকে চতুর্দিকে ৪৩২ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় কোনো স্থাপনা করতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর ভবন নির্মাণ নীতিমালা অনুসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চলাচলের রাস্তা থাকা বাধ্যতামূলক। যত উঁচু ভবন হবে রাস্তার প্রশস্ত তত বেশি হতে হবে। আবার রাস্তা থাকার পরও প্রতিটি ভবন নির্মাণে চতুর্দিক থেকে জায়গা ছেড়ে কাজ করার বিধান রয়েছে।
এক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় একটি চার কাঠার প্লটে ভবন নির্মাণ করতে সামনের দিকে ১.৫ মিটার, পিছনে ২ মিটার এবং উভয় পাশে ১.২৫ মিটার করে জমি ছাড়ার বিধান রয়েছে। আর ১০ তলার ওপর ভবন হলে সামনের দিকে দেড় মিটার পেছনে ৩ মিটার এবং উভয়পাশে ৩ মিটার করে জায়গা ছাড়তে হবে। আবার বাণিজ্যিক বা কারখানার সম্মুখে কমপক্ষে ৬ মিটার রাস্তা রাখতে হবে এবং উভয় পাশে ২ মিটার জায়গা খালি রাখতে হবে। কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে, অধিকাংশ ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি না ছেড়ে প্লটজুড়ে স্থাপনা নির্মাণ, খাল ও জলাধারের প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না রাখা এবং সড়ক সম্প্রসারণের জন্য নির্ধারিত জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ও যানজট পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়ার সময় এক ধরনের নকশা দেখানো হলেও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ভিন্নভাবে। কোথাও অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, কোথাও নির্ধারিত খালি জায়গা দখল, আবার কোথাও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ভবনকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এসব নিয়ম ভাঙা হচ্ছে প্রতিযোগিতা করে। কেউ এক মিটার ছাড়লে অন্যজন আধা মিটার ছাড়েন। আরেকজন দাবি করে বসেন, তিনি আর না ছাড়লেও চলবে। আর এসব প্রতিযোগিতা বেশি হয়ে থাকে প্রভাবশালীদের মাঝে। কিছু ক্ষেত্রে অর্থ আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। কোনো রকমে একবার ভবন উঠে গেলেই যেন সবশেষ। পরে শুধু ২/১টি নোটিশ ছাড়া কার্যকর তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। কিছু কিছু দুর্বলদের স্থাপনা উচ্ছেদ হলেও ক্ষমতাবানরা থেকে যান বহালতবিয়তে।
সরেজমিন অভিযোগ পাওয়া গেছে, নগরের চেরাগি পাহাড় মোড়ে এস আলমের মালিকানাধীন একটি ২৩তলা ভবন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। একইভাবে নূর আহাম্মদ চৌধুরী সড়কে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের প্রভাবে তাঁর শ্বশুরের জায়গায় ১২ তলার অনুমোদন নিয়ে ২২ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের চতুর্দিকে জায়গা ছাড়ার কথা থাকলেও ছাড়া হয়নি। একইভাবে নগরের আশ্রাফ আলী রোডের পূরবী সিনেমার পাশে মো. লোকমানের কয়েকটি ভবনও অতিরিক্ত উচ্চতাসম্মত, প্রয়োজনীয় জায়গাও ছাড়া হয়নি। এমনকি নগরের ফিরিঙ্গী বাজারে অন্যজনের জমিতে প্ল্যান পাস করিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে চন্দন সিন্ডিকেট।
নগরবাসীর অভিযোগ, বন্দরনগরীর অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র রিয়াজউদ্দীন বাজারে দুই শতাধিক বহুতল ভবন ও ১০ হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। কিন্তু কোনো ভবনেই পার্কিং স্পেস নেই, এমনকি ভবনের পাশে ও সামনে পেছনে যে জায়গা ছাড়ার কথা, তা ছাড়া হয়নি। এমনভাবে দোকান বসানো হয়েছে মানুষের হাঁটাও দায়। একইভাবে চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জে প্রায় ৬ হাজার দোকান, গুদাম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বহুতল ভবন রয়েছে কয়েক হাজার। আসাদগঞ্জে কয়েকশ বহুতল ভবন এবং ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারের অধিক পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু এসব এলাকায় ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত আইন মানা হয়নি। ভবন নির্মাণে যে পরিমাণ জায়গা ছাড়ার কথা তা ছাড়া হয়নি। ফলে জনভোগান্তি নিত্যসঙ্গী। নগর ভবনের আশপাশে কোতোয়ালি, পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গি বাজার, আলকরণ, আন্দরকিল্লা, নন্দনকানন, এনায়েত বাজার, জুবিলি রোডেও একই অবস্থা। শুধু এগুলোই নয়, একইভাবে নগরের বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, চকবাজার, দেওয়ান বাজার, জামালখান, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, দেওয়ান হাট, চৌমুহনী, কদমতলী, পাঠানটুলী, আগ্রবাদ, ইপিজেড, পতেঙ্গা, পাহাড়তলীসহ নগরের প্রায় সব এলাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ভবন নির্মাণ নীতিমালা মানা হয়নি। নির্বিচারে পাহাড় ধ্বংস ও জলাধার ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে কিছু ব্যক্তি সাময়িক লাভবান হলেও ক্ষতিটা হয়েছে সামগ্রিক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভবন নির্মাণে আইন না মানার প্রবণতা। নিয়ম ভঙ্গ করে গড়ে ওঠা এসব ভবনের কারণে আবাসিক এলাকাগুলোতে সূর্যের আলো-বাতাস প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগুন বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সূত্র অবশ্য দাবি করেছে, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় সব ভবন নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত নির্মাণ ঠেকানো এবং আইন প্রয়োগে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সংস্থাটিকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিএ‘র একাধিক কর্মকর্তা জানান, নকশা বহির্ভূত স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও অনেক সময় আইনি জটিলতায় করা সম্ভব হয় না। অসৎ ব্যক্তিরা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্থাপনা নির্মাণ ও ব্যবহার করেন। সিডিএ ব্যবস্থা নিতে চাইলে আদালতের মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতির কারণ দেখিয়ে ‘স্টে অর্ডার’ নিয়ে আসেন। ফলে আর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। মামলা জটিলতায় এমন বহু ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না সিডিএ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘অনুমোদিত ডিজাইনের বাইরে ভবন নির্মাণ গুরুতর অপরাধ এবং এর ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা জনগণকে সতর্ক করছি। পাশাপাশি অভিযান চলমান। আইন মানতে বাধ্য করার চেয়ে জনসচেতনতা বেশি জরুরি।’ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, সিডিএ’র অনুমোদিত ডিজাইনের বাইরে অতিরিক্ত তলা বা ফ্লোর না বাড়ানো, ভবনের চারপাশে সিডিএ নির্ধারিত বাধ্যতামূলক খালি জায়গা (সেটব্যাক) রাখা, রাস্তার দিকে বা পাশের সীমানার ওপর বাড়তি বারান্দা বা সানশেড বড় না করা, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ বেইজমেন্টকে বাণিজ্যিক দোকান বা গুদামে রূপান্তর না করা, ভবনের মূল কাঠামোগত পিলার এবং বিমের পজিশন অনুমতি ছাড়া না বদলানো, নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে দেয়াল না তোলার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সিডিএ’র সদস্য (অর্থ ও প্রশাসন) মো. নুরুল্লাহ নূরী বলেন, ‘ভবন নির্মাণে আইন না মানা দুঃখজনক। বর্তমান চেয়ারম্যান এসব বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে দেখছেন। কিছু ভবনে অভিযান চালানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ অভিযান আরো জোরদার করা হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









