দেশে হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি সামনে এসেছে। অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ হাম এবং মশাবাহিত ডেঙ্গুর রোগীদের পাশাপাশি সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে হাসপাতালে আসা অন্যান্য সাধারণ রোগীদের মধ্যে ক্রস-ইনফেকশন বা আন্তঃসংক্রমণের ঝুঁকি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, হামের ভাইরাস বাতাসে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকে। ফলে পর্যাপ্ত আইসোলেশন বা পৃথক শয্যা নিশ্চিত না করায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও সাধারণ রোগীরা সহজেই হামে সংক্রমিত হচ্ছেন। হাসপাতালের ভেতরে এমন অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ জনস্বাস্থ্য সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। চিকিৎসাকেন্দ্রে এসে নতুন করে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার এই প্রবণতা রোধে অবিলম্বে ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের জন্য পৃথক বিশেষায়িত জোনের দাবি জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
সরেজমিনে রাজধানীর আগারগাঁও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ডেঙ্গু এবং হামে আক্রান্ত রোগীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা চিকিৎসা দিতে দেখা যায়। হাসপাতালটিতে বিশেষায়িত ডেঙ্গু ও হাম কর্নার করা হলেও, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে অন্যান্য সাধারণ রোগীদেরও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, হাসপাতালটির নিচতলায় অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ হাম এবং মশাবাহিত ডেঙ্গুর বিশেষায়িত খোলা ওয়ার্ড দুটির দূরত্ব মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মিটার। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের মশার কামড় থেকে বাঁচাতে মশারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও, গত ১৬ আগস্ট রবিবার কোনো বেডে মশারি দেখা যায়নি। দুই সংক্রামক ব্যাধির মাঝে ক্রস-ইনফেকশন রোধে কোনো কার্যকর আইসোলেশন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে এক ওয়ার্ডের দূষিত বাতাস সহজেই অন্য ওয়ার্ডে চলাচল করছে।
হাসপাতালটিতে ক্রস-ইনফেকশনের আশঙ্কার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে হাম ওয়ার্ডের ভেতরেই হাই ডিপেন্ডেন্সি অ্যান্ড আইসোলেশন (এইচডিঅ্যান্ডআই) ইউনিট। এই ইউনিটে জটিল অস্ত্রোপচার হওয়া শিশু, তীব্র শ্বাসকষ্টের রোগী, আংশিক হার্ট-কিডনি-লিভার বিকল এবং আইসিইউ থেকে স্থানান্তরিত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এই বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডের গা ঘেঁষেই সচল রয়েছে হাসপাতালের মূল আইসিইউ ইউনিট।
একই ছাদের নিচে ডেঙ্গু ও হামের সহাবস্থানে ক্ষোভ স্বজনদের
ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিচতলার বিশেষায়িত ডেঙ্গু ইউনিটে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত এক শিশুকে কোলে নিয়ে ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে আছেন এক পিতা। এ সময় দৈনিক এদিনের এই প্রতিবেদককে দেখে অভিযোগের সুরে তিনি বলেন, তার ছেলে ঠাণ্ডাজনিত রোগে ভুগছে। অথচ বিশেষায়িত ডেঙ্গু ওয়ার্ড নাম দিয়ে একই ওয়ার্ডে সব ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নাসর্কে প্রশ্ন করলে তিনি অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে সব রোগের চিকিৎসা হাসপাতাল প্রশাসনের নির্দেশেই হচ্ছে।
শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আরেক রোগীর অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার সন্তান ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু এখানে আসার পর চারপাশে দেখছি হামের রোগী। তিনি বলেন এখন ডেঙ্গু ভালো হলেও আমার সন্তান এখান থেকে হাম নিয়ে বাড়ি ফিরবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে!
শিশু হাসপাতাল পরিচালকের স্বীকারোক্তি
হাসপাতালের ভেতরে বিপজ্জনক সব ধরনের শিশু রোগীদের সহাবস্থান এবং ক্রস-ইনফেকশনের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলামকে প্রশ্ন করলে, তিনি হাসপাতালের শয্যা ও জায়গার তীব্র সংকটের কথা উল্লেখ করে দায় এড়িয়ে যান। একপর্যায়ে;;;; দৈনিক এদিনের প্রতিবেদককে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা হাসপাতাল বন্ধ করে দিন’। এ সময় তার সহকর্মীদের দিয়ে এই প্রতিবেদককে হেনস্তারও চেষ্টা করা হয়। হাসপাতালটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জায়গা সংকটের অজুহাত তুলে তিনি গণমাধ্যমকে পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন লেখার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। একইসঙ্গে পরিচালক সাফ জানিয়ে দেন, এমন অব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা চলাকালীন ক্রস-ইনফেকশনে কোনো শিশুর মৃত্যু হলে, তার দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা তিনি নিজের কাঁধে নেবেন না।
বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
শিশু হাসপাতালের এই বাস্তবতাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয়কর বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মহামারি গবেষকদের মতে, হামের ভাইরাস অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় ও ভাসমান থাকতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, হামের মতো একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগের রোগীকে পাশাপাশি ডেঙ্গু ওয়ার্ড বা অন্যান্য রোগীদের সাথে এক বাতাসে রাখা যাবে না। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই দুর্বল থাকে। এ অবস্থায় তারা যদি হামের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসে, তবে তাদের শরীরে জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে, যা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, হাসপাতাল হওয়া উচিত রোগ নিরাময়ের জায়গা। কিন্তু পর্যাপ্ত আইসোলেশন বা পৃথক জোন নিশ্চিত না করায় হাসপাতাল নিজেই এখন নতুন করে রোগ ছড়ানোর কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। যে শিশুরা অন্য সাধারণ রোগ বা অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে আসছে, তারাও এখান থেকে হামের সংক্রমণ নিয়ে ফিরছে। এটি মহামারি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে।
ক্রস-ইনফেকশনের ঝুঁকি ও জটিলতা
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাম ও ডেঙ্গুর যৌথ সংক্রমণ একটি শিশুর শরীরের জন্য সহ্য করা কঠিন। ডেঙ্গুর কারণে রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকির পাশাপাশি যদি হামের কারণে তীব্র নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকদের পক্ষেও সেই শিশুকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। করিডোরগুলোতে মশারির ব্যবহার ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিছুটা কাজ করলেও বায়ুবাহিত হামের ভাইরাসের বিরুদ্ধে তা সম্পূর্ণ অকার্যকর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘বিতর্কিত’ মন্তব্য
চলমান এই জনস্বাস্থ্য সংকট ও ক্রস-ইনফেকশনের ঝুঁকি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ হাসপাতালের স্থান সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে কাছাকাছি দূরত্বে হাম ও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা প্রদানের পেছনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন এই কর্মকর্তা।
তবে সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার দায় এড়াতে গিয়ে দৈনিক এদিনের প্রতিবেদকের কাছে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, জায়গা সংকুলান হচ্ছে না জেনেও বাধ্য হয়ে হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের পাশাপাশি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে এর ফলে যদি কোনো রোগীর শারীরিক ক্ষতি বা ক্রস-সংক্রমণ ঘটে, তবে সেই দায়ভার শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর চাপানো যাবে না। এর আংশিক দায় রোগীর স্বজনদেরও নিতে হবে।
বৈশ্বিক মানদণ্ডে বিশেষজ্ঞদের জরুরি সুপারিশ
আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতিমালার আলোকে বিশেষজ্ঞরা এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ।
১) তাৎক্ষণিক ট্রায়াজ ও স্ক্রিনিং ব্যবস্থা : হাসপাতালের প্রবেশমুখেই একটি প্রাথমিক স্ক্রিনিং বুথ স্থাপন করতে হবে। জ্বর ও শরীরে র্যাশ বা হামের লক্ষণ থাকা শিশুদের মূল করিডোরে প্রবেশ করতে না দিয়ে শুরুতেই আলাদা করতে হবে।
২ ) ফিল্ড হাসপাতাল ও অস্থায়ী আইসোলেশন জোন : মূল হাসপাতালের বাইরে অস্থায়ী তাঁবু বা ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করে হামের রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩) ডেডিকেটেড রেফারেল সিস্টেম : যেসব হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা বায়ু-নিয়ন্ত্রিত বা সম্পূর্ণ পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড নেই, সেখান থেকে রোগীদের দ্রুত বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তরের কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
৪) টিকাদান জোরদার : হাসপাতালের ভেতরেই ঝুঁকিপূর্ণ সাধারণ শিশুদের জন্য জরুরি হামের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শিশু হাসপাতালের এই চিত্র দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং জরুরি মহামারি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতাকেই প্রমাণ করে। জায়গার সংকট একটি বাস্তব সমস্যা হতে পারে, কিন্তু সেই অজুহাতে একটি ছোঁয়াচে মহামারিকে অন্য রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জনস্বাস্থ্য সংকটকে আরো ঘনীভূত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে দেশের সকল শিশু ও সাধারণ হাসপাতালে ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের জন্য কঠোরভাবে পৃথক বিশেষায়িত জোন চালুর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









