তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দেশজুড়ে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট আরো প্রকট। বিশেষত, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলোয় দিনে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পাশাপাশি গ্যাসের চাপ না থাকায় থমকে গেছে কারখানার চাকা। শিল্পকারখানায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রম। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বন্ধ থাকছে বেশিরভাগই। যেগুলো খোলা সেগুলোতেও লম্বা লাইন দিয়েও মিলছে না গ্যাস। ফলে রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচলে প্রায় অচলাবস্থায় বাড়ছে ভাড়া, কর্মহীন চালক-শ্রমিকেরা।
গ্যাস-বিদ্যুতের এই অভাবে দেখা দিয়েছে পানির সংকটও। বাসা-বাড়িতে রান্না-বান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গৃহিণীরা। গ্যাস না থাকায় লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। এতে দুর্ভোগ আরো বেড়ে গেছে। কর্মজীবীদের ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আবাসিক ঘরবাড়িতে সারাদিনই চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছেন কম। ফলে জীবন-জীবিকাসহ ঘর-গৃহস্থালিতে অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে। এর ওপরে বিদ্যুৎ না থাকায় বসতবাড়িতে গিয়েও শান্তি পাচ্ছেন না। এতে মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে গ্যাস না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা।
জনজীবন বিপর্যস্ত: তীব্র গ্যাস সংকটে যানবাহন ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাঁদপুরের প্রধান প্রধান সড়কে কমেছে যানবাহন চলাচল, বেড়েছে যাত্রী ভাড়া। বাসা-বাড়িতে রান্না-বান্নায় হোটেল ও বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে নাগরিকদের। হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা গাজী নাছির বলেন, ‘দিনে গ্যাস থাকে না। অনেক সময় রাতে রান্না করতে হয়। আর না হলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।’বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের চাঁদপুর প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মীর ফজলে রাব্বি বলেন, ‘গ্যাসের সংকটটি জাতীয় সমস্যা। এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাবে চাঁদপুরে স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে চাঁদপুরেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।’
উৎপাদন বন্ধের পথে: শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের প্রয়োজনীয় প্রেসার না থাকায় অনেক কারখানায় মেশিন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে ব্যয়, আর শঙ্কা তৈরি হয়েছে সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়েও। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যার হাসপাতালে রোগীদের জন্য লাকড়ির চুলায় রান্না করতে দেখা গেছে। শহর ও শহরতলীর কোনো কোনো এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস প্রায় থাকছেই না। রাতেই গ্যাসের পরিমাণ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। উপায় না পেয়ে অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মাটির চুলো কিংবা স্টোভ দিয়ে রান্নার কাজ করছে। দেওভোগ এলাকার ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গ্যাস নেই, তবু গ্যাস বিল নিচ্ছে।’
গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহ সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, জ্বালানি সংকট এবং লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মত অর্ডার সাপ্লাই দিতে না পারলে মালিক ক্ষতির মুখে পড়বে। সেই সাথে পরবর্তী অর্ডার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অর্ডার চলে যাচ্ছে প্রতিযোগী দেশে।
তিতাসের ডিএমডি ইঞ্জিনিয়ার রাজিব কুমার সাহা জানান, এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটিতে গ্যাসের সংকট হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা অব্যাহত আছে। তিতাসের নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের ডিজিএম মনজুর আজিজ মোহন বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহের প্রধান উৎস এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড গ্যাসিফিকেশন ইউনিট)-এর দুটি ইউনিটের একটিতে আগুন লেগেছিল। সেটি মেরামত শেষে নতুন করে সংযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ফলে গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহে স্বল্পতা তৈরি হয়েছে।’
থমকে গেছে কারখানার চাকা: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকটে থমকে গেছে শিল্পের স্বাভাবিক গতি। দিনের ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টাই প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, কোথাও কারখানার মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। উৎপাদন কমলেও শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় বহাল থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসান। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কারখানা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ভবিষ্যতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুসারে, গ্যাসের স্বল্পচাপে রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের অন্তত ২২টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্প। গ্যাসনির্ভর মেশিন ও ক্যাপটিভ জেনারেটর স্বাভাবিকভাবে চালাতে না পারায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ খুবই কম। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি পাউন্ড সুতায় তাদের ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও পিক আওয়ারে তা নেমে আসে প্রায় এক থেকে দেড় পিএসআইয়ে। কখনো কখনো লাইনে গ্যাসও থাকে না। এতে দৈনিক ২৬ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ডে নেমে এসেছে। রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের প্রেসার এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। কারখানা সচল রাখতে সিএনজি স্টেশন থেকে বোতলে করে গ্যাস কিনে এনে পাইপের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এরপরও মাঝেমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বরপা এলাকার একটি নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় জেনারেটর চালাতে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তারপরও উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
গ্যাস সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রূপগঞ্জের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোও। উপজেলার চারটি ফিলিং স্টেশনের সব কটিতেই স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কোনো কোনো দিন গভীর রাতে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়। দিনের বাকি ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা স্টেশনগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে মালিকদের যেমন লোকসান গুনতে হচ্ছে, তেমনি গ্যাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। অনেককে বিকল্প এলাকায় গিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
রংধনু ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী মশিউর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘসময় স্টেশন বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে লোকসান বহন করছেন। সংকট কেটে গেলে প্রতিষ্ঠানটি আবার লাভজনক অবস্থায় ফিরবে—এই আশাতেই কর্মীদের ধরে রাখা হয়েছে। রূপগঞ্জের অন্য তিনটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনের চিত্রও প্রায় একই। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কমে গেলেও কর্মরতদের চাকরি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের হাতে পর্যাপ্ত কাজ না থাকলেও তাদের বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে লোকসান অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
শাহরিয়ার টেক্সটাইলের মালিক তারিকুল ইসলাম শাকিল ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকট এখন জাতীয় দুর্যোগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকার দ্রুত এ সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে বেশিদিন কারখানা সচল রাখা সম্ভব হবে না। মাস শেষে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে কারখানার চার ভাগের এক ভাগ চালু রেখে বাকি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়নি। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুরো কারখানা চালু করা হবে।
মশিউর স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের মালিক মশিউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস না থাকায় তাদের গ্যাসচালিত জেনারেটর প্রায় সারাদিন বন্ধ থাকে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং লোডশেডিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কাউকেই এখন পর্যন্ত ছাঁটাই করা হয়নি। কিন্তু প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ না থাকলেও তাদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় রূপগঞ্জের অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে মালিকরা বাধ্য হতে পারেন। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এম জেড স্পিনিংয়ের একজন জেনারেটর প্রকৌশলী বলেন, গ্যাস না থাকায় জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মালিকপক্ষ কর্মীদের বসিয়ে রেখেও বেতন দিচ্ছেন। এতে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন কর্মীদের বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে তারাও উদ্বিগ্ন। অনেক শ্রমিক-কর্মচারী নিজেদের কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
এ-ওয়ান পোলার লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহেদ হোসাইন বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব শ্রমিকদের আয়েও পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় অতিরিক্ত সময়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের বাড়তি আয় কমে গেছে। শিল্প মালিকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, উৎপাদন কমলেও স্থায়ী ব্যয় কমছে না। শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচ। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয়।
গ্যাস সংকটে রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার হারানোর আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাকের পুরো সরবরাহব্যবস্থায়।
বিটিএমএ’র সাবেক সহসভাপতি মো. সালেউদ জামান খান বলেন, রূপগঞ্জ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব রপ্তানি আয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই, দ্রুত এ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িকভাবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন এভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। এতে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন সংকটটি শুধু গ্যাসের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ।
সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাইনের সংস্কারকাজ চলমান থাকায় সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কমেছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তারা।
বিটিএমএ’র সাবেক সহসভাপতি মো. সালেউদ জামান খান বলেন, রূপগঞ্জ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব রপ্তানি আয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। গ্যাস সংকটে পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অচল শিল্পকারখানা: হবিগঞ্জের মাধবপুর শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ গ্যাস সংকটে উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার ছোট-বড় অর্ধশতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন শিল্পমালিক,কর্মকর্তা-কর্মচারী ও হাজারো শ্রমিক। হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, পার্কটিতে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা কাজ করেন।
বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমান আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশলী) আবুল হোসেন জানান, তাদের ছয়টি কারখানার মধ্যে চারটিই শতভাগ রপ্তানীমুখী। দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে সেই সরবরাহও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের সহায়তায় সীমিত পরিসরে কিছু জরুরি যন্ত্রপাতি সচল রাখা হয়েছে।
গ্যাস সংকটে চরম বিপাকে পড়েছে তুলা ও সূতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্টানগুলোও। এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাদের দৈনিক প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।
ফারইস্ট স্পিনিং মিলের ম্যানেজার সুমন আহমেদ বলেন, গ্যাস না থাকায় সোলার বিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিডের সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কার্য়ক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন তারা। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো শিল্পখাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
স্কয়ার ডেনিম,স্টার সিরামিক্রসহ বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানার অধিকাংশই নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটেও পড়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।
হবিগঞ্জের ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মধ্যেও বিরাজ করছে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা। যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শ্রমিক আলী আকবর বলেন, হাজার হাজার শ্রমিক এসব কারখানার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে পরিবার নিয়ে মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সংকট দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে হয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ফিলিং স্টেশন বন্ধ: গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবকটি ফিলিং স্টেশন। গ্যাসের অভাবে সড়ক-মহাসড়কে অটোরিকশাসহ যানবাহন চলাচল কমে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন তারা। সরাইলের সোপান ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আজিজুল হক জানান, যানবাহনে গ্যাস না দিতে পারায় ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছেন। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পনি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক বলেন, এলএনজি সংকটে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা চায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র: লোডশেডিং ঘিরে বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামালপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে জেলার বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে তারা। পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. সাহিদুল ইসলাম জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ পাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে গ্রাহকেরা ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছেন।
তিনি বলেন, কোনো উপকেন্দ্র বা অফিসে হামলা বা ভাঙচুর হলে হাজার হাজার গ্রাহক দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত জরুরি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী। এদিকে ফেসবুক পোস্টে গ্রাহকরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরো অবনতি হয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায় উল্লেখ করে নটাকান্দা এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, সেটাও টানা নয়। ৩০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকলে কয়েক ঘণ্টার জন্য আবার চলে যায়। এবার লোডশেডিং আগের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একই এলাকার মো. রকি ও কাউসার আহম্মেদও তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার কথা জানান। দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না অভিযোগ মেলান্দহের শ্যামপুর এলাকার বাসিন্দা রুকন মিয়ার। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না। ফ্রিজের খাবারও নষ্ট হচ্ছে।
চালকদের সড়ক অবরোধ: চট্টগ্রাম নগরে গ্যাস না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। গতকাল শুক্রবার সকাল সাতটার দিকে নগরের ষোলশহর এলাকায় এ সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দীর্ঘসময় ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করেন অনেক চালক। অপেক্ষার পরও গ্যাস না পেয়ে তাঁরা সড়ক অবরোধ করেন। পরে পুলিশের অনুরোধে একপর্যায়ে সড়ক থেকে সরে যান তাঁরা। গতকাল ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে যান চলাচল তুলনামূলক কম। গ্যাস নিতে ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। চালকদের কেউ কেউ এক দিনের বেশি সময় ধরে গাড়ি নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছেন বলে জানান।
চালক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গ্যাস না পাওয়ায় গাড়ি চালাতে পারছি না। কখন গ্যাস পাব, সেটাও কেউ বলতে পারছে না। এভাবে দিনের পর দিন বসে থাকলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব?’ ফসিল ফিলিং স্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কিছু করার নেই। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে চাঁদপুরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরে গ্যাস সরবরাহের দাবিতে চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা। হাজীগঞ্জ এইচবি ফিলিং স্টেশনের সামনের সড়ক প্রায় আধা ঘণ্টা আটকে রাখার পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অবরোধ তুলে নেন তারা। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও প্রাইভেটকারের চালকেরা জানান, সারারাত নির্ঘুম থেকে দীর্ঘ সারিতে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। এতে আয় কমে যাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









