যশোর শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ফলে তিন বছরের ব্যবধানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালে ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলেও ২০২৬ সালে পাস করেছে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় পাসের হার কমেছে ২৬ দশমিক ০৫ শতাংশ পয়েন্ট। একই সময়ে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ৭৬১ থেকে কমে হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন। কমেছে ৯ হাজার ২৮৩ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
শুধু শিক্ষার্থীদের ফলেই নয়, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলেও অবনতির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৪ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডে ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী এসএসসিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৫টিতে। ২০২৬ সালে তা আরো কমে হয়েছে ৩৬টি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৩৮৬টি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম।
অন্যদিকে শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২টি। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯টি বা ৪৫০ শতাংশ। ২০২৪ সালের সঙ্গে তুলনা করলে এ সংখ্যা শূন্য থেকে ১১টিতে উঠে এসেছে।
গত সোমবার এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এসব তথ্য জানান যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। পাশাপাশি ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণেও এবার পাসের হার কমেছে। তবে উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। বোর্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে। এক বছরে কমে ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৬ সালে পাসের হার আরো ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পয়েন্ট কমে হয়েছে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। এবার যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২ হাজার ৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন। ফলে অনুত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ থেকে ৮৮ হাজার ৯৭ বাদ দিলে ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন।
২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩১৯ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ৫ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৪ হাজার ২২২ জন। একই সময়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮ হাজার ৩১১ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে।
২০২৫ সালে যেখানে মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ অনুত্তীর্ণ হয়েছিল, ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছরে অনুত্তীর্ণের হার বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ ৫ এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পতন হয়েছে। ২০২৪ সালে ২০ হাজার ৭৬১ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪১৯ জনে। এক বছরে কমে ৫ হাজার ৩৪২ জন। ২০২৬ সালে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো ৩ হাজার ৯৪১ জন কমে হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ৯ হাজার ২৮৩ জন। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা প্রায় ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ কমেছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের হিসাবেও পরিবর্তনের মাত্রা আরো স্পষ্ট। ২০২২ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১৩টি। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ১৯৩টি। ২০২৪ সালে আবার ৪২২টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭৫টিতে। এবার ৩৬টিতে।
শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে ৩টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ ফেল করেছিল। ২০২৪ সালে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। ২০২৫ সালে ছিল ২টি। এবার হয়েছে ১১টি। অর্থাৎ ২০২৫ সালের তুলনায় শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ গুণ হয়েছে।
এবার শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যশোরের ৪টি, সাতক্ষীরার ৪টি, খুলনার ২টি এবং বাগেরহাটের ১টি। যশোরের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মণিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল, শার্শা উপজেলার সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল।
এসব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থী সংখ্যাও কম। হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষার্থী ছিল ১ জন, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল থেকে ৩ জন, সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল থেকে ২ জন এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল থেকে ১ জন। অর্থাৎ যশোরের চারটি শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র ৭ জন। তাদের একজনও উত্তীর্ণ হয়নি।
সাতক্ষীরার শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাতক্ষীরা নাইসা সেকেন্ডারি স্কুল, গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল, বাবুরাবাদ ধাপুখালি সেকেন্ডারি স্কুল এবং সাহেবখালি সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল যথাক্রমে ৭, ৪, ৪ ও ৪ জন। খুলনার কাতেঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আসমা সরওয়ার ইসলামিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী ছিল ৪ জন করে। বাগেরহাটের ডি এন একতা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী ছিল ২ জন।
তবে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় একজন বা কয়েকজন শিক্ষার্থীও ফলাফলের শতকরা হারকে সরাসরি প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল হলে সেখানে শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বক্তব্যে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফল বিশ্লেষণে তাই শুধু মোট পাসের হার নয়, এসব বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক ফলও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ দুটি মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে তা একদিকে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায়, অন্যদিকে উচ্চ গ্রেড পাওয়ার সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়।
মোবাইল ফোনের ব্যবহারকেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তবে এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে সমস্যার কাঠামোগত দিকগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং বাড়িতে পড়াশোনার সুযোগের মতো বিষয়ও ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশে নেমে আসা পাসের হারকে তিন বছরের ধারাবাহিক পতন হিসেবে দেখলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সময়ে জিপিএ ৫ কমেছে ২০ হাজার ৭৬১ থেকে ১১ হাজার ৪৭৮ জনে। অর্থাৎ শুধু পাসের নিচের স্তরেই নয়, সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনের ক্ষেত্রেও বোর্ডের ফলের মান কমেছে।
এ পরিস্থিতিতে ফলাফলের কারণ চিহ্নিত করতে শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন বিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, কোন এলাকায় পাসের হার বেশি কমেছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উপস্থিতির সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক কতটা এবং ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে সমস্যার কারণ নির্ণয় সহজ হবে।
সমাধানের ক্ষেত্রে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক সহায়তা ক্লাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ তদারকি চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ফল প্রকাশের পর এখন মূল প্রশ্ন হলো, কেন তিন বছরের ব্যবধানে যশোর বোর্ডের পাসের হার ২৬ দশমিক ০৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তি প্রায় ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ কমল। একই সঙ্গে কেন শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৪২২টি থেকে ৩৬টিতে নেমে গেল এবং শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান শূন্য থেকে ১১টিতে পৌঁছাল। এসব প্রশ্নের উত্তর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফল, বিষয়ভিত্তিক ফল এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই বের করা সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









