রাজধানীসহ দেশজুড়ে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরে ঘরে চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির সারি আরও দীর্ঘ হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায় কাজকর্ম। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ভোক্তাদের পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। অন্য দিকে মহেশখালীতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অন্যতম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে এসেছেন।
গতকাল শনিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেশে রয়েছে এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করলে শিগগির গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে মঙ্গলবার এই ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘন ফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব এখনো কাটেনি। আবাসিক এলাকায় চুলা না জ্বলা, সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। এমনিতেই দেশের চাহিদার চেয়ে ৩০ শতাংশ গ্যাস কম সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে এলএনজিসহ গ্যাস সরবরাহ হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এখন তা নেমেএসেছে ২২০ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ৪৫ শতাংশ গ্যাস কম দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার থেকে রাজধানীসহ সারা দেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক স্টেশন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। ’সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশ ‘-এর (সিএফএসসিডব্লিইওএ) সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন চালাতে অন্তত ১৫ পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি (পিএসআই) চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় এখন চার থেকে পাঁচ পিএসআই, কোথাও আবার দুই পিএসআইয়েরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে রান্না করছেন।
মিরপুরের বাসিন্দারা জানান, দিনের বেশিরভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। কয়েকদিন ধরে একই পরিস্থিতি চলছে। বিকেলের দিকে কিছুক্ষণের জন্য গ্যাস থাকে, তাও চাপ কম। গভীর রাতে আবার গ্যাস আসে। রাত জেগে রান্নাবান্না ও পানি ফোটাতে হচ্ছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে গতকাল মোহাম্মদপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছেন। সেখানে বক্তারা দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান, নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সরবরাহ না দিয়েও বিল আদায় বন্ধের দাবি জানান। অন্যদিকে গ্যাসের ঘাটতিতে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।
’তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি’-র মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনালে ত্রুটির আগে প্রতিদিন ১৫০ কোটি ঘনফুট পাওয়া গেলেও তা নেমে এসেছে ১২০ কোটি ঘনফুটে।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে মঙ্গলবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৯৫-১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। ’রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড’ (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা দেশে এসেছেন। তাদের পরিদর্শন শেষে মেরামত কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। তবে কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
বাংলাদেশে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি মহেশখালীতে দেশের ১ম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউ চালু করে। ১৫ বছরের চুক্তিতে দিনে ৬০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার এই টার্মিনাল চালাচ্ছে কোম্পানিটি। আর ২০২০ সাল থেকে দেশীয় সামিট গ্রুপ মহেশখালীতেই ২য় এফএসআরইউ চালু করে। এটির সরবরাহ দৈনিক ৫০ কোটি ঘন ফুট। তবে এই টার্মিনালগুলোতে প্রায়ই কারিগরি ত্রুটি দেখা যাচ্ছে। চলতি বছর কমপক্ষে ৩ দফা কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয় একই টার্মিনালে।
পেট্রোবাংলার দুজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, একটি এফএসআরইউর জীবনকাল হয় ২৫-৩০ বছর। এক্সিলারেটের টার্মিনালটি ছিল ১১ বছরের পুরোনো। ইতোমধ্যে আরও ৮ বছর হয়ে গেছে। ফলে এটি তার জীবনকালের বেশি সময় অতিবাহিত করে ফেলছে। তাই যান্ত্রিক সমস্যায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
সাভারের আশুলিয়া সিএনজি স্টেশনসহ বাসাবাড়িতে তীব্র গ্যাস সংকট গতকালও অব্যাহত ছিল। গত পরশু সকালে হেমায়েতপুরে সিএনজি স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বাসচালকরা জানান, ১ ঘণ্টা ধরে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। সিএনজি স্টেশনের মালিকরা জানান, গ্যাসের চাপ নেই। চালকদের চাহিদা মতো গ্যাস দিতে পারছেন না।
নারায়ণগঞ্জ নগরীতেও গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। ঘরে ঘরে চুলা জ্বলছে না। খাওয়া-দাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। দেওভোগ শুক্কুর ক্বারি মসজিদ এলাকার বাসিন্দারা জানান, বাসায় গ্যাস আসে বিকেল ৪টার দিকে। চলে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। ৩-৪ দিন ধরে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাধ্য হয়ে অনেকে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার শুরু করেছেন। এদিকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। নগরীর নতুন জেলখানা এলাকার সিএনজি পাম্পের কর্মচারীরা জানান, প্রতিদিন এখন সিএনজি পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারি লেগে থাকছে। ৩-চারদিন ধরে অবস্থা খুবই খারাপ।
নরসিংদীতেও চারদিন ধরে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। শিল্পাঞ্চলটির শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সিএনজি ফিলিং ও বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা বলেন, খুব সকালে গাড়ি নিয়ে রায়পুরা থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর বিভিন্ন পাম্পে খুঁজেও কোথাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









