ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের কাছে একাধিক অনুরোধবার্তা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এই আবহে আওয়ামী লীগ নেত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয়টি সেদেশের আদালতের সিদ্ধান্তের উপরেই ছাড়তে চাইছে নয়াদিল্লি। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে শীর্ষ পর্যায়ের এক ভারতীয় কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সেদেশের আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে হঠাৎই অনিয়শ্চতা দেখা দিয়েছে।
গতকাল রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে জানানো হয়েছে, তারেকের সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করতে হবে ভারতকে। তার জন্য ভারতের কাছে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসে জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ অগস্ট দিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে।’ অনুকূল পরিবেশ রক্ষায় তাদের আর্জির প্রেক্ষিতে ভারত কী জানায়, তার জন্য তারা অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে গতকাল ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে এক শীর্ষ পর্যায়ের ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাদের আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইনি প্রক্রিয়ায় স্থির হবে যে, হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভারতীয় আইন অনুসারে অপরাধ কি না।’ সম্প্রতি দিল্লিতে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন হাসিনা নিজেই। এই পরিস্থিতিতে তারেকের সম্ভাব্য ভারত সফরে বিষয়টি পুরোপুরি এড়ানো যেত না বলেই মনে করছে নয়াদিল্লি।
২০১৩-র ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি উদ্দেশ্য ছিল, জঙ্গি, পাচারকারী ও চোরাচালানকারীদের পরস্পরের হাতে তুলে দেওয়া। ২০১৬-য় এই চুক্তিতে বেশ কিছু সংশোধন আনা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, কোনও দেশ যদি মনে করে, রাজনৈতিক কারণে কাউকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হচ্ছে, তবে তারা দাবি মানতে বাধ্য নয়। আবার চুক্তির আর একটি ধারায় রয়েছে, প্রত্যর্পণের পরে দীর্ঘ কারাবাস ও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলে অন্য পক্ষের দাবি খারিজ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত ভারতের ঘোষিত অবস্থান হলো, ‘প্রত্যর্পণের অনুরোধ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
শেখ হাসিনার ভারতে থাকা এবং সে দেশ থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো নিয়ে আপত্তি রয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং শাসকদল বিএনপির। এই টানাপড়েনের আবহে গত সোমবার ঢাকায় তারেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী। জুন মাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর সেটাই ছিল তারেকের সঙ্গে দীনেশের প্রথম সাক্ষাৎ। তারেক-সাক্ষাতের পরেই দিল্লি আসেন দীনেশ। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। মনে করা হয়েছিল, তারেক-দীনেশ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে হাসিনা-জট কেটেছে। কিন্তু রবিবার ঢাকার অবস্থান দেখে অনেকেই মনে করছেন, তারেকের এখন ভারতে আসার সম্ভাবনা বেশ ‘প্রতিকূল’।
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকার যে দুই শর্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রক্রিয়া হিসাবে দুটো শর্তের কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার। সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার সিদ্ধান্তের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছে ঢাকা। মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা দরকার। এক্ষেত্রে, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ ত্বরান্বিত করার এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কাজ দ্রুততার সঙ্গে করার অনুরোধ আমরা ভারত সরকারকে করেছি। আমরা তাদের প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় রয়েছি।’
২০২৪ সালের অভ্য্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে আহ্বান জানিয়েছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করছি, এ বিষয়ে কোনো আপডেট থাকলে আপনাদের জানাব।’
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ এবং গত ৫ অগাস্ট দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চাপা উত্তেজনা চললেও আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছে বলে গত শুক্রবার খবর দিয়েছিল এনডিটিভি। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছিল, প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাব্য তারিখ হতে পারে ২২-২৩ অগাস্ট; অর্থাৎ, ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক এক সপ্তাহ পর।এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সম্ভাব্য ওই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে। এখন ঢাকা দুটি শর্তের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরায় প্রধানমন্ত্রীর সফর আবার অনিশ্চয়তায় পড়ল কি না, কর্মকর্তারা সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। শহীদুল করিম বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির আলোকে প্রতিবেশী দেশসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে ঢাকা। তিনি বলেন, এই নীতির ভিত্তি হচ্ছে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক কল্যাণ।
চিফ প্রসিকিউটর যা বলছেন
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে, সেটি দেশটির নিজস্ব বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে একথা বলেন তিনি। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ভারত আদালতের অনুমোদন নিয়ে তাকে পাঠাবে, নাকি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে সেই সিদ্ধান্ত ভারত নেবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। এখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাকে বাংলাদেশে পাঠাবে, তা ভারতের বিষয়। তারা কোর্টের অনুমোদন নেবে, না সরকারের অনুমোদন দিয়ে পাঠাবে এটা তাদের ব্যাপার। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেহেতু বাংলাদেশে অনেকগুলো মামলা বিচারাধীন, একটিতে তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত। তিনি নিজেও বলেছেন ডিসেম্বরে তিনি আসবেন। আমরা মনে করি, তাকে এর আগেই ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্টের পাঠানো উচিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









