বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তৃণমূল থেকে উঠে এসে বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি হয়ে ওঠা ‘সাদামানুষ’হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক এবার আসীন হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে। বিএনপির মহাসচিব থেকে হলেন রাষ্ট্রের মহামান্য। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৩৮ মিনিটে বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেন তিনি। শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ কয়েক শ অতিথি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এ শপথের মধ্য দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফলে এত দিন সাধারণ মানুষের কাছে অতিসাধারণ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিটিই এখন ‘অসাধারণ’ হয়ে গেলেন।
রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী এখন থেকে তাঁকে মানতে হবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়মনীতি ও বিধিবিধান। তাই চাইলেই তাঁর সাথে যে কেউ যেকোনো সময় দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। তিনিও চাইলে সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারবেন না। রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তাঁকে মানতে হবে রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার। এজন্যই বলা চলে- শপথে শুরু হলো মহামান্যর ‘অসাধারণ’ যাত্রা।
এদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামীকাল রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন বলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে। সেদিন সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে তিনি মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবন থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওয়ানা করবেন। রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, রোববার বঙ্গভবনে ২ নম্বর গেইটে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ মঞ্চে নিয়ে যাবে। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেবে। এ পর্ব শেষে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে তার কার্যালয়ে যাবেন।
রাষ্ট্রপতি কার্যালয় আরও জানিয়েছে, আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন নতুন রাষ্ট্রপতি। সেখানে পুস্পস্তবক অর্পণ করার পর তাকে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানোর পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিন্টু রোডের বাসায় ফিরবেন। এরপর তিনি তার গুলশানের বাসভবনে যেতে পারেন।
গতকাল বিকালে প্রথমে বঙ্গভবনে আসেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন নতুন রাষ্ট্রপতির গাড়িবহর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ৬টা ২৫ মিনিটে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দরবার হলে প্রবেশ করেন তিনি।
দরবার হলের মঞ্চে নিজ আসনের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডদলের সদস্যরা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত বাজান। এরপর আসন গ্রহণ ও শপথ অনুষ্ঠান শুরুর অনুমতি প্রার্থনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন উপস্থাপন করেন এবং শপথবাক্য পাঠ ও গ্রহণের অনুরোধ জানান। তখন রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার। অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য প্রায় দেড় হাজার আমন্ত্রণপত্র বিলি করা হয় বলে বঙ্গভবন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।
শপথ অনুষ্ঠানে দরবার হলের প্রথম সারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান, সাবেক অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিনী সৈয়দা শামিলা রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান। প্রথম সারিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সংসদের বিরোধী দলীয় দলের নেতা শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকেও দেখা গেছে।
দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম। এই সারিতে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহলসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ছিলেন অতিথিদের কাতারে।
শপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করিব।’ শপথের পর মির্জা ফখরুল শপথনামায় স্বাক্ষর করেন এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার তা সত্যায়ন করেন।
বঙ্গভবনের আচার–অনুষ্ঠানের রীতি অনুসারে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেওয়ার পর শপথ বইয়ে সই করতে বসেন। এ সময় দুই চেয়ারে পাশাপাশি বসেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। নতুন রাষ্ট্রপতি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর মাঝখানের চেয়ারে বসেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এখান থেকেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে আসীন হয়েছেন তিনি। এ সময় রাষ্ট্রপতির দুই পাশের দুই চেয়ারে বসেন মেজর হাফিজ উদ্দিন ও কায়সার কামাল। শপথ অনুষ্ঠান শেষে আরেক দফা জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। এর আগে গতকাল বিকাল থেকেই শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বঙ্গভবনে আসতে শুরু করেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। বঙ্গভবন ও আশপাশের এলাকায় ছিল বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।
বঙ্গভবনে যাওয়ার আগে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও কবরে শ্রদ্ধা জানান বলে জানিয়েছেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
এদিন বেইলি রোডের স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়েন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। সেখান থেকে দুপর ১টা ৪৬ মিনিটে সরাসরি যান শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কবরে। সেখানে পুস্পস্তবক অর্পণ করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করেন এবং মোনাজাত করেন। এ সময় বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন ও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সহকারি একান্ত সচিব ইউনুস আলী উপস্থিত ছিলেন। এই সময় কবর প্রাঙ্গনে চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে দলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান পেল বঙ্গভবন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পরে হওয়া এ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ভোট পান ২৫৫টি। তার প্রতিদ্বদ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের বাক্সে ভোট পড়ে ৮৮ ভোট।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









