বাংলাদেশে জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার চলত দেড়শ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আমলের দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭ দিয়ে। প্রাচীন এ আইনে কেবল নির্দিষ্ট স্থানে সশরীরে বসে তাস বা লটারির মাধ্যমে জুয়া খেলাকে অপরাধ গণ্য করা হতো। ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মতো আধুনিক অনলাইন জুয়া এই আইনের বাইরেই থেকে যায়। নতুন আইনে অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, বাজিকর, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া ও ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট এবং ভিপিএনসহ মোট ২৪টি আধুনিক বিষয়কে নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে অপরাধীদের আইনি ফাঁকফোকর গলে বের হওয়ার সুযোগ থাকছে না। ১৮৬৭ সালের প্রাচীন আইনটি কেবল শারীরিক জুয়া এবং তাস-ডাইস নিয়ন্ত্রণ করত। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের এই সংশোধিত আইনটি সব ধরনের ডিজিটাল অপরাধ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ভিপিএন নিয়ন্ত্রণ করবে।
নতুন আইনে প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬ বাস্তবায়নে আইনগত বিভিন্ন দিক নিয়ে দৈনিক এদিনের সাথে কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদের। তিনি এ আইনের ৩টি বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অ-জামিনযোগ্য বনাম জামিনযোগ্য অপরাধ
সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, নতুন আইনে অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য করায় অপরাধীদের মধ্যে আইনি ভয় তৈরি হবে। পূর্বে সাধারণ জুয়া আইনে অপরাধীরা থানাতেই জামিন পেয়ে যেত, ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটত। এখন ডিজিটাল জুয়ার হোতাদের অপরাধ প্রমাণিত হলে সহজে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে তিনি কয়েকটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।
ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও বিচারিক চ্যালেঞ্জ
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এ আইনের মূল চ্যালেঞ্জ হবে আদালতে ডিজিটাল লগের যেমন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রানজেকশন, আইপি অ্যাড্রেস, ভিপিএন লগ আইনি গ্রহণযোগ্যতা এবং ফরেনসিক প্রমাণ উপস্থাপন করা। যথাযথ ফরেনসিক ল্যাবের সনদ ছাড়া চতুর অপরাধীরা উচ্চ আদালত থেকে আইনি ফাঁকফোকর গলে জামিন বা খালাস পেয়ে যেতে পারে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্দোষ মানুষের সুরক্ষার প্রশ্ন
দৈনিক এদিনের প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র এই আইনজীবী বরেন, আইনে পুলিশকে ওয়ারেন্ট বা আদালতের অনুমতি ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে তল্লাশি ও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার যে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে কোনো সাধারণ নাগরিক যেন ভুয়া আইডি বা জালিয়াতির শিকার হয়ে অযথা হেনস্তার শিকার না হন, সেজন্য আইনে যৌক্তিক কারণ এবং জবাবদিহিতার একটি ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জবাবদিহি জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে প্রথাগত বা অফলাইন জুয়ার চেয়ে মানুষ এখন অনেক বেশি অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে সহজলভ্যতা, ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ এবং মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। এনিক এদিনকে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, অফলাইন জুয়ায় সামাজিক লোকলজ্জা, আইনি ভয় এবং সশরীরে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু অনলাইন জুয়া বা বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলো স্মার্টফোনের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয়, এমনকি শোবার ঘরেও পৌঁছে গেছে। ড. তৌহিদুল হক এই মহামারি থেকে সমাজকে মুক্তির জন্য সমন্বিত আইনি, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন। তার মতে, কেবল গ্রেফতার বা শাস্তি দিয়ে এই নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দৈনিক এদিনকে বলেন, অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং আর ক্রিপ্টোকারেন্সির অদৃশ্য থাবা তরুণ সমাজকে ধ্বংসের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে না, বরং হুন্ডি ও ব্লকচেইনের আড়ালে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে কোটি কোটি টাকা পাচার করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের হাতে। এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠোর জুয়া প্রতিরোধে আইনের সংশোধ তখনই কেবল সফল হবে, যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী করপোরেট প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতায় আনবে এবং ডার্ক ওয়েব ও সাইবার অপরাধ দমনে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারবে। অন্যথায়, এই আইন কেবলই একটি কাগজ-কলমের ভাষা হয়ে থাকবে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কার্যকর উপায়
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা দৈনিক এদিনকে বলেন , সরকার ঘোষিত জুয়া আইন ২০২৬ কার্যকরের মাধ্যমে দেশে সব ধরনের অনলাইন জুয়া ও বাজি ধরা নিষিদ্ধ করা হলেও, তা মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়ন করা বেশ জটিল ও চ্যলেঞ্জিং।তিনি বলেন অনলাইন জুয়া পুরোপুরি বন্ধের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর কারিগরি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথাগত আইনি কাঠামো দিয়ে এই ডিজিটাল অপরাধ দমন করা কঠিন, যদি না আন্তর্জাতিক ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়।
সার্ভার ও মূল হোতাদের আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক অবস্থান
অনলাইন জুয়া চক্রের মূল চালিকাশক্তি বা হোতারা সাধারণত বাংলাদেশ সীমানার বাইরে অবস্থান করে। তানভীর হাসান জোহা জানান, এই সমস্ত জুয়ার ওয়েবসাইট বা অ্যাপগুলোর সার্ভার এমন সব দেশে হোস্ট (পরিচালনা) করা হয়, যেখানে জুয়া খেলা সম্পূর্ণ বৈধ। ফলে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চাইলেও ওইসব দেশের সার্ভার জব্দ করতে পারে না। অন্য দেশের বিচারিক এখতিয়ারের কারণে অপরাধীদের মূল আস্তানায় আঘাত করা কিংবা আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল, যা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
ডিজিটাল জুয়ায় লেনদেনের জন্য বর্তমানে প্রথাগত ব্যাংকিং বা চেনা মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমের চেয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। জোহা তাঁর দীর্ঘ সাইবার অপরাধ তদন্তের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো এর 'অ্যানোনিমিটি' বা বেনামী লেনদেনের সুবিধা। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ থাকে না। ফলে কোন অ্যাকাউন্ট থেকে কার কাছে টাকা যাচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট গ্রাহক তথ্য বা ট্র্যাকিং ডেটা বের করা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি অপরাধীদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি অন্ধ গলিতে ঠেলে দেয়।
ডাইনামিক ডোমেইন ও মিরর সাইটের বিস্তার
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রতিনিয়ত শত শত জুয়ার সাইট ব্লক বা ফিল্টার করলেও অপরাধীরা এর বিকল্প বের করে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চক্রগুলো অত্যন্ত আধুনিক 'ডাইনামিক ডোমেইন ও মিরর সাইট ব্যবহার করে। প্রযুক্তিগতভাবে, বাংলাদেশ থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ডোমেইন বা আইপি অ্যাড্রেস ব্লক করার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা হুবহু এক রকমের নতুন সাব-ডোমেইন বা ক্লোন সাইট চালু করে দেয়। ফলে সরকারের ফিল্টারিং বা ব্লকিং সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে জুয়াড়িরা নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম সচল রাখতে পারছে।
দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও পর্নোগ্রাফির পাশাপাশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে জুয়া আইন ২০২৬ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হলেও এর শতভাগ বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। সাইবার অপরাধ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, সনাতন পদ্ধতিতে শুধুমাত্র ডোমেইন বা ওয়েবসাইট ব্লক করে কিংবা ঢালাও আইনি চাপ প্রয়োগ করে এই বৈশ্বিক ও অদৃশ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দৈনিক এদিন এর কাছে এই সাইবার বিপর্যয় রুখতে তিনি অত্যন্ত কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কিছু কারিগরি সুপারিশ তুলে ধরেছেন, যা আন্তর্জাতিকভাবেও সাইবার অপরাধ দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে। তানভীর হাসান জোহার বিশ্লেষণ ও সুপারিশ অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার তিন প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবিলম্বে নিচের চারমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন ও এআই-ভিত্তিক কনটেন্ট ফিল্টারিং
বর্তমানে বিটিআরসি কেবল জুয়ার নির্দিষ্ট ডোমেইন বা ইউআরএল ব্লক করে থাকে, যা ডাইনামিক বা মিরর সাইটের কারণে কয়েক মিনিটেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর বিকল্প হিসেবে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে পর্যায়ে ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন প্রযুক্তি চালুর সুপারিশ করেছেন তানভীর হাসান জোহা। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক ট্রাফিক অ্যানালাইসিস ব্যবহার করতে হবে। এটি ওয়েবসাইটের নাম না দেখে, তার ভেতরের ডেটা প্যাকেট বা কনটেন্ট প্যাটার্ন রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করবে। ফলে জুয়াড়িরা যতবারই নতুন নাম বা সাব-ডোমেইনে সাইট খুলুক না কেন, এআই তার অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য দেখে জুয়ার সাইট হিসেবে শনাক্ত করবে এবং সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা ব্লক করে দেবে।
ফিনটেক মনিটরিং ও সন্দেহজনক মানি ট্রেইল ট্র্যাকিং
অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বাড়লেও, বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের জুয়াড়িরা স্থানীয় পেমেন্ট গেটওয়ে এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন বিকাশ, রকেট বা নগদের এজেন্টদের ক্যাশ-আউট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। জোহা জানান, ক্রিপ্টোকারেন্সি সরাসরি ব্লক করা কঠিন হলেও এর দেশীয় সিন্ডিকেট ও এজেন্টদের কঠোর নজরদারিতে আনা সম্ভব। ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নত এআই টুলস ব্যবহার করে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক লেনদেনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে কেন বারবার অস্বাভাবিক বা চক্রাকার লেনদেন হচ্ছে, তার ডিজিটাল ক্যাশ মেমো বা মানি ট্রেইল ট্র্যাক করার মাধ্যমে অর্থ পাচারকারী ও দেশীয় এজেন্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
ডিএনএস হাইজ্যাকিং প্রতিরোধ ও ভিপিএন বাইপাস বন্ধ
সাধারণত সরকারিভাবে কোনো সাইট ব্লক করা হলে ব্যবহারকারীরা ফ্রি ভিপিএন অন করে কিংবা ডিভাইসের ডিএনএস পরিবর্তন করে অনায়াসেই সেসব নিষিদ্ধ জুয়ার সাইটে প্রবেশ করে। এই কারিগরি ফাঁকফোকর বন্ধে তানভীর হাসান জোহা নিরাপদ ও ফিল্টারড ডিএনএস সার্ভিস বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা যাতে বিটিআরসি বা দেশীয় আইএসপির নিরাপদ ডিএনএস প্রোটোকল বাইপাস করতে না পারে, সেই নিরাপত্তা প্রাচীর তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও ক্ষতিকর ভিপিএন প্রোটোকলগুলোর ট্রাফিক বিশ্লেষণ করে সেগুলোর আইপি ব্লক করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সাইবার টাস্কফোর্স গঠন
যেহেতু জুয়ার মূল সার্ভারগুলো দেশের বাইরে থাকে, তাই আন্তর্জাতিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যেমন ইন্টারপোল বা আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রাইম অ্যালায়েন্স-এর সাথে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিটিআরসি এবং সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমকে নিয়ে একটি যৌথ সাইবার টাস্কফোর্স গঠন করা সময়ের দাবি। এই টাস্কফোর্স সার্বক্ষণিকভাবে ডার্ক ওয়েব ও জুয়ার ফিনটেক ট্রাফিকের ওপর নজরদারি রাখবে, যা জুয়া আইন ২০২৬-এর লক্ষ্য অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
প্রস্তাবিত জুয়া আইন ২০২৬ সফল করতে আইনি ও কারিগরি পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সাইবার অপরাধ ও তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নাগরিকদের সুরক্ষায় বহুমুখী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
ডিজিটাল লিটারেসি ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি সচেতনতা
তানভীর হাসান জোহা জোর দিয়ে বলেন, অনলাইন জুয়া কেবল আর্থিক দেউলিয়াত্ব ডেকে আনে না, এটি একটি বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও বটে। ব্যবহারকারীদের এটি বুঝতে হবে যে, এই বেটিং সাইট বা অ্যাপগুলো ডিভাইসে প্রবেশ করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অজান্তেই অত্যন্ত বিপজ্জনক ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার ঢুকিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ছবি, কন্টাক্ট লিস্ট এবং ব্যাংকিং পাসওয়ার্ডের মতো সংবেদনশীল ডেটা চুরি হয়ে যায়। তাই জুয়ার ফাঁদ ও সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে দেশজুড়ে ব্যাপক 'ডিজিটাল লিটারেসি' বা সাইবার সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ও সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার
অনলাইন জুয়াড়িরা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের ডোমেইন ও নেটওয়ার্ক পরিবর্তন করে। এই তৎপরতা রিয়েল-টাইমে রুখে দিতে একটি শক্তিশালী পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন জোহা। তাঁর মতে সরকারের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার টেলিকম অপারেটর, ব্যাংক, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার গঠন করা প্রয়োজন। এই সমন্বিত হাবটি সার্বক্ষণিকভাবে জুয়ার ডিজিটাল ট্রাফিক, ম্যালওয়্যার ছড়ানোর প্যাটার্ন ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করবে এবং তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেবে।
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা দৈনিক এদিনকে বলেন, অনলাইন জুয়া বন্ধে কেবল প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়, যদি আমরা আর্থিক লেনদেনের উৎসগুলো অর্থাৎ এজেন্ট নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারি। তিনি বলেন প্রযুক্তির সাথে কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং আর্থিক খাতের নজরদারি এই তিনের সমন্বয়ই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র কার্যকর উপায়।
প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা জরুরি
অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ আসক্তিকে কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়, বরং এটি একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি বা গ্যাম্বলিং ডিজঅর্ডার হিসেবে দেখছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার দৈনিক এদিনকে বলেন, জুয়ায় জেতার পর মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক হরমোনের তীব্র নিঃসরণ ঘটে, যা সাময়িক উত্তেজনা ও পরম আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। এই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ বারবার বাজি ধরে। শুরুতে সামান্য টাকা জিতে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার লোভ তৈরি হয়, আর পরবর্তীতে হেরে যাওয়া টাকা উদ্ধার করার মরিয়া চেষ্টা মানুষকে এক অন্তহীন চক্রে আটকে ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ মেখলা সরকার সতর্ক করে বলেন, এই আসক্তি কেবল একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয় নয়, এটি তরুণ প্রজন্মকে ঋণগ্রস্ততা, চরম মানসিক অবসাদ এবং নানাবিধ গুরুতর অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জুয়ার মরণনেশা থেকে যুব ও তরুণ সমাজকে বাঁচাতে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন ডা. মেখলা সরকার। এদিনকে তিনি বলেন, পারিবারিক পর্যায়ে কড়া নজরদারি এবং সন্তানদের আচরণগত পরিবর্তন যেমন হঠাৎ খিটখিটে মেজাজ, একাকীত্ব বা রহস্যজনক ধারদেনার স্বভাব লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিক কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি মেডিকেশন ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে ডিজিটাল লিটারেসি ও স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সুস্থ বিনোদনের বিকল্প তৈরি ব্যবস্থা করতে হবে। ডা. মেখলা বলেন,আইনি কঠোরতার সাথে এই মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার সমন্বয় ঘটলেই কেবল একটি সুস্থ ও জুয়ামুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।
(আগামী পর্বে থাকছে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে ভয়াবহ অন্ধকারে তরুণ প্রজন্ম)


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









