বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে মাত্র সপ্তাহ খানেক। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের শিরোপা জয়ের চেয়ে এখন বেশি আলোচনায় ফিফার বিশ্বকাপ ‘বিক্রি’ ইস্যু। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ফিফার টুর্নামেন্টগুলো একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে আর্থিকভাবে আরও লাভবান হতে চায়। সেই অর্থ সদস্য দেশগুলোকেও ভাগ করে দেওয়ার কথা বলছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সদস্য দেশগুলোকে এই প্রকল্পের ব্যাপারে মতামত জানাতে বলেছেন ফিফা সভাপতি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও ফিফার কাছ থেকে এমন বার্তা পেয়েছে। উয়েফা, কনকাকাফ ইতোমধ্যে ফিফার এই প্রকল্প নাকচ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে তারা বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণাও দিয়েছে।
বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল দেশগুলো মূলত ফিফার অনুদানে চলে। এই প্রকল্প পাশ হলে বাংলাদেশের চার বছরের চক্রে কয়েকশ’ কোটি টাকা ফিফা থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অর্থের ঝনঝনানি থাকলেও ফুটবলের মৌলিকতা নষ্টের শঙ্কায় বিশ্ব ফুটবলের বড় দেশগুলো এ নিয়ে নেতিবাচক অবস্থায়। বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নির্বাহী কমিটির সভায় উত্থাপন করব। কমিটিতে আলোচনার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
ফিফা সভাপতির অন্যতম ভোট ব্যাংক এশিয়া ও আফ্রিকা। কারণ এই মহাদেশের ফুটবল মূলত ফিফার অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। বড় অঙ্কের অনুদানের মাধ্যমে ইতোপূর্বে ভোটের হিসাব পক্ষে আনা হয়েছে আগেও। এবারও সেই রকম কৌশল মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে গতকাল এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে উয়েফা এবং কনকাকাফের সঙ্গে একমত পোষণ করে। যদিও সেই বিবৃতি উয়েফার মতো ততটা কড়া নয়। তারা ফিফাকে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে এই বিষয় আলোচনা করে পুনরায় বিবেচনা করার তাগিদ জানিয়েছে। বাফুফে সদস্য মাহফুজা আক্তার কিরণ এএফসির নির্বাহী সদস্য। এএফসি বিবৃতি দিলেও এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সভা এখনও হয়নি বলেই নিশ্চিত করলেন তিনিও।
প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান এএফসির
এদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পর এবার ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার ৪৭টি সদস্য দেশের এই সংস্থাটি। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে এএফসি জানায়, ফিফার এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বৈশ্বিক ঐকমত্য অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বের সব কনফেডারেশন ও ফুটবল খেলুড়ে দেশগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণ। তাই টুর্নামেন্টের ঐক্য ও সার্বজনীন চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এমন যেকোনো উদ্যোগ নতুন করে ভাবা উচিত।
এর আগে একই ধরনের আপত্তি জানিয়েছিল ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফ।এএফসিও তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করায় ইনফান্তিনোর প্রস্তাব বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এএফসির অবস্থান ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফিফার দীর্ঘদিনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন। তিনি এই পরিকল্পাকে ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখার শামিল’ এবং ‘ভুল চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।
ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্ব ফুটবলের প্রধান প্রতিযোগিতাগুলো পরিচালনার জন্য একটি আলাদা বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রাইভেট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটার্নাল-এর মতো বিনিয়োগকারীদের সংখ্যালঘু অংশীদার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেপি মরগানের তৈরি প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলোর আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহাদেশীয় সংস্থা।
ফিফার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এই প্রস্তাব পাস করতে ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ১০৬টি ভোট প্রয়োজন। কিন্তু উয়েফার ৫৫, কনকাকাফের ৩৫ এবং এএফসির ৪৬ সদস্য—এই তিন কনফেডারেশনের সম্মিলিত ভোটই ১৩৬। ফলে তারা যদি একজোট থাকে, তাহলে প্রস্তাবটি অনুমোদনের সম্ভাবনা কার্যত খুবই ক্ষীণ।
এএফসি আরও অভিযোগ করেছে, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতাই তুলে ধরেছে। অন্যদিকে উয়েফা আগেই সতর্ক করে জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তারা বিশ্বকাপ বয়কটের মতো কঠোর অবস্থানও বিবেচনা করতে পারে। যদিও ফিফার দাবি, তারা ‘ফুটবল বিক্রি’ করতে চায় না এবং পুরো বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা। তবে বিশ্বের তিনটি বড় কনফেডারেশনের প্রকাশ্য বিরোধিতার মুখে ইনফান্তিনোর এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









