চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির তিনদিন পরও ’ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড’-এর জাহাজটির বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসমুক্ত করার কাজ শেষ হয়নি। গত শনিবারের পর গতকাল রবিবারও দিনভর চেষ্টার পরেও ওই জাহাজের দুর্ঘটনা ঘটা অংশে গ্যাস বিপজ্জনক মাত্রার নিচে নামানো সম্ভব হয়নি।
জাহাজটিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির পর ইয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) কর্তৃপক্ষ । পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। প্রাণহানির ওই ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সভা করেছে। ১১ সদস্যের ওই কমিটি গতকাল ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জাহাজটি পরিদর্শনে যায়।
২৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের এলএনজিবাহী ‘এমটি রাসি’ নামের জাহাজটি ভাঙতে গত বছরের জুলাই মাসে ভাটিয়ারি স্টেশন রোডের ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়। শুক্রবার সকালে ওই জাহাজের নিচের দিকের একটি অংশে কাটার কাজ চলছিল। একটি ট্যাংকারের একাংশ কাটার পর সেটি সরিয়ে নিতে গেলে গ্যাসের প্রভাবে অচেতন হয়ে যান কয়েকজন। পরে তাদের উদ্ধারে গিয়ে বাকিরাও অচেতন হয়ে যান।
ওই ঘটনায় নয়জনের প্রাণ যায়, চিকিৎসাধীন আছেন সাতজন। স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার দুর্ঘটনার পর অচেতন হয়ে পড়াদের উদ্ধারে যারা জাহাজের ওই অংশে গিয়েছিলেন, তারাও অচেতন হয়ে পড়েন। আর যারা ওই জাহাজটির কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েছিলেন, তারাও তীব্র গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ওই শিপ ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই জাহাজ কাটার কাজ চলছিল বলে শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংকে (জলাধার) বিপদজনক মাত্রায় গ্যাস জমে ছিল। সেখান থেকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
জাহাজটি কাটার আগে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে ’বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রাম’-এর পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ’জাহাজ বিচিং বা তীরে ভেড়ানোর সময় আমরা কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করে থাকি। তেল ও গ্যাস কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন শেষে আমরা অনুমতি দেই। এটারও কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন করা হয়েছিল। কার্গো ট্যাংকে কিছু হয়নি। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ওয়াটার ট্যাংকে। তাতে গ্যাস জমে গিয়েছিল। সাখাওয়াত বলেন, ‘শুক্রবার বিকালে আমরা দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করি।
মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সালফাইড অতিরিক্ত মাত্রায় ছিল বলে শনাক্ত করতে পেরেছি। আমাদের ধারণা ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা।’ তিনি বলেন, ’সমন্বিত যে কমিটি হয়েছে, কমিটির মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি আমরা পেয়েছি সেটাকে বের করে নিরাপদ করা হবে। পরে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে।’ ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ দল জাহাজের ওই অংশে যান।
তারা শনিবার বিকাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। রাতে সাখাওয়াত বলেন, ’হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে মিশে থাকে এমন একটি ভারী গ্যাস। এই গ্যাস সরাতে হলে পানি দিয়ে বের করতে হবে। কিন্তু এটা করার মত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সেখানে নেই। তাই আজ কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ’২০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) পর্যন্ত হাইড্রোজেন সালফাইড সহনীয়। ২০-১০০ পিপিএম হল বিপজ্জনক মাত্রার। ১০০ পিপিএম এর উপর এই গ্যাস প্রাণঘাতী।’
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, ‘ পরিবেশ অধিদপ্তর মাল্টি ডিটেকটর দিয়ে পরিমাপ করে দেখেছে। সেখানে ৮৪ পিপিএম, মানে উচ্চমাত্রার গ্যাস রয়ে গেছে। গ্যাসের এরকম উপস্থিতি থাকায় আজ আর কাজ করা হয়নি। আজ সোমবার আবার কাজ শুরু হবে।‘
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বলেন, ’দুর্ঘটনাস্থলে পানি দিলে বিষাক্ত গ্যাস সরে যাচ্ছিল। পরে আবার গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়ায় কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। জাহাজটি সাগরের তীরে ভিড়িয়ে ভাঙার কাজ চলছিল। জাহাজের দুর্ঘটনা যে অংশে ঘটেছে সেখানে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দুর্ঘটনাস্থলে জমা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জোয়ারের পানিতে মিশে আশেপাশে ছড়িয়ে আছে।’
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় গত বছরের জুলাই মাসে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করালেও অতিরিক্ত সময়ের টাকা না দেওয়ার অনিয়ম ধরা পড়ে ওই ইয়ার্ডে। চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিদর্শনে ফের অনিয়ম ধরা পড়ে। বিষয়গুলো সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেয় কলকারখানা অধিদপ্তর। তবে যথাযথ জবাব না পেয়ে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ’আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করি। সেখানে শ্রমিকরা যাযথ বেতন-বোনাস ও চাকরির বেনিফিট পান কিনা, নিরাপত্তার জন্য সরঞ্জাম আছে কিনা এবং আরো কিছু বিষয় আমরা দেখি। এরকম নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকায় নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ‘ কোনো জাহাজ কাটার আগে গ্যাস মুক্ত করেই তা কাটতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ’এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা, তা টেকনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবে।’
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংকে (জলাধার) বিপদজনক মাত্রায় গ্যাস জমে ছিল। সেখান থেকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার দুপুরে ইয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, ’আমরা দেখছি কেন ঘটনাটা ঘটল। যদি এখানে কারও কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ভবিষ্যতে যেন এ রকম ঘটনা না ঘটে।’
ইয়ার্ড পরিদর্শন করল তদন্ত কমিটি
ওই ঘটনা তদন্তে পরদিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গতকাল ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিদর্শন করেছে তদন্ত কমিটি। দুপুরে কমিটির প্রধান এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী বলেন, ‘এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। আমরা এ দুর্ঘটনার সত্যটা উদঘাটনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যতগুলো ব্যাপার দেখার প্রয়োজন, সেটা দেখার চেষ্টা করছি।’ তদন্ত কমিটি শনিবার বিকালে সার্কিট হাউজে দুই ঘণ্টা সভা করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোন কোন বিষয় দেখা দরকার তা নিয়ে সেখানে মতামত নিয়েছি। সে হিসেবে সকাল থেকে তদন্ত কাজ শুরু করেছি।’
পরিদর্শন কার্যক্রম তুলে ধরে কমিটির প্রধান বেনজামিন রিয়াজী বলেন, ‘আমরা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছি—কী কারণে এটা হয়েছিল, কারো গাফিলতি ছিল কি না, এখানে সেফটি মেজারে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, আরো কী ডেভেলপ করা যায়? আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্ব দিচ্ছি, যে শিপটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আরো কোনো টক্সিক গ্যাস থেকে যেতে পারে। এটা যাতে নিরাপদ করে তোলা যায়, এ ব্যাপারে তৎপরতা আছে। আমরাও সহযোগিতা দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ায় কাজ তেমন আগাতে পারছে না। যদি ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ আনতে হয় বা এখানকার বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে এটা করার চেষ্টা চলছে।’ পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে শিল্প সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় আছে কি না, থাকলে তাদের অবহেলা চিহ্নিত করার পাশাপাশি ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম (পিপিই) ছিল কি না, উদ্ধার ও চিকিৎসা কাজে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ও অদক্ষতা ছিল কি না, ইয়ার্ডে ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ছিল কি না এসব বিষয়েও কমিটিকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









