চোখের দৃষ্টি নেই, কিন্তু জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বেজায় স্পষ্ট। কারও কাছে হাত না পেতে কাজ করেই বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুকলেস আলী (৫২) প্রায় চার দশক ধরে কারখানায় গাছের বাকল ছাড়ানোর কাজ করে বৃদ্ধা মা রুলি বেগমের সংসারের একমাত্র ভরসা তিনি।
শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারালেও কখনো ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেননি। প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ একাই হেঁটে কারখানায় যান। সেখানে কাঠের গুঁড়ি থেকে ইট দিয়ে আঘাত করে বাকল ছাড়ান। কাজ শেষে সেই বাকল বস্তায় ভরে মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরেন। পরে মা রুলি বেগম সেগুলো শুকিয়ে খড়ি হিসেবে বাজারে বিক্রি করেন। এভাবেই চলে মা-ছেলের সংসার।
সম্প্রতি তেলিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকালে মুকলেসের হাতে একটি বস্তা তুলে দিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন মা রুলি বেগম। দুপুরের খাবারের জন্য কাপড়ে বাঁধা কয়েকটি রুটি, সঙ্গে লবণ ও কাঁচা মরিচ। মা কিছুটা পথ ছেলের হাত ধরে এগিয়ে দেন। পাকা সড়কে পৌঁছে দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান। এরপর পরিচিত পথ ধরে মুকলেস একাই প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে কারখানায় পৌঁছান।
কারখানায় পৌঁছালে মালিক এ টি এম হাসানুজ্জামান তাঁকে কাঠের গুঁড়ির পাশে বসিয়ে দেন। আধখানা ইট হাতে নিয়ে মুকলেস কাঠের গুঁড়িতে একের পর এক আঘাত করতে থাকেন। আঘাতে ধীরে ধীরে গাছের শক্ত বাকল আলাদা হয়ে আসে। পরে সেই বাকল বস্তায় ভরে মাথায় করে বাড়ি নিয়ে যান এবং তার মা বাকল গুলো রোদে শুকিয়ে খড়ি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। এতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আয় হয়।
এর পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রুলি বেগম বিধবা ভাতা এবং মুকলেস প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এই সামান্য আয় ও সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করেই চলছে তাঁদের সংসার এবং চিকিৎসার খরচ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুকলেস জন্মান্ধ ছিলেন না। ছোটবেলায় অল্পস্বল্প দেখতে পেতেন। একদিন দুপুরে মা রুলি বেগম ছেলেকে খাবার খেতে ডাকলে তিনি থালার ওপর পা দিয়ে বসে পড়েন। তখনই মা বুঝতে পারেন, ছেলের চোখের যে সামান্য আলো ছিল, সেটিও আর নেই। চিকিৎসকদের কাছ থেকেও দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশাব্যঞ্জক কোনো কথা পাননি তিনি।
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও মুকলেস থেমে যাননি। ছোটবেলা থেকেই কাঠের কারখানায় পড়ে থাকা খড়ি কুড়িয়ে এনে সংসারে সহযোগিতা করতেন। পরে ধীরে ধীরে কাঠের বাকল ছাড়ানোর কাজ শুরু করেন।
২০১০ সালে মুকলেসের বাবা মোরশেদ আলী মারা যান। তিনি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। এরও প্রায় এক দশক আগে মাটি কাটার সময় দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। এরপর থেকে নিয়মিত কাজ করতে পারতেন না। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি এসে পড়ে মুকলেসের ওপর।
মুকলেসের ছোট ভাই সোহেল রানা স্থানীয় একটি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তাঁর মাসিক আয় ৯ হাজার টাকা। নিজের চার সন্তানসহ সংসার চালাতে গিয়ে মায়ের দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।
কাঠচেরাই কারখানার মালিক এ টি এম হাসানুজ্জামান মুকলেসের প্রতিবেশী এবং প্রায় সমবয়সী। ছোটবেলা থেকেই তিনি মুকলেসকে কাজ করতে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, একবার তিনি মুকলেসকে বলেছিলেন, মানুষের কাছে হাত পাতলে কাজের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যাবে। জবাবে মুকলেস বলেছিলেন, আমি মরে গেলেও মানুষের কাছে হাত পাততে পারব না। কাজ করে আধপেটা খেলেও সেটাই আমার সম্মান।
ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া, কোনো কিছুই মুকলেসের নিয়মিত কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। প্রতিদিনই তিনি কারখানায় আসেন। কোনো দিন কাজ না থাকলেও সেখানে বসে সময় কাটান।
স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, মুকলেসের আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত প্রবল। তিনি কখনো কারও কাছে সাহায্য চান না। তাঁর ভাষায়, অনেক সুস্থ-সবল মানুষও বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব এড়িয়ে যান। অথচ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও মুকলেস কঠোর পরিশ্রম করে মায়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
ভোলাহাটের গোহালবাড়ি গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান প্রায় ৩০ বছর ধরে একই কারখানায় ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, তিনি যত বছর ধরে ওই কারখানায় আছেন, তত বছর ধরেই মুকলেসকে সেখানে কাজ করতে দেখছেন। দুপুরে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা রুটি, লবণ ও কাঁচা মরিচ খেয়েই দিনের খাবার শেষ করেন মুকলেস। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সাইদুর রহমান বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি মুকলেসের জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারে, তাহলে তাঁর ও তাঁর মায়ের জীবন কিছুটা নিরাপদ হবে।
ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হোসেন বলেন, মুকলেসের বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছেন। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু মুকলেস আত্মমর্যাদা বজায় রেখে কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন এবং বৃদ্ধ মায়ের দায়িত্বও পালন করছেন, এটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
ইউএনও জানান, মা ও ছেলে যেসব সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, সেগুলো দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি তাঁদের ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ার খবর পেয়ে এক বান্ডিল ঢেউটিন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও সুযোগ অনুযায়ী তাঁদের সহায়তা করা হবে।
মুকলেসের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, অর্থের অভাবে কখনো চোখের চিকিৎসা করাতে পারেননি। তাঁর আকুতি, ‘কেহু যুদি আমার চোখের চিকিৎসাটা করাইতোক। চোখ যুদি দেখতে পাইতুং, তেবে মাকে দেখতুং।’
মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধও এলাকাবাসীর কাছে অনুকরণীয়। অনেক কর্মক্ষম মানুষ যেখানে ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেন, সেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও মুকলেসুরের এই সংগ্রামী জীবন সততা, আত্মমর্যাদা ও মায়ের প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
অভাবের সংসারে মুকলেসুরের এক ভাই সুস্থ-সবল হলেও তিনিও হতদরিদ্র হওয়ায় মা ও ভাইয়ের পাশে সেভাবে দাঁড়াতে পারেন না। ফলে বৃদ্ধা মা ও ছেলের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে আছে অভাব-অনটন।
স্থানীয় মিল ব্যবসায়ীর তথ্য অনুযায়ী, কাঠের বাকল থেকে প্রতিদিন মোটামুটি দুই থেকে আড়াই মণ খড়ি সংগ্রহ করেন মুকলেসুর। সেগুলো বাড়িতে নিয়ে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে মা-ছেলের খাবার ও মায়ের চিকিৎসার খরচ।
ভোলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পিয়ার জাহান জানান, মুকলেসুর রহমানকে প্রতিবন্ধী ভাতা এবং তাঁর মা রলি বেগমকে বিধবা ও বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঈদের সময়ও তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনের মধ্যে থাকা এই মা-ছেলের সংসারের জন্য সরকারি এই সহায়তা যথেষ্ট নয়। তাঁদের নিত্যদিনের খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে আরও সহায়তা প্রয়োজন। মুকলেসুরের জীবনসংগ্রাম ও বৃদ্ধ মায়ের অসহায়ত্ব বিবেচনায় নিয়ে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









