৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও সম্মান জানানো, তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং গুমের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর এ দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাও’।
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গুম ও অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন আটকে রাখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ তৈরি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, গুম বা অপহরণ শুধু একজন মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা ও আকাঙ্ক্ষারও মৃত্যু ঘটে। বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও তিনি জানান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। স্বজনদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অনেককে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে বিভিন্ন গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিযোগও সামনে আসে।
গুম কমিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের অভিযোগের একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর এসব অভিযোগের তদন্ত ও বিচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। গুমের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও আবেদন করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করেছেন।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে। এর পর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার।
গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই উদ্দেশ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ গত ২৭ আগস্ট সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকেও আইনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের ইতিহাস জাতিসংঘের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হয়। ওই সনদের আওতায় ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা, দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহিতার চাপ তৈরি করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে ২০১১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
এদিকে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অতীতের সব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









