মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন অক্সিজেন জরুরি, তেমনি শিল্প-কলকারখানার জন্য সবচেয়ে জরুরি গ্যাস। তাই এক অর্থে গ্যাসকেই বলা চলে ‘শিল্পের অক্সিজেন’। অথচ সেই গ্যাসের অভাবেই দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের শঙ্কার কালো মেঘ জমছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ভারী ও ক্ষুদ্র উভয় ধরনের শিল্প খাতের চাকা স্থবির হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাসের চরম ঘাটতির কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প খাতগুলো। বিশেষ করে টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, সিমেন্ট এবং ওষুধ প্রস্তুতকারক কারখানাগুলোয় উৎপাদন কার্যক্রম বিপর্যয়ের মুখে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস সংকট এভাবে চলতে থাকলে শিগগিরই শিল্প খাতের ‘দম ফুরিয়ে যাবে’।
জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি আমদানীকৃত এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অর্ধেক বা তার চেয়েও কম গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। ফলে কারখানাগুলোর বয়লার, জেনারেটর এবং উৎপাদন লাইন সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক খাতের স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং ইউনিটগুলো পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর। প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় রং করার কাজ এবং কাপড় প্রক্রিয়াজাতকরণ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা রপ্তানি আদেশের সময়মতো চালান তৈরিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রড ও লোহা গলানোর রি-রোলিং মিলগুলো উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লি চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া সিরামিক ও গ্লাস শিল্পে চুল্লির তাপমাত্রা ঠিক রাখা না গেলে পুরো ব্যাচ নষ্ট হয়ে যায়, যা উদ্যোক্তাদের কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্প সংগঠন বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। গ্যাস না পেয়েও অনেক কারখানার শ্রমিকদের বেতন ও কারখানার ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। তারা আরো বলছেন, কারখানায় গ্যাস নেই অথচ মাস শেষে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। ব্যাংকঋণের কিস্তি ও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গ্যাস সংকটের দীর্ঘসূত্রতা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় আঘাত হানবে। উৎপাদন অব্যাহত রাখতে না পারলে অনেক কারখানা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে, ফলে বেকারত্ব বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ সংকট তৈরি হবে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পজাত পণ্যের দাম আরো বেড়ে যেতে পারে। শিল্প বাঁচাতে অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, জরুরি সেবা ও শিল্প খাতের উৎপাদন সচল রাখতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাসের রেশনিং পুনর্বিন্যাস এবং এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া আরো দ্রুত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। অন্যথায়, দেশের উৎপাদন খাতের এই নীরব ধস রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সহজলভ্য ও কম দামের কারণে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পকারখানাসহ সব ক্ষেত্রেই গ্যাসনির্ভর হিসেবে গড়ে উঠেছে। যখন সংকট হয়েছে তখন একটি গোষ্ঠী আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। মূলত বহুমুখী উৎস ব্যবহার না করার কারণেই সংকট বেড়েছে। বর্তমানে এলএনজির ভাসমান টার্মিনাল দ্রুত সংস্কারে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ করতে হবে। এলএনজি নির্ভর হওয়া যাবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাসনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
হঠাৎ এত তীব্র গ্যাস সংকট কেন?
বাংলাদেশে গ্যাস সংকট নতুন নয়। দেশে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরেই কম। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ সক্ষমতা আছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তাহলে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি অন্তত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ। এই ঘাটতি নিশ্চিত করা হয় বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে।
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দু'টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপ পরিচালিত এই টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আনা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন বা রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। তবে গত ২১ জুলাই আগুনে সেই এলএনজি টার্মিনালের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শুরুতে এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রুটি চিহ্নিত করতে সময় বেশি লাগার কারণেই প্রেক্ষাপট আরো জটিল হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে, এর পেছনে মূল কারণ ত্রুটিযুক্ত এফএসআরইউ না। বরং, সংকটের একটি বড় কারণ হলো দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সেই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা কূপ থেকে উৎপাদন যোগ না হওয়া। ফলে কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। আর দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করে সেগুলো জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হয়। অর্থাৎ, দেশের গ্যাস সরবরাহ এখন শুধু নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, আমদানি করা এলএনজিও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এলএনজি থেকে এবং বাকি ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসছে। কিন্তু আমদানি করা এলএনজির খরচ দেশীয় গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। কিন্তু ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা এখনো চলছে। তাই, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি করার ক্ষেত্রেও একপ্রকার জটিলতা তৈরি হয়ে আছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের হিসাবে, দেশীয় উৎস থেকে ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহে বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাকি ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে এলএনজিনির্ভর সমাধান ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতাও বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
বন্ধ হচ্ছে নিত্যপণ্যের কারখানা
নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিনি, গম, সয়াবিন বীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ১২টি কারখানা রয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে এসব কারখানার উৎপাদন কমছিল। গত বুধবার সংকট তীব্র হলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিন বীজ মাড়াই করে তেল উৎপাদন, আটা–ময়দা তৈরি ও অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা। নিত্যপণ্যের বাজারে এমজিআইয়ের অংশ বড়।
এমজিআইয়ের ১২টি নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। আরেক বড় শিল্পগোষ্ঠী টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার ২০টি বন্ধ রয়েছে। গত অর্থবছরে আলোচ্য সাত পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল এই গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। সয়াবিন ও পামতেল, গম ও ডাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করে তারা। নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রেখেছে গ্রুপটি।
এমজিআইর হিসাবে, তাদের কারখানাগুলোয় দিনে প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে এত কারখানার উৎপাদন একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে গ্যাস–সংকট শুধু এমজিআইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বড় নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী আরো কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুসংখ্যক কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে বা সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। সংকট তীব্র হলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় সয়াবিন বীজ মাড়াই করে তেল উৎপাদন, আটা–ময়দা তৈরি ও অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা।
স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে চিনি, সয়াবিন বীজ মাড়াই এবং পাম ও সয়াবিন তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের তিনটি বড় কারখানাই বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামে শুধু আটা–ময়দার একটি ছোট কারখানায় উৎপাদন চলছে। বছরে গড়ে ৯ লাখ টনের কাছাকাছি পণ্য আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করে গ্রুপটি। গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের অভাবে গত মঙ্গলবার থেকেই বড় তিনটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে সীকম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা অ্যাগ্রোফুডের সয়াবিন বীজ মাড়াইসহ ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকরণের তিনটি কারখানাও মঙ্গলবার থেকে বন্ধ। সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, কারখানায় কাঁচামাল আছে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়। গ্যাসের অভাবে সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোও চালু করা যায়নি। গ্রুপটির অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান।
নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, গ্যাস–সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কারখানাগুলোয় বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এখন গ্যাস না পাওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে। তাতে উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একদিকে উৎপাদন কমে গেছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কোহিনূর কেমিক্যালের কারখানায় সকাল ৬টা থেকে দুই শিফটে ১৬ ঘণ্টা উৎপাদন হয়। গ্যাস–সংকটের কারণে দিনে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। রাতের বেলায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে পণ্য উৎপাদন করা হয়। এতে সাবান, ডিটারজেন্ট ও প্রসাধনীর উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে গেছে। কোহিনূর কেমিক্যালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড) গোলাম কিবরিয়া সরকার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। তার মধ্যে আবার গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বলছে, হবিগঞ্জে তাদের শিল্পপার্কে উৎপাদন নেমেছে ৪০-৪৫ শতাংশে। গ্যাস–সংকটের কারণে ক্যাপটিভ জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় বন্ধ। পল্লীবিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা কোনোরকমে চলছে। একইভাবে নরসিংদীসহ অন্য এলাকায় থাকা শিল্পগ্রুপটির উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস–সংকটের কারণে প্লাস্টিকের আসবাব, বিস্কুট-কেক, বেকারিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে তারা। জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন সক্ষমতার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে অনেক পণ্যই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তার মধ্যে রপ্তানি পণ্যও আছে। তিনি দ্রুতই সংকট সমাধানের আশা প্রকাশ করেন।
বস্ত্র খাতে সংকট বাড়ছে
সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে প্রতিদিন ২৪ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। গ্যাস–সংকটের কারণে গতকাল উৎপাদন হয়েছে ১০ হাজার পাউন্ড সুতা। তার আগের কয়েক দিন সক্ষমতার ৪০-৫০ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে। এসব তথ্য দিয়ে লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, অর্ধেক সক্ষমতায় কারখানা চললে মাসে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান হতে পারে। গ্যাস–সংকটের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের গাজীপুরের কারখানায় ডাইং সেকশনে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য সুইং বা সেলাই সেকশনের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেজন্য ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সঙ্গে আরো তিন দিন ছুটি বাড়িয়েছে তারা। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, গ্যাস ছাড়া ডাইং কারখানা চলে না। সেজন্য আমরা ৫-৭ আগস্ট ছুটি দিয়েছিলাম। শ্রমিকদের অনুরোধে ছুটি আরেক দিন বাড়িয়েছি। ছুটির শেষ হওয়ার আগেই গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছি।
ডিবিএল গ্রুপের মতো আরো কিছু তৈরি পোশাক কারখানা ৫ আগস্টের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বাড়তি এক থেকে দুই দিন ছুটি দিয়েছে। কারণ, গ্যাস–সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় ডাইং করা যাচ্ছে না। এতে তৈরি পোশাক কারখানা বস্ত্রের সংকটে পড়ছে। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলো ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রেখেছে। অতীতে ফিলিং স্টেশন থেকে আমরা সিলিন্ডার ভরে গ্যাস নিতে পারতাম। এখন দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘তিতাসকে চিঠি দিয়েও আমরা কোনো সাড়া পাইনি। প্রাইভেট গাড়িতে সিএনজি না দিয়ে শিল্পকারখানায় দেওয়া দরকার।
অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল মিল, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক স্থানে গ্যাসের চাপ পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ স্থানে পরিস্থিতি এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। বিশেষ করে, ময়মনসিংহের ভালুকা বা গাজীপুরের শ্রীপুরে এখনো গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
গত ২০ দিন ধরে চলমান এই গ্যাস সংকটকে 'নজিরবিহীন' কিংবা 'অস্বাভাবিক' বলে মনে করছেন শিল্পমালিকরা। তারা বলছেন, এবার তারা অপরিসীম ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা, বাড়তি খরচ গোনা, এমনকি ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা। এদিকে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন যে গ্যাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, তার কোনো রাতারাতি সমাধান নেই। কিন্তু হাতের নাগালেই এমন কিছু উপায় রয়েছে, যেগুলো গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ করা অনেকটাই সম্ভব। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম পরামর্শ, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো।
শিল্পকারখানায় প্রভাব কতটা?
গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল, নিটওয়্যার, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোর ক্ষতি হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে, আবার কোথাও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে আগে থেকেই গ্যাসের সংকট থাকলেও গত প্রায় ২০ দিনের পরিস্থিতি ছিল নজিরবিহীন। তিনি আরো জানান, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, ময়মনসিংহ, ভালুকা, ত্রিশাল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কোথাও শূন্যে, কোথাও এক পিএসআইয়ে নেমে এসেছিল। অথচ উৎপাদন চালাতে অন্তত তিন থেকে চার পিএসআই চাপ প্রয়োজন। তার নিজের কারখানাও প্রায় ২০ দিন বন্ধ ছিল। তবে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। যদিও ময়মনসিংহের ভালুকা ও গাজীপুরের শ্রীপুরসহ কিছু এলাকায় এখনো সংকট রয়েছে।
গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে অনেক পণ্য জাহাজে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এখন সেগুলোর কিছু উড়োজাহাজে পাঠাতে হচ্ছে বলে জানান মোহাম্মদ হাতেম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেরিতে পণ্য পাঠানোর কারণে ক্রেতাকে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ও দিতে হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ নিয়ে। মি. হাতেম বলেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তায় ক্রেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে দেওয়ার পরিকল্পনা করা ক্রয়াদেশের একটি অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএ'র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তার হিসাবে, বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলো বর্তমানে সক্ষমতার তুলনায় গড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম উৎপাদন করছে।
উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দিতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে। বলেও জানান তিনি। এবারের এই সংকটে শিল্পের আর্থিক ক্ষতির পুরো চিত্র মাস শেষে আরো পরিষ্কার হবে বলে মনে করেন বিজিএমইএ সভাপতি।
তবে তৈরি পোশাক কারখানার তুলনায় সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী কারখানায় গ্যাস সংকটের প্রভাব বেশি বলে জানান মাহমুদ হাসান খান। কারণ তৈরি পোশাক কারখানায় মূলত বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও আয়রন ও প্যাকিংয়ের মতো কিছু কাজে গ্যাস প্রয়োজন। অন্যদিকে সুতা, কাপড়, ডাইং ও ফিনিশিংয়ের মতো শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া অনেক বেশি গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতের পুরো উৎপাদন বন্ধ না হলেও এর সরবরাহ ব্যবস্থার আগের ধাপগুলো ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন ও সময়মতো রপ্তানিতে প্রভাব পড়ছে।
তবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে শুধু সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটই দায়ী নয় বলে মনে করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চাহিদা কিছুটা কম এখন এবং কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি "ধারাবাহিকভাবেই নেগেটিভ গ্রোথে" ছিল।
তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে, এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন তিনিও।
নির্মাণসামগ্রীর কারখানায় সংকট
কাচ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করে চুল্লিতে কাঁচামাল গলানো হয়। একবার চুল্লি চালু হলে তা টানা ১২ থেকে ১৫ বছর সচল রাখতে হয়। গ্যাসের অভাবে চুল্লি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি আবার চালুর সুযোগ থাকে না; পুরনো চুল্লি ভেঙে নতুন করে স্থাপন করতে হয়। এ কারণে চলমান গ্যাস-সংকটে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন কাচশিল্পের উদ্যোক্তারা। চট্টগ্রামের পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কমে ৭৫ পিএসআইয়ে (মাপার একক) নেমেছে। এর নিচে নামলে চুল্লি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়বে। চুল্লিটি নষ্ট হলে নতুন করে স্থাপনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ২০১৯ সালে চুল্লিটি চালু করা হয়েছিল। বিদ্যমান বিনিয়োগ রক্ষা করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোকে সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গ্যাস-সংকটে উদ্বেগ বেড়েছে ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তাদেরও। বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাসের সংকট অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে। তপন সেনগুপ্ত আরো বলেন, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করে সাময়িক উৎপাদন চালু রাখা যায়। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। বড়জোর এক-দুই দিন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালানো সম্ভব। কিন্তু একটানা গ্যাসের ঘাটতি থাকলে এভাবে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়।
সিরামিক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিসিএমইএর গত সপ্তাহে তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেওয়া এক চিঠিতে জানায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী এবং ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল এলাকার ২০টি সিরামিক কারখানায় তীব্র গ্যাস–সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কখনো কখনো ২-৩ পিএসআই থেকে শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। শিল্প রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় সংগঠনটি।
গাজীপুরে উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ
শিল্পনগরী গাজীপুর জেলায় গ্যাস সংকটে ১৫ শতাংশ কারখানায় উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে, উৎপাদন কমে গেছে ৪০ শতাংশ। গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন এ তথ্য জানিয়েছেন। গ্যাস সংকটের বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ বলে জানান কারখানা সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গ্যাস সংকটে কর্মহীন অবস্থায় দিন পার করতে হচ্ছে অনেক শ্রমিককে। চাকরি হারানোর শঙ্কাও দেখা দিয়েছে তাদের মাঝে। এ বিষয়ে কথা বলতে অনেক কারখানার মালিক ও কর্মকর্তারা অনীহা প্রকাশ করেছেন। চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে গাজীপুরের কোনাবাড়ী ফুয়াদ স্পিনিং মিলস্ লিমিটেড কারখানা। এতে ওই কারখানার প্রায় ৫ শতাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে অব্যাহত লোকসান গুনতে হচ্ছিল কারখানা কর্তৃপক্ষকে। কারখানার ডিজিএম আজিজুল হক জানান, কারখানাটিতে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক কর্মরত ছিল। গ্যাস সংকটের কারণে কয়েক মাস ধরে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। শ্রমিকদের কয়েক মাস বসিয়ে বসিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া থেকে ঠেকাতে আগস্ট মাসের ১ তারিখে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হলে কারখানা খুলে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সাদমা ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেন, চলমান গ্যাস সংকটে বেশি প্রভাব পড়ছে তাদের ডাইং সেকশনে। গ্যাসের প্রেসার না থাকায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে বসে সময় পার করতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে গ্যাসের চাপ ফিরলে উৎপাদন শুরু করা গেলেও বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না। প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেডের এজিএম রবিউল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমেছে, কারখানার স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে।
গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় মিতালী ফ্যাশনের কারখানার ডাইং (কাপড়ের রং করা) সেকশন গ্যাস–সংকটের কারণে আট দিন ধরে বন্ধ। কাপড় ডাইং না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সেলাই সেকশনের ৩০টি উৎপাদন লাইনের মধ্যে ১৮ লাইন অলস হয়ে পড়েছে। বিষয়টি জানিয়ে মিতালী ফ্যাশনের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি রপ্তানি ক্রয়াদেশের বিপরীতে তৈরি পোশাক নির্ধারিত সময় পাঠাতে পারবেন না তাঁরা। এজন্য ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জে ঘুরছে না চাকা, কমেছে উৎপাদন
গ্যাস নেই, তাই ডাইং কারখানায় কাপড় রং হচ্ছে না। কাপড় না আসায় থেমে যাচ্ছে কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং। সময়মতো বিদেশে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী বিল থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে একদিকে লোকসান বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা। সামনে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে, চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানা এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ে পড়েছে ডাইং শিল্প। গ্যাসের অভাবে কাপড় রং ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় গার্মেন্টসে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংও ধীরগতিতে চলছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিপমেন্ট দেওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে দেশের রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ২০০ পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানায় প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। একটি পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ডাইং, নিটিং, অ্যাকসেসরিজ, কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে ডাইং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলেই পুরো উৎপাদন চেইনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গ্যাস সংকটের কারণে জেলার দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, যে কারখানার দৈনিক ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে। আগে অনেক প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে সীমিত আকারে উৎপাদন চালালেও নতুন নির্দেশনায় সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে এই শিল্পাঞ্চলে। এরই মধ্যে গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ছুটি সমন্বয়ের কারণে গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের বেশির ভাগ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। শহরের পুলিশ লাইন্স এলাকার রহমান গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গত বুধবারের সরকারি ছুটি ও শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে মাঝের দিনটি ছুটি দিয়েছে। আগের শুক্রবার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে এ ছুটি সমন্বয় করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, কয়েক সপ্তাহে গ্যাস সংকটের কারণে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প। ডাইংয়ে উৎপাদন না থাকায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। ফলে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিং ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থাও কমছে। সামনে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি বড় গার্মেন্টস কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়। মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান। উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। এ মাসেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশ্বাস পাওয়া গেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে এসব ক্রয়াদেশ ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির নিশ্চয়তা দেওয়া না গেলে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে, বেকারত্ব বাড়বে, শিল্পে অনিশ্চয়তা আরো গভীর হবে এবং দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









