অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে যখন বাংলার বিজয়কেতন উড়ছে, দেশে তখন সবে সকাল। চোখ কচলে বাংলাদেশের মানুষ যখন স্কোরকার্ড দেখছে, সেই চোখে যেন কোনো বিস্ময় নেই। কিছুটা শঙ্কা মনে কাজ করলেও বেশির ভাগ মানুষই আগের রাতে ঘুমাতে গেছে জয়ের প্রস্তুতি নিয়েই। অথচ চার দিন আগে প্রথম টেস্ট শুরুর আগে বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর চাওয়া ছিল- আহ, যদি অস্ট্রেলিয়ার সাথে অন্তত ড্রটা করা যেত! তা না হলেও নিদেনপক্ষে যেন ইনিংস হারটা এড়ানো যায়!
এমন দিন কবে এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে! কেউ যা ভাবতে পারেনি, কারও কল্পনার সীমায় যা ছিল না, সেটিই বাস্তবে রূপ দিয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সাড়ে তিন দিনেই দাপুটে জয়। ডারউইনে তিন দিন ধরে টাইগাররা ক্যাঙারুদের যে শাসন করে আসছিল। সেই শাসনেরই পূর্ণতা এলো চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনে। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।
স্রেফ জয় বললেও আসলে কিছুই বলা হয় না। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলকে তাদের আঙিনায় সাড়ে তিন দিন ধরে ভুগিয়ে, তাদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে স্রেফ বিধ্বস্ত করে ছাড়ল র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বর দল। বাংলাদেশের দাপট স্পষ্ট হয় একটি তথ্যে, গোটা ম্যাচের ১১ সেশনের একটিতেও এগিয়ে ছিল না অস্ট্রেলিয়া।
প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয়ের বীজ বুনে দিয়েছিলেন বোলাররা। সেখান থেকে ব্যাটসম্যানদের নৈপুণ্যে বিশাল লিড নিয়ে উঁকি দেয় বিশ্বাসের অঙ্কুর। এরপর তা চারা হয়ে বেড়ে উঠতে থাকে এবং ডালপালা ছড়ায়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে। ৫৭ রানের জয়ের লক্ষ্য ছুঁতে বেগ পেতে হয়নি একদমই।
ব্যাট হাতে ৬৫ রানের ইনিংসের পর অসাধারণ বোলিংয়ে ৫ উইকেট নিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং গুঁড়িয়ে দিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হাসান মাহমুদ। তার ১১১ রানে ৯ উইকেট দেশের বাইরে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড।
অস্ট্রেলিয়ায় এখনো কোনো জয়ের মুখ দেখেনি শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তান সবশেষে জিতেছে ১৯৯৫ সালে এবং এরপর থেকে টানা ১৭ টেস্ট হেরেছে। বাংলাদেশ করে ফেলেছে অভাবনীয় কিছুই।
৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে দিন শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। আগের দিন জমে যাওয়া গ্রিন ও অ্যালেক্স কেরির জুটি এদিন আর বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। স্পিনে দক্ষ কেরিকে দারুণ এক ডেলিভারিতে ফেরান মিরাজ। একটু পর আরো দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে তিনি বোল্ড করে দেন বাউ ওয়েবস্টারকে। বিভ্রান্ত ব্যাটসম্যান আউট হয়ে হতভম্ব হয়ে যান পুরোপুরি।
জয়ের সুবাস তখনই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাতাসে। মিরাজ ফিরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকেও। গত অ্যাশেজে বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও ইংল্যান্ডকে ভোগানো মিচেল স্টার্ক এরপর জুটি গড়ার চেষ্টা করেন গ্রিনের সঙ্গে। কিছুটা লড়াই করে লাঞ্চে যায় অস্ট্রেলিয়া। তবে বাংলাদেশও ফিরে আসে প্রবলভাবে। দ্বিতীয় নতুন বলে স্টার্ককে ফিরিয়ে ৪৩ রানের জুটি ভাঙেন তাসকিন আহমেদ।
এক প্রান্তে লড়াই করে গ্রিন পৌঁছে যান সেঞ্চুরিতে। দলে জায়গা টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় থাকা অলরাউন্ডারের ক্যারিয়ার নতুন গতি পাবে এই শতরানে। স্রেফ চারটি চার ও একটি ছক্কা ছিল তার ইনিংসে, তার মনোসংযোগ ও লড়াইয়ের চিত্র ফুটে ওঠে এতেই। তবে এরপর আর বেশিক্ষণ এগোতে পারেননি তিনিও। হাসানের নিচু হওয়া এক ডেলিভারি তার ব্যাটের নিচের অংশে লেগে ছোবল দেয় স্টাম্পে।
ন্যাথান লায়নকে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করার পাশাপাশি ইনিংসও শেষ করে দেন মিরাজ। তার বোলিং পারফরম্যান্স কতটা অসাধারণ, তা বোঝা যাবে একটি তথ্যে। মুত্তিয়া মুরালিধরন, হরভজন সিং, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ইয়াসির শাহ, রবীন্দ্র জাদেজার মতো গ্রেটরা কখনো অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচ উইকেটের স্বাদ পাননি!
ছোট্ট টার্গেট তাড়ায় শূন্য রানে ফেরেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান। ব্যস, হোঁচট বলতে ওই সামান্যটুকুই। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক পরের পথটুকু পাড়ি দেন অনায়াসেই। ৪২ বলে ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন সাদমান, ৩৯ বলে ২৫ রানে মুমিনুল।
টেস্ট অধিনায়ক থাকার সময় এই দেশের টেস্ট সংস্কৃতি বদলানোর সূচনা করেছিলেন মুমিনুল, পেস বিপ্লবের শুরুর পরিকল্পনাও ছিল তার। বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মরণীয়তম জয়টি ধরা দেয় তার বাউন্ডারিতেই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৯৮; বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪২৬; অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৯৫.১ ওভারে ২৮৪ (আগের দিন ১৬১/৪) (গ্রিন ১০৪, কেরি ৩০, ওয়েবস্টার ৫, কামিন্স ৮, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫, হেইজেলউড ০*; তাসকিন ১৮-৩-৬৬-১, হাসান ১৯-৩-৫৬-৩, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ১৭-১-৫১-১, মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫)। বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৫৭) ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (সাদমান ২৫*, তানজিদ ০, মুমিনুল ৩০*; স্টার্ক ৪-০-১৫-০, হেইজেলউড ৩-১-৫-১, লায়ন ৫-০-২৩-০, ওয়েবস্টার ২.২-০-১২-০)। ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ : হাসান মাহমুদ। সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









