ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনের 'ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি' নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের 'সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার' হিসেবে ভারতের অবস্থান সুসংহত করতে ঢাকার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা আরো জোরদার করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এ কমিটি।
প্রবীণ কংগ্রেস এমপি শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তাদের নবম প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে বিদেশি শক্তিগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
তারা সতর্ক করে বলেছে, 'বন্ধু নয় এমন কোনো দেশ' যদি বাংলাদেশে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে সেটি ভারতের জন্য গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে।
এদিকে ভারত সরকার দেশটির সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথচ ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, নানা বিবৃতিও আসছে তাঁর নামে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে তিনি সাক্ষাৎকারও দিচ্ছেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। শেখ হাসিনার চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার সাম্প্রতিক ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এ অবস্থান জানিয়েছে ভারত সরকার। তবে শেখ হাসিনার এমন কর্মকাণ্ডের বিপরীতে ভারত সরকারের এই মন্তব্যকে ‘স্ববিরোধী’ ও ‘ধোঁয়াশাচ্ছন্ন’ বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিষয়ক পর্যবেক্ষণ/সুপারিশের ওপর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ' শীর্ষক প্রতিবেদনটি গত বৃহস্পতিবার ভারতের সংসদে উত্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বন্দর সম্প্রসারণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে। এতে বিশেষভাবে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প ও লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোংলা বন্দরে ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের একটি সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫ সালের মার্চে চীনের সঙ্গে চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের সহায়তায় লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটির উন্নয়ন করা হচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস জানিয়েছে, সামরিক ব্যবহারের জন্য এই মুহূর্তে ওই এয়ারস্ট্রিপ আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেই। পেকুয়ায় চীনের সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে ভারতের সংসদীয় কমিটি। তারা জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মাত্র দুটি সাবমেরিন থাকলেও এই ঘাঁটিতে আটটি সাবমেরিন রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারি গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টি স্বীকার করেছে ভারতের ওই সংসদীয় কমিটি। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের কথা বিবেচনা করে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে চীনের সহায়তায় লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটির উন্নয়ন এই কমিটির জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।' সংসদীয় এই প্যানেল জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদলের সাম্প্রতিক চীন সফরের কথাও উল্লেখ করেছে।
কমিটি বলছে, এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বেইজিংয়ের বিস্তৃত সম্পৃক্ততারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক আরো গভীর করতে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতের তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থাকে কাজে লাগানোর সুপারিশ করেছে কমিটি। তারা বলেছে, মোংলা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে খুলনা-মোংলা রেলপথের অর্থায়ন ও নির্মাণকাজ ভারতই করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিও সই করেছে ভারত।
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালান, মৌলবাদ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি আরো বেশি কৌশলগত মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার পাশাপাশি ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা, মোশন সেন্সর ও স্যাটেলাইটভিত্তিক সিস্টেমের মতো উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত অপরাধে ভূমিকা রাখা দুর্বলতাগুলো কমিয়ে আনতে সীমান্ত এলাকায় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছে ভারতের সংসদীয় কমিটি কমিটি।
বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণ ‘ইতিবাচক’
ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে। লোকসভায় উপস্থাপিত ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নয়াদিল্লির সামনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস্তববাদী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির মতে, বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন এবং অন্যান্য বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর ফলে অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে ভারতকে সক্রিয় ও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সংযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি, যাতে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও সহজ হয়।
কমিটি আরও বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









