অনলাইন জুয়ার জালে জড়িয়ে অনেক যুবকের আত্মহত্যার দৃষ্টান্ত জেনেছে এদিনের অনুসন্ধান টিম। গত দুই বছরে ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ই অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজনদের বুকফাটা কান্না, স্ত্রীর অসহায়ত্ব আর কবরের পাশে মায়ের আহাজারি যেন জানিয়ে দিচ্ছে, এটি আর কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, ধীরে ধীরে একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার ফাঁদে এই জেলায় মৃত্যুর তালিকায় সর্বশেষ নাম ২০ বছর বয়সী নাহিদ রানার। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পশ্চিম বেগুনবাড়ি ভূজারীপাড়া গ্রামের এই তরুণ ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে অনলাইন জুয়ায় কয়েকবার টাকা জেতেন নাহিদ। সেই সাফল্যই তাকে আরো বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল অর্থ হারান। ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও পরিবারের কাউকে নিজের কষ্ট বুঝতে দেননি। অবশেষে হতাশা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দুই মাস আগে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।
আমাদের ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি রেদওয়ান মিলন জানান, ছেলের মৃত্যুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই কবরের পাশে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নাজি। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে অনলাইন জুয়া কেড়ে নিয়েছে। টাকা হারিয়ে ও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি, ও এত বড় বিপদে ছিল। সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, এই অনলাইন জুয়া বন্ধ করুন। আমার ছেলের মতো কোনো মায়ের বুক যেন এই কালো নেশায় আর খালি না হয়।’ নাহিদের স্বজন খুশি মণি বলেন, নাহিদের এক বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী খুব সুখেই সংসার করছিল। কিন্তু অনলাইন জুয়া সেই সুখের সংসার শেষ করে দিয়েছে। এখন শিশুসন্তানকে নিয়ে তার স্ত্রী বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একটি পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে। আরেক স্বজন মুন্না হাসান বলেন, শুরুতে কয়েকবার টাকা জেতার পর নাহিদ ভাবছিল আরো বেশি টাকা আয় করবে। এরপর টাকা হারতে হারতে একসময় সে কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলত না। শুধু নাহিদ নয়, এলাকায় আরো অনেকেই অনলাইন জুয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
এ ছাড়া চলতি বছরের এপ্রিলে সদর উপজেলার হরিহরপুর নয়াপাড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৩০) অনলাইন বেটিং সাইটে অর্থ হারানোর পর আত্মহত্যা করেন বলে তার পরিবারের দাবি। এর আগে গত জানুয়ারিতে পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম (৫০) বসতবাড়ি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। পরে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে স্বজনরা জানান। এদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী এবং ২০২৪ সালের মে মাসে একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজুও অনলাইন জুয়ার কারণে নিঃস্ব হয়ে আত্মহত্যা করেন বলে পরিবারের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে পরিবারগুলো মাদক নিয়ে যতটা চিন্তিত ছিল, এখন তার চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে অনলাইন জুয়া। কারণ, এই নেশা ঘরের ভেতরেই একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, কখন তাদের সন্তান বা স্বজন ভয়ংকর এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াহিদ হোসেন বলেন, আজ অন্যের সন্তান মারা যাচ্ছে, কাল হয়তো আমার সন্তানও একই পথে যাবে। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পুরো যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। আরেক বাসিন্দা সোহাগ আলী বলেন, অনলাইন জুয়া একজন মানুষকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই ভয়াবহ ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারের কঠোর অভিযান প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন এদিনকে বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিবারকে সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলে এই অনলাইন জুয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
পুলিশি অভিযান
অনলাইন জুয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযানের বেশকিছু দৃষ্টান্ত খুঁজে পেয়েছে এদিনের অনুসন্ধান টিম। সম্প্রতি অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অর্থ লেনদেনের জন্য পেমেন্ট গেটওয়ে পরিচালনার অভিযোগে রাজধানীর দোলাইরপাড় এলাকা থেকে দুইজনকে গ্রেফতার এবং তাদের আদালতে তোলার খবর জেনেছেন তারা। গত ১১ জুলাই রাজধানীর দোলাইরপাড় এলাকা থেকে আমিনুর ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে গুলশান এলাকা থেকে সাকিব হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। আসামি আমিনুর ইসলামের বয়স ৩৭ এবং সাকিব হোসেনের বয়স ২৮। তাদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি পাস হওয়া ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর অধীন রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করা হয়। মামলাটি করেন ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমির হামজা। তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন একই বিভাগের এসআই জাকির হোসেন। গ্রেফতার দুই ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতিও দিয়েছেন আদালত।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম গত ১২ জুলাই শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে ১৩ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। আদালতে দুই আসামিকে হাজির করে প্রত্যেকের পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত আমিনুর ইসলামের তিনদিনের এবং সাকিব হোসেনের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেন, ব্যবহৃত পেমেন্ট গেটওয়ে এবং এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত অন্যদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রিমান্ডে নিয়ে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত ১৬ জুলাই রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘অনলাইন জুয়া বিরোধী অভিযানে ৬ হাজার ৫০০টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিম কার্ড জব্দসহ আসামি গ্রেপ্তার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, রাজধানীর গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার ‘গডফাদার’ ধরেছেন তারা। অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী সংঘবদ্ধ চক্রের ছয় সদস্যকে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করেছেন তারা। গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), মো. আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)। ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার চক্রটির হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত অবৈধ অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেন করতেন। পুরো চক্রটি বিদেশ থেকে চীনের নাগরিক নাতান নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে জানিয়েছে ডিবি। তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি এমএফএস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিম কার্ড, বিভিন্ন কোম্পানির ৬৭টি সিম কার্ড, একটি ল্যাপটপ, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস এবং একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।
মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার চক্রটির ডিভাইস বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, তারা প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। চক্রটির হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত এর আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। অবৈধ আয়ে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। সম্প্রতি পূর্বাচলে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তিনি আবারও একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে চক্রটি নানা কৌশল অবলম্বন করত বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, যেখান থেকে আরিফুল ইসলাম রিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেখানে তিনি একসঙ্গে তিনটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি যে কক্ষে থাকতেন, সেটির দৈনিক ভাড়া ছিল ৫০ হাজার টাকা। কয়েক দিন পরপর অবস্থান পরিবর্তন করে কখনো অন্য হোটেলে, আবার কখনো কক্সবাজারের অভিজাত হোটেলে উঠতেন, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে সহজে শনাক্ত করতে না পারে।
এদিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, গত ১১ আগস্ট মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার শিবপুরে অন্যতম শীর্ষ অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্ট মুর্শিদ আলম লিপুর বাগানবাড়িতে অভিযান চালিয়ে জেলার অনলাইন ক্যাসিনো চক্রের হোতা ওয়াসিমকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এই অভিযানের সময় দুটি ল্যাপটপ, একটি ফোন, একটি ট্যাব, অনলাইন জুয়ার আর্থিক লেনদেনের প্রধান অ্যাপ রেডি অ্যাপসের ‘রেডি পে মাস্টারকার্ড’, বিপুল ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডসহ তিনটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, লিপু, পরাগ ও ক্যামেলসহ দেশের ৭-৮ জন শীর্ষ অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্ট বাগানবাড়িতে অবস্থান করে জুয়ার সাইটের কাজ পরিচালনা করছেন–এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়। দূরবর্তী স্থানে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরায় পুলিশের গাড়ির উপস্থিতি দেখতে পেয়ে বাগানবাড়িতে থাকা ব্যক্তিরা গোপন পথ দিয়ে পালিয়ে যান।
জানা গেছে, মুর্শিদ আলম লিপুর নামে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৪টি সাইবার আইনে মামলা চলমান রয়েছে। তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। এদিকে মাগুরায় অনলাইন জুয়া চক্রের ‘মাস্টার এজেন্টসহ’ দুজনকে গ্রেফতারের তথ্য পেয়েছে এদিন টিম। সদর উপজেলার সাজিয়াড়া এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোল্যা আজাদ হোসেন। গ্রেপ্তাররা হলেন, সদর উপজেলার সাজিয়াড়া গ্রামের আসাদুজ্জামানের ছেলে হৃদয় হাসান এবং একই এলাকার তাহাজ্জত মুন্সির ছেলে ইমন হোসেন শান্ত ওরফে লিমন। তাদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন, নগদ, বিকাশ, রকেট ও উপায়ের ভুয়া মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে ব্যবহৃত ৫৮টি সিমকার্ড এবং জুয়ার হিসাব-সংক্রান্ত খাতাপত্র জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তাররা দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়া সাইট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত এবং মাস্টার এজেন্ট হিসেবে কাজ করে আসছিল।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন
অনলাইন জুয়ার এই আগ্রাসন নিয়ে আইন ও সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আইনজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আর্থিক প্রলোভনে পড়ে যুবসমাজ রাষ্ট্রের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। অনলাইন জুয়ার হাত ধরেই মাদক ও অন্যান্য সাইবার অপরাধের সূত্রপাত হচ্ছে, যা একটি কর্মক্ষম প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনলাইন জুয়া কেবল একজন ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি করছে না, বরং পুরো একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী জুয়া প্রতিরোধ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। আমাদের দেশে ১৫৭ বছরের পুরনো আইন দিয়ে জুয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছিল। সম্প্রতি সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস হয়েছে। এখন এর কঠোর প্রয়োগ সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্যাটেলাইট চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুয়ার ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়া এক ধরনের মারাত্মক মানসিক ব্যাধি বা 'অ্যাডিকশন'। মাদকাসক্তির মতোই এটি মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। জুয়ায় হারার পর সেটি উসুল করার জন্য মানুষ আরো বেশি জড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় তরুণদের মধ্যে একাকীত্ব, বেকারত্ব এবং দ্রুত বড়লোক হওয়ার মানসিকতা তাদের এই অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সাইবার অপরাধ তদন্ত বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো সাধারণত বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা প্রতিনিয়ত শত শত জুয়ার সাইট ও অ্যাপ ব্লক করছি, কিন্তু ভিপিএন ব্যবহার করে জুয়াড়িরা আবার সেগুলোতে প্রবেশ করে। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ডোমেইনে এই সাইটগুলো চালু হয়। এটি বন্ধ করতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত ব্লক নয়, বরং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সন্দেহজনক লেনদেন কঠোরভাবে নজরদারি করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সিলেট অঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন সাইবার অপরাধ তদন্ত কর্মকর্তার মতে, সিলেটে অনলাইন জুয়াড়িদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গোপন। তারা সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখে। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানীয় অনেক ক্যাসিনো এজেন্ট এবং হোতাদের গ্রেফতার করেছি। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো জুয়ার সাইটগুলোর মূল সার্ভার থাকে দেশের বাইরে। তাছাড়া ভিপিএন ব্যবহার করার কারণে এদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একজন সমাজবিজ্ঞান শিক্ষকের মতে, সিলেটের একটি বড় অংশের মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় পরিবারের অভিভাবকরা প্রবাসে থাকায় সন্তানদের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সহজে এবং দ্রুত বড়লোক হওয়ার মানসিকতা তরুণদের এই মরণনেশায় ধাবিত করছে। এটি রুখতে শুধু আইনি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; ধর্মীয় মূল্যবোধ, কঠোর পারিবারিক নজরদারি এবং এলাকাভিত্তিক সামাজিক সচেতনতা কমিটি গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
ময়মনসিংহ জেলা ও বিভাগীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, অনলাইন জুয়াড়ি ও স্থানীয় এজেন্টদের ধরতে তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন এবং অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচয় গোপন রাখা এবং জুয়ার মূল হোতারা দেশের বাইরে থাকায় এটি পুরোপুরি উপড়ে ফেলা কঠিন হচ্ছে। তারা মনে করেন, শুধু গ্রেফতার করে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়, এজন্য সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আনন্দ মোহন কলেজসহ স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বেকারত্ব, রাতারাতি ধনী হওয়ার মোহ এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব তরুণদের এই অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য, সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। সন্তান হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে পড়ছে কি না বা তার অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লায় প্রতিনিয়তই আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই পুলিশ অপরাধীকে গ্রেফতার করছে। ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
বরিশালের শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী অধ্যাপিকা টুনু রাণী কর্মকার এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মাদকের চেয়েও অনলাইন জুয়া এখন বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটি অদৃশ্য। অনেক পরিবার ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। শুধু আইন প্রয়োগ করে এটি বন্ধ করা যাবে না। সন্তানদের ডিজিটাল লাইফে কী চলছে, তা নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত চক্র এবং এর এজেন্টেদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। বেশ কিছু সাইট শনাক্ত করে বন্ধের আইনি প্রক্রিয়া চলমান। তবে এটি মূলত একটি সামাজিক ব্যাধি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রতিকারের পথ
অনলাইন জুয়া রুখতে মাদকের মতোই ‘জুয়াকে না বলুন’ স্লোগানে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং পারিবারিক পর্যায়ে সন্তানদের ডিভাইস ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
১. কঠোর নজরদারি: মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলগুলোর অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক ট্রানজেকশন দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া।
২. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্য ইন্টারনেটে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে কি না বা হঠাৎ বিপুল টাকার লেনদেন করছে কি না, সেদিকে নজর রাখা।
৩. সামাজিক প্রতিরোধ: তরুণদের খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনে যুক্ত করা এবং জুয়ার কুফল সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









