জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি শেষপর্যন্ত মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করলে তাঁর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এজন্য প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পর গত শনিবার মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে লিখিত সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরও করেছেন।
আজ নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলীয়ভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হতে পারে বলেও জানা গেছে। ফলে সবকিছু ঠিক থাকলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে চলছে জোরালো আলোচনা।
বিএনপির একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদই হচ্ছেন দলটির পরবর্তী মহাসচিব, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে আপাতত ‘ভারপ্রাপ্ত’ হয়েই থাকতে হবে তাঁকে।
বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ পদ মহাসচিব। দলের সাংগঠনিক কাঠামো এই পদের ওপর নির্ভর করে। বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপ, কট্টরপন্থা-মধ্যপন্থাসহ সব বিভাজন দূরে সরিয়ে সংগঠনকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার মূল দায়িত্বটুকু পালন করতে হয় মহাসচিবকেই। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিবের পদে বহাল থাকলেও ‘সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার’ এ কাজটি করে যাচ্ছেন তারই ডেপুটি রুহুল কবির রিজভী। তাই ‘ফুলটাইম যোগাযোগের’ পুরস্কার হিসেবে দলের শীর্ষ পদে তাকেই দেখা যাবে শিগগিরই- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী হলে, তাকে দল ও সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হবে। তাই বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসছেন, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। বিএনপির অষ্টম মহাসচিব হিসেবে মোটাদাগে আলোচনায় রয়েছেন চারজন। তাঁরা হলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, দলের জাতীয় কাউন্সিলের আগপর্যন্ত জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কিংবা স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রুহুল কবির রিজভীর পাল্লাই আপাতত ভারী বলে মনে করছেন একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা।
রিজভী ছাড়াও আলোচনায় থাকা তিন নেতারই রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তাঁরা প্রত্যেকেই ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং জিয়া পরিবারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও তাঁরা গ্রহণযোগ্য বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমান সরকারে তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্বে, সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব পালন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। রুহুল কবির রিজভী মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে চার সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর নাম বেশি এলেও সালাহউদ্দিন আহমদের নামও কম আলোচিত নয়। দলের নীতিনির্ধারণর্যতার প্রভাব এবং তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি, তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দলের বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রণয়নে ভূমিকা রেখে আসছেন। এ ছাড়া গুম হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ভারতে নির্বাসনে থাকার কারণে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তিনি বিশেষ মূল্যায়ন পেয়ে থাকেন। দীর্ঘ নির্বাসন জীবন কাটানোর কারণে খুব বেশি মাঠ চষে বেড়াতে না পারলেও দলের চেয়ারম্যানসহ আন্তর্জাতিক টেবিলেও তার অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও মহাসচিব পদে আলোচনায় আছে। তাঁর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক দক্ষতা দীর্ঘদিন দলের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্দোলনের সময় সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো সক্রিয়ভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হলে মহাসচিব হিসেবে তাঁর নামও গুরুত্ব পেতে পারে।
অন্যদিকে অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে সংগঠক হিসেবেও মূল্যায়ন করেন বিএনপির কিছু নেতা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিভাগীয় সমাবেশ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সফলভাবে বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাঠপর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসেবায় নিজেকে সদা নিয়োজিত রাখায় তিনি জিয়া পরিবারেরও বিশ্বস্ত সঙ্গী।
অপরদিকে রুহুল কবির রিজভীকে দলের নেতা-কর্মীরা ‘ত্যাগী নেতা’ হিসেবেই বেশি মূল্যায়ন করেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি, মামলা-হামলা মোকাবিলা এবং দলের দুঃসময়ে দৃঢ় অবস্থানের কারণে নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। শেষ পর্যন্ত এই তিনজনের বাইরেও অন্য কারো নাম সামনে এলেও খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁরা বলছেন, নির্মোহভাবে দেখলে বলা যায়, বিএনপির সর্বস্তরের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে রিজভী আহমেদের। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দলের অনেক সাংগঠনিক কাজে দীর্ঘসময় যুক্ত থাকায় সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন রিজভী। নিষ্ঠার সঙ্গে দলের দেওয়া দায়িত্বটুকু পালন করেছেন। বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে ঝুঁকি নিয়ে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তরুণ ছাত্রনেতা রিজভীর রাজপথে বড় ভূমিকা রয়েছে। দলের জন্য তাঁর ত্যাগের মূল্যায়ন চান সমর্থকরা।
এ ছাড়া রুহুল কবির রিজভী দলের জন্য ‘ফুলটাইম‘ নিবেদিত বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। এ ছাড়া পদাধিকারবলেও তিনিই এই পদের দাবিদার। যদিও এসব নাম নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব পদের জন্য মনোনীত করা হয়নি। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে যাচ্ছেন কি না, তার ওপরও পরবর্তী মহাসচিবের সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করবে।
২০১১ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান এবং পরে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাধারণত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবকে পরবর্তী মহাসচিব মনে করা হয়। প্রথমে মির্জা ফখরুলের মতো রিজভীকেও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হতে পারে। এরপর কাউন্সিলে তাকে ভারমুক্ত করা হতে পারে।
জানতে চাইলে রুহুল কবির রিজভী দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘মহাসচিব পদ নিয়ে কী হচ্ছে আমার জানা নেই। আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশেই দলের নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, যা এখনো অব্যাহত। দল কিভাবে মূল্যায়ন করবে- সেটা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারকরাই ঠিক করবেন।’
এদিকে সরকার গঠনের আগের আলোচনায় বিএনপির মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা নেতাদের মধ্যে অন্যতম স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সরকারে তারা এখন অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। সে তুলনায় রিজভীর ব্যস্ততা কিছুটা কম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সাংগঠনিক যোগাযোগে তার অবদান রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে রিজভীর নামই সামনে আসছে। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিএনপিতে আলোচনা আছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। দলের মহাসচিবের দায়িত্ব তখন শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়, সরকারের সঙ্গে দলীয় সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়া হলে দলের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ হিসাবে তিনি সংগঠনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে করছেন অনেকে। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘসময় ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাত নেতা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠাকালে মহাসচিব ছিলেন অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন মোস্তাফিজুর রহমান, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুস সালাম তালুকদার, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বলেন, রিজভী আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য ফুলটাইম কাজ করছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। দলের সাংগঠনিক বাস্তবতাও তিনি ভালো বোঝেন। দলটির তৃণমূলের কয়েক নেতা জানান, রিজভীর প্রতি তাদের বড় আস্থার জায়গা হলো তার সাংগঠনিক যোগাযোগ।
কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করলেও তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ঢাকা দুই মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ দুজন নেতা বলেন, দুঃসময়ে রুহুল কবির রিজভীর কোনো বিকল্প হয় না। দলের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে তিনি অভিভাবক হিসেবে কাজ করেছেন। তাই মহাসচিব হিসেবে মাঠপর্যায়ে তিনিই সবচেয়ে যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









