## এক দলিলে ৬ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি
ঢাকার খিলগাঁও সার-রেজিস্ট্রি অফিসে এক দলিলে ৬ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকির মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এই রাজস্ব ফাঁকিতে সহযোগিতার নজরানা হিসেবে এক দলিলেই ২ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন খিলগাঁও সার-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্টারিং অফিসার ও বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ।
এ বছরের ১০ মার্চ বন্দর স্টিলের মালিকানাধীন ৮১ শতাংশ জমির সাফ কবলা দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে এমন ঘটনার জন্ম হয়েছে। দলিল গ্রহীতা আবাসন কোম্পানি শেলটেক। তারা ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা নামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের নামে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা দিয়ে এই সম্পত্তি কিনেছে। দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সরেজমিন তদন্তে জানা যায়, প্রকল্পটির অবস্থান প্লট নম্বর-এস ১২, মৌজা-মেরাদিয়া, ব্লক- ডি, এভিনিউ- ৪, বনশ্রী, ঢাকা। মেরাদিয়া মৌজায় অবস্থিত ১৭ তলা প্রকল্পে শপিং মল, অফিস স্পেস, ব্যাংকুয়েট হল, ডক্টর চেম্বার, রেস্তরাঁ ও ফুডকোর্ট অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৯ সালের ৩০ এপ্রিল এই মেগা প্রকল্পের সমাপ্তি করার কথা। এতে ৩টি বেজমেন্ট রাখা হয়েছে।
এদিন পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, বন্দর স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃক শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেডের নামে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের নম্বর হলো-২৫০৯। এ ক্ষেত্রে হালনাগাদ মালিকানা ও খাজনা-খারিজ ঠিক রেখে দলিলটি রেজিস্ট্রি হলেও সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে শুভংকরের ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ধরনের দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর, আইটি (আয়কর যা ইনকাম ট্যাক্স) ৭ শতাংশ টাকা বাধ্যতামূলক হলেও তা আদায় করা হয়নি। জমির মোট মূল্য ৮৭ কোটি ৪০ লাখ হলে এ ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ হিসাবে দাঁড়ায় ৬ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। একটি দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা নজিরবিহীন।
ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, মোটা অংকের একটি ঘুষের বিনিময়ে বড় ধরনের এই রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। রেজিস্টারিং অফিসার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগসাজশ করে বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই কোটি টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে বলে গোপন একটি সূত্র থেকে জানা যায়। সে সূত্র নিশ্চিত করেছে, দলিল সম্পাদনের আগের রাতে সাব রেজিস্ট্রার মাইকেলের ঘনিষ্ঠ এক উমেদারের রাজধানীর নিকেতনের বাসায় ঘুষের দুই কোটি টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে সেই উমেদার সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেলের নির্দেশমতো টাকা তার কাছে পৌঁছে দেন।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত হওয়া গেছে, খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদানের পর থেকে মাইকেল মহিউদ্দিন আবদল্লাহ এ ধরনের বড় বড় রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মোটা অংকের ঘুষ আদায় করছেন। জমির কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে সেই দলিল রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন। আবার কাঙ্ক্ষিত ঘুষ না পেলে নানা অজুহাতে দলিল রেজিস্ট্রি বন্ধ রাখছেন। সেবাপ্রার্থী ও দলিল লেখকদের সাথে দুর্ব্যবহার তার নিত্যদিনের ঘটনা। ইতিপূর্বে মুন্সিগঞ্জ ,টঙ্গী ও সাভার ও রূপগঞ্জে চাকরি করার সময় ঘুষ-দুর্নীতি, অসদাচরণ, হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। মুন্সীগঞ্জ ও রূপগঞ্জে তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থী ও দলিল লেখকরা মিছিল পর্যন্ত করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক এদিনকে বলেন, "মাইকেল একজন আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ সাব-রেজিস্ট্রার। বিগত দিনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ভাতিজি জামাই দাবি করে ঘুষ-দুর্নীতি মাধ্যমে টাকার পাহাড় গড়েছেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর হঠাৎ ভোল পাল্টে হয়ে গেছেন বিএনপির লোক।
এখন ছাত্রদলের সাবেক নেতা দাবি করে একই কর্ম চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে বিআরএসএ’র ‘পকেট কমিটির’ মহাসচিব পরিচয়ে বদলি বাণিজ্য চালাচ্ছেন। নিজেকে এবার পরিচয় দিচ্ছেন বর্তমান আইনমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে।
মোটা অংকের রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহ সম্পর্কে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান বলেন, "আমি সবেমাত্র ঢাকা জেলা রেজিস্টার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি। এই দলিলটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় রাজস্ব দেওয়া হয়েছে এবং মোটা অংকের আদান-প্রদান হয়েছে। তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একটি বাণিজ্যিক ভবনের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট ও আইটি রাজস্ব দেওয়া বাধ্যতামূলক বলে একাধিক সাব-রেজিস্ট্রার দৈনিক এদিন পত্রিকাকে জানান। তা ছাড়া ৮১ শতাংশ জমি কোনো ব্যক্তির পক্ষে রেজিস্ট্রি হয়নি। শেলটেকের মতো স্বনামধন্য আবাসিক কোম্পানির একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য জমিটি কেনা হয়েছে। নির্মাণাধীন স্থাপনাটি বাণিজ্যিক হারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে এই জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে কোনোভাবে ভ্যাট ও আইটি ট্যাক্স মওকুফ পেতে পারে না বলে প্রবীণ দলিল লেখক ইশরাত হোসেন মনে করেন।
৬ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকি ও ২ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সম্পর্কে দৈনিক এদিনের পক্ষ থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকে অনুসন্ধান চালানো হয়। সে অনুসন্ধানে জানা যায়, বন্দর স্টিল প্রাইভেট লিমিটেড ৮১ শতাংশ জমির ওপর একটি বৃহৎ বিপণিবিতান কাম বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য নকশা প্রণয়নের জন্য রাজউকে আবেদন করে। সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজউক বাণিজ্যিক ভবনের ১৭ তলা ও ৩টি বেজমেন্টের অনুমোদন দেয়। যার অনুমোদিত স্মারক নম্বর-২৫.৩৯.০০০০,১২২,৩৩.০৫১.২২। এর স্থপতি হিসাবে দেখানো হয় নুসরাত জাহানকে (রেজি. নম্বর জে-০১৬)।
প্রায় ৩ বছর পর রাজউকের অনুমোদিত আংশিক নির্মিত বাণিজ্যিক ভবনসহ ৮১ শতাংশ জমি বন্দর স্টিল কর্তৃপক্ষ সাব কবলা দলিলমূলে শেলটেক আবাসন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। শেলটেক পূর্বের নকশা অনুমোদনে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। তবে তারা নতুন করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সেখানে স্থপতি হিসাবে নুসরাত জাহানের পরিবর্তে মো. এহসান খানের (রেজি. নম্বর কে-০৪৭) নাম উল্লেখ করেছে। তাই দেখা যাচ্ছে, বন্দর স্টিলের বাণিজ্যিক ভবনের জমি আবাসন কোম্পানি শেলটেকের কাছে বিক্রি করলে অবশ্যই ভ্যাট ও আইটি হিসাবে ৭ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয়েই বন্দর স্টিল তাদের স্থাপনার নকশা ও অন্যান্য অনুমোদন লাভ করেছে। এ ছাড়া বন্দর স্টিলের মেমোরেন্ডামেও ভূমি উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান এদিন বলেন, ‘এক্ষেত্রে ভ্যাট আইটির কর ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি এ ধরনের বেআইনি কাজ হয়ে থাকে, তাহলে খোঁজখবর নিয়ে অবশ্যই প্রতিকার করা হবে।’
একাধিক প্রবীণ দলিল লেখক এদিনকে জানান, অনেক সময় দলিল রেজিস্ট্রির সময় সরকারি রাজস্ব আদায়ে হেরফের হতে পারে। এক্ষেত্রে রাজস্ব কম আদায় হলে দলিলদাতা ও গ্রহীতাকে নোটিশ করে সমুদয় টাকা আদায় করার বিধান রয়েছে। দলিল মুসাবিদাকারী সে টাকা আদায় করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকেন।
তাই বন্দর স্টিল ও শেলটেকের মধ্যে সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া গ্রহণ করা জরুরি। কারণ একটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে ৬ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বিষয়টি ত্রিপক্ষীয় দাতা, গ্রহীতা ও সাব রেজিস্ট্রারের যোগসাজশে হলেও জেলা রেজিস্ট্রার বা আইজিআরের হস্তক্ষেপে এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। একই সাথে এই বিশাল রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ কথা আশু প্রয়োজন।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ সোজাসাপ্টা বলেন, এই দলিলে কোনো অনিয়ম হয়নি। অনিয়ম পেলে আপনারা লিখে দিতে পারেন। আমি রেজিস্ট্রেশন আইন ও বিধিমালা মেনেই দলিলটি রেজিস্ট্রি করেছি। এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্য়য় ঘটেনি।’
বনশ্রী সাইট অফিস ও পশ্চিম পান্থপথে শেলটেকের প্রধান কার্যালয়ে একাধিক দিন গিয়েও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে একাধিক নগরবিদ দৈনিক এদিনকে জানান, ২০২৩ সালে রাজউক থেকে ১৭ তলা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা নেওয়ার পরদিন থেকেই উক্ত জমিকে বাণিজ্যিক হিসাবে গণ্য করতে হবে। নকশা নেওয়ার তিন বছর পর সেই জমি ভিটি বা বাড়ি হিসাবে রেজিস্ট্রি করার কোনো সুযোগ নেই। সেটি করা হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার বেআইনি কাজ করেছেন বলে গণ্য হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ৮১ শতাংশ জমির ওপর ১৭ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের নকশা নেওয়ার পর সে মার্কেট বিক্রি করলে সরকারকে পুরো মার্কেট ও অফিস স্পেসের কর বাবদ ১৯ কোটি ২ লাখ ৩৮ হাজার ১০৫ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করার পরই শুধু সাব-রেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন। সেখানে নকশা নেওয়ার পর শুধু জমি রেজিস্ট্রি করার কোনো সুযোগ নেই।
রেজিস্ট্রেশন আইন ও বিধি অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে যদি সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহ এর কম আদায় করে দলিল রেজিস্ট্রি করে থাকেন তাহলে তিনি নিজ দায়িত্বে সরকারি করও পরিশোধ করবেন। যদি সেটা করতে তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে তার বেতন ও পেনশন থেকে সেই টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









