বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানিতে চার্জ বাড়িয়েছে ভারত। এর জেরে চিনা বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা করছে ঢাকা। সেখানে ১২৭ শতাংশ বেশি খরচ করতে হবে বাংলাদেশকে। এ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার আনন্দবাজার ডট কম বাংলাদেশকে খোঁচা দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। রিপোর্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
ভারত বিরোধিতার নামে নিজের পায়েই কুড়ুল! বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ফুটে উঠছে সেই চিহ্ন। নয়াদিল্লিকে বাদ দিয়ে সম্প্রতি চিনা বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ঢাকা। এর খেসারত হিসাবে ইউনিটপ্রতি ১২৭ শতাংশ বেশি খরচ করতে হবে পদ্মাপারের বাসিন্দাদের। যদিও বিষয়টিকে পাত্তা না দেওয়ার ভাব দেখাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার।
বিদ্যুতের ব্যাপারে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই ভারতের থেকে বিপুল পরিমাণে তা আমদানি করে থাকে ঢাকা। এ-হেন আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য রয়েছে একটি সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি (এসএনএ)। চলতি বছরের অগস্টে তাতে ইউনিটপ্রতি ০.০১ রুপি চার্জ চাপায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন (সিইআরসি)। ফলে বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ঢাকা।
এর পরই বিদ্যুতের এসএনএ চার্জ কমাতে ভারতকে অনুরোধ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। পদ্মাপারের আর্থিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে তাদের প্রস্তাব মেনে নেয় নয়াদিল্লি। রাতারাতি অর্ধেক কমানো হয় চার্জ। ফলে বর্তমানে ইউনিটপ্রতি ০.০০৫ রুপিতে নেমে এসেছে সেটি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও এ দেশের থেকে মুখ ঘুরিয়ে চিনা বিদ্যুৎ কেনায় সিলমোহর দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার।
আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ইচ্ছা করে বাংলাদেশের উপর এসএনএ চার্জ চাপানো হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। তড়িৎ পরিবহণ এবং পরিষেবার বেশ কিছু দৈনন্দিন খরচ রয়েছে। এর মধ্যে গ্রিড পরিচালনা, জ্বালানির হিসাব, সময়সূচি নির্ধারণ এবং তার নিরীক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই বিদ্যুতের দামের বাইরে এই অর্থ নিয়ে থাকে নয়াদিল্লি। যদিও এই অতিরিক্ত খরচ অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম।
এ-হেন পরিস্থিতিতে ঢাকার আমিনাবাজারে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে চাইছে তারেক সরকার। চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনকে দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত প্রকল্পের বরাত। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করবে তারা। ২০২৮ সালের অগস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে বাণিজ্যিক ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ হবে বলে আশাবাদী পদ্মাপারের প্রশাসন। কিন্তু, এর জন্য বেশি শুল্ক দিতে হবে তাদের।
চিনা উদ্যোগের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পটি খুবই ছোট (মাত্র ৪২ মেগাওয়াটের)। উপরন্তু, সেখানকার পরিষেবা পেতে ইউনিটপ্রতি খরচ পড়বে ২৫ রুপি। গত আর্থিক বছরে (২০২৫-’২৬) ভারতের থেকে ইউনিটপ্রতি ১১ রুপিতে বিদ্যুৎ কিনেছে বাংলাদেশে। বর্ধিত এসএনএ চার্জ নিয়ে এ বার সামান্য বাড়বে সেই অঙ্ক। সেখানে বেজিঙের বিদ্যুৎ পেতে ১২৭ শতাংশ বেশি খরচ হবে ঢাকার।
আমিনাবাজারের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন পরিচালনা করবে বলে জানা গিয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর কথায়, ‘‘এখানকার আবর্জনা একটা বড় সমস্যা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শহর পরিষ্কার রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, দুটোই একসঙ্গে করা যাবে।’’
বাংলাদেশের অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে গ্যাসের বড় ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে তার সরবরাহও হ্রাস পেয়েছে। পদ্মাপারের বিদ্যুৎশিল্পে দৈনিক ন্যূনতম ১০০ কোটি ঘনফুট বা তার বেশি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে ৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাচ্ছে না ঢাকা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এর জেরে কখনও কখনও ৯-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
এই বিদ্যুৎ সঙ্কটের জেরে আমজনতার মধ্যে তীব্র হচ্ছে ক্ষোভ। বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের এই নিয়ে রাস্তায় নামতেও দেখা গিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-’২৫ আর্থিক বছরে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১৫.৮ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করেছিল ঢাকা। এর মূল্য ১ লক্ষ ২১ হাজার ৪২০ কোটি রুপি। এর মধ্যে ১৯ হাজার ২২৫ কোটি রুপি পরিশোধ করেছে পদ্মাপারের প্রশাসন।
বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা কোনও অবস্থাতেই মেটাতে পারবে না ঢাকার আমিনাবাজারের প্রস্তাবিত প্রকল্প। কারণ, ২০২৪-’২৫ আর্থিক বছরে ভারতের থেকে ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করেছিল পদ্মাপারের প্রশাসন। সেখানে বেজিঙের সহায়তায় মাত্র ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সেখানে। পাশাপাশি, জৈব সারও সেখান থেকে পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী আলম।
ভারতের থেকে বাংলাদেশের মুখ ফিরিয়ে থাকার কারণ মূলত রাজনৈতিক বলেই মনে করে পর্যবেক্ষক মহল। সম্প্রতি, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের ‘ইসলামি নেটো’য় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তারেক রহমানের সরকার। ঢাকার এই সামরিক জোটে যোগদান নয়াদিল্লির জন্য বেশ অস্বস্তির। ফলে একে কেন্দ্র করে দু’তরফের সম্পর্কে চিড় ধরার আশঙ্কা যে ষোলো আনা, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের ৭ অগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে ইসলামাবাদ, রিয়াধ ও আঙ্কারা। এর পোশাকি নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট)। সমঝোতা অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটিতে সশস্ত্র আক্রমণ হলে, সেটিকে বাকিদের উপর হামলা হিসাবে গণ্য করা হবে। এ ছাড়া, সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে তাতে।
এই চুক্তিকেই ‘ইসলামি নেটো’ বলে উল্লেখ করছে পশ্চিমি গণমাধ্যমের একাংশ। সংশ্লিষ্ট সমঝোতার কিছু দিনের মধ্যেই এতে যোগদানের ব্যাপারে ‘ঢাকা আগ্রহী’ বলে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বসেন বাংলাদেশের দুই মন্ত্রী। শুধু তা-ই নয়, সৌদির যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের আমন্ত্রণে কিছু দিনের মধ্যেই রিয়াধ সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক। তখনই গোটা বিষয়টি চূড়ান্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘ইসলামি নেটো’য় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে প্রথমে মুখ খোলেন বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর কথায়, ‘‘সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের আর্থিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগদানের ব্যাপারে ঢাকার ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে আমরা নিজস্ব স্বার্থ, পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’’ তাঁর ওই বক্তব্যের পরই তুঙ্গে ওঠে জল্পনা।
পরে এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও চুক্তি বা বহুপাক্ষিক সংস্থায় যোগদানের বিষয়টি নির্ভর করবে ঢাকা ও এখানকার জনগণের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তার উপর।’’ তবে দক্ষিণ ইউরোপের তুরস্ক থেকে আরব দুনিয়া হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত জোটে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেননি তিনি।
গত ৩১ অগস্ট বৈঠক করে মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিন দেশ। এতে যোগদানের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে ঢাকা। পদ্মাপারের প্রশাসনের দাবি, তার জন্য ইতিবাচক আলোচনা চলছে। তবে ‘ইসলামি নেটো’য় যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি নেই বলেই মনে করে পদ্মাপারের প্রশাসন। এতে অন্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্কের কোনও প্রভাব পড়বে না বলেই মনে করছে তারা।
এ ব্যাপারে সংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হুমায়ুন বলেন, “বাঁচার আগে যদি মরার চিন্তা করেন তা হলে কী লাভ? বাঁচার আগে যদি মরার চিন্তা করি, তা হলে তো সমস্যা… এটা একটা অনন্য চুক্তি। এখানে ঝুঁকির কিছু নেই।” তিনি মুখে যা-ই বলুন না কেন, মক্কা চুক্তিতে ঢাকা যোগ দিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জলও যে ঘোলা হতে পারে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
অন্য দিকে বাংলাদেশের এ-হেন শরীরী ভাষা নিয়ে ভুরু কুঁচকেছে ভারতের কূটনৈতিক মহল। গত ২৮ অগস্ট এ ব্যাপারে বিবৃতি দেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবাল। তিনি অবশ্য এ ব্যাপারে সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি। তাঁর কথায়, “আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন সব ঘটনাক্রমের উপর নজর রাখা হচ্ছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









