কাজের সন্ধানে ভোরবেলা রাস্তার পাশে এসে সারি বেঁধে বসে ছিলেন কয়েকজন হতদরিদ্র দিনমজুর। কিন্তু তাদের আর কাজে যাওয়া হয়নি। সড়কে চলন্ত একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চোখের পলকেই পিষে ফেলে সেই শ্রমিকদের। বগুড়া সদর উপজেলায় বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে সাতজনের। বিকেলে একই এলাকায় প্রাইভেটকারের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন এক দম্পতি। অন্যদিকে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন মারা যান। তিন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মোট ১৮ জন। আহত হন অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ জন।
বগুড়া : গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে বগুড়া সদর উপজেলার ফাপড় এলাকার বেলাল, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আমিরুল ও নূর আলমের নাম জানা গেছে। বাকিদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানায়।
বগুড়া সদর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, সকালে ঢাকা থেকে নওগাঁর উদ্দেশে ছেড়ে আসা শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস এরুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এ সময় সড়কের পাশে অবস্থানরত দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর উঠে পড়ে বাসটি। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অন্তত ২০ জনকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো চারজনের মৃত্যু হয়। ফলে এ দুর্ঘটনায় মোট সাতজন শ্রমিক মারা যান।
নিহত ও আহত সবাই কাজের সন্ধানে ভোরে এরুলিয়া বাজারে বসা শ্রমিকের হাটে এসেছিলেন। রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দিনমজুররা প্রতিদিন ভোরে এই হাটে কাজের সন্ধানে আসেন। স্থানীয় গৃহস্থরা এখান থেকেই শ্রমিক সংগ্রহ করেন।
সিলেট : ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর এলাকায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হন। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বেঙ্গল পরিবহন ও ইউনিক পরিবহনের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহতরা সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী বলে জানায় পুলিশ। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই আটজন মারা যান। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরো একজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে একজন শিশু এবং বাকিরা প্রাপ্তবয়স্ক।
ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাস ও সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউনিক পরিবহনের একটি বাস দয়ামীর এলাকায় পৌঁছালে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। তিনি আরো জানান, নিহতরা সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী। আহতদের বেশির ভাগ একই বাসের যাত্রী। এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে এখনো হতাহতদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে দুই বাসের সংঘর্ষের পর হতাহতদের অবস্থা দেখে তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন। দুর্ঘটনার জন্য তারা বেঙ্গল পরিবহনের বাসটিকে দায়ী করেন।
বগুড়ায় ফের দুর্ঘটনায় দম্পতি নিহত
বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় একই দিনে আবারও প্রাণহানি ঘটেছে। বিকেলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি প্রাইভেটকারের ধাক্কায় এবার মোটর সাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী মারা যান। এ ঘটনায় তাদের আট বছর বয়সী নাতি গুরুতর আহত হয়। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক সড়কের এরুলিয়া বিমানবন্দরের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন- বগুড়া শহরের আটাপাড়া এলাকার মৃত মোসলেম উদ্দিনের ছেলে ব্যবসায়ী বাবুল হাসান (৫৫) এবং তার স্ত্রী জেসমিন বিবি (৪৭)। দুর্ঘটনায় আহত নাতি জুলকার নাঈন (৮) নিহত বাবুল হাসানের বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজার সন্তান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাবুল হাসান তার স্ত্রী ও নাতিকে নিয়ে মোটর সাইকেল যোগে কাহালু উপজেলায় বড় ছেলের বাসায় দাওয়াত খেতে যাচ্ছিলেন। পথে এরুলিয়া বিমানবন্দরের সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রাইভেটকারটির সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলটির সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বাবুল হাসান মারা যান। স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ গুরুতর আহত অবস্থায় জেসমিন বিবি ও শিশু জুলকার নাঈনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেসমিন বিবি মারা যান। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন দুটি বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী আমজাদ হোসেন মন্ডল আরো জানান, মোটরসাইকেল চালক তার পরিবারকে বাঁচাতে গাড়িটি রাস্তার একদম বাঁয়ে নামিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আসা প্রাইভেটকার সরাসরি মোটর সাইকেলটিকে আঘাত করে। বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মরদেহ ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বগুড়ায় তদন্ত কমিটি
বগুড়া সদর উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ হারানো যাত্রীবাহী বাসের চাপায় সাত শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এ তথ্য জানান। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. মাসুদ হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- জেলা পুলিশের একজন প্রতিনিধি এবং সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ঘটনাস্থলে স্পিড ব্রেকার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি বিধি অনুযায়ী নিহত প্রত্যেকের পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা এবং আহত প্রত্যেকের পরিবারের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি আরো জানান, আহতদের চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সরকারি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। আহতদের চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, যারা স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে আগ্রহী, তারা শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে যোগাযোগ করতে পারেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









