শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে বাস্তবায়নাধীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘অ্যাকসেলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেনদেনিং স্কিলস ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন’ (এসেট)।
এই প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য এবং অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন খোদ প্রকল্পের ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রকল্পটির অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের ‘অ্যাসেট’ গড়ে তুলছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসান, উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ মাহাতো, অ্যাকাউন্টস অফিসার সেলিম ভূঁইয়া এবং ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট মোহাম্মদ নূর আলম মিলে একটি শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের এই সিন্ডিকেটের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে দেশের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের এই মেগা প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম আজ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসান এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে প্রকিউরমেন্ট কার্যক্রমে চলছে চরম নৈরাজ্য। নির্ধারিত হারে কমিশন বা আর্থিক সুবিধা না দিলে ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখা, সমঝোতা না হলে অযৌক্তিকভাবে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান এবং টেন্ডার মূল্যায়নের পরও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে ফাইল ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া আরএফকিউ পদ্ধতির প্রকৃত ক্রয় সম্পন্ন না করেই সরকারি অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে শর্ট কোর্স ও আরপিএলের পিএমইউ সাপোর্ট সার্ভিস বাবদ কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখে প্রকল্প পরিচালক নিজে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শর্ট কোর্স ও আরপিএলের (আরপিএল) পিএমইউ সাপোর্ট সার্ভিস বাবদ কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ মাহাতোর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
উপ-প্রকল্প পরিচালক রবীন্দ্রনাথ মাহাতোর বিরুদ্ধে এন্টারপ্রাইজ বেইজড ট্রেনিং (ইবিটি), শর্ট কোর্স এবং কমিউনিকেশন কার্যক্রমের দায়িত্বে থেকে ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য মিলেছে। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রইচের প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা সেন্টার এনআইসিআইটি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করে বিপুল লভ্যাংশ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেই কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে ফ্ল্যাট ও স্থাবর সম্পত্তি অর্জনেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া, ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইএসসি-র মাধ্যমে প্রতি অকুপেশনে প্রায় ছিয়াশি হাজার টাকা গ্রহণের চাঞ্চল্যকর তথ্যও পাওয়া গেছে।
২০ লাখ টাকায় অডিট আপত্তি রফাদফা
প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম ঢাকতে জগাখিচুড়ি পাকানো হয়েছে অডিট প্রক্রিয়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন অডিট আপত্তি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে মাত্র ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে সুকৌশলে নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাপ্লাইয়ারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ হারে অর্থ আদায় এবং প্রকল্পের নির্ধারিত সীমানার বাইরে ব্যক্তিগত অফিস খুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে অনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি আর্থিক বিধিমালার চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি সরকারের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এ ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসেট প্রকল্পের সমস্ত আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের আওতায় এনে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানন প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ বিষয় জনাতে চাইলে, উপ-প্রকল্প পরিচালক রবীন্দ্রনাথ মাহাতো এদিনকে বলেন, আপনি যে অভিযোগের কথা বলছেন, এমন হাজারো অভিযোগ আছে তাতে কিছু হয় না।
আপনার যা মন চায় লিখে দিতে পারেন। অনিয়মের ব্যপারে প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসানকে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি তা রিসিভ করেননি। এমন কি খুদে বার্তা দিয়েও তার জবাব পাওয়া যায়নি। প্রকপ্লের অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত হিসাব কর্মকর্তা সেলিম ভূঁইয়া বলেন, অভিযোগ তো অনেক আছে, তবে আপনারা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারেন। আর হাতে সময় থাকলে চা খেয়ে যাবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









