চলমান আমন মৌসুমে তীব্র সার সংকটের সঙ্গে বীজ, সার ও কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধিতে আমন ধান ছাড়াও সবজি চাষও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় সামনের বোরো মৌসুমে আরও বড় ধরনের সংকট অপেক্ষা করছে বলে শঙ্কা কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের। তবে, সারের সংকট নেই বলে দাবি সরকারের কৃষি কর্মকর্তাদের।
তবে, তাঁদের হিসাবে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকলেও কৃষক ও ডিলারদের ভাষ্য হচ্ছে, বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, বিতরণ ব্যবস্থায় সমস্যা এবং ডিলারদের একাংশের কালোবাজারি ও অবৈধ মজুদে সারের এই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা অনেকটাই ‘কৃত্রিম’। আবার, দেশে সার উৎপাদন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার টন কমে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
একই সময়ে সারের রফতানি আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার তথ্যও দিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। তবে ডিলারদের কেউ কেউ দাবি করছেন, আগামী নভেম্বরের আলু ও পেঁয়াজ চাষ ঘিরেও আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যে কারণে সারের চাহিদায় চাপ বাড়ছে।
সার সংকটে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা
ব্রহ্মপুত্র নদের একপারের কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর পাগলার হাট গ্রাম ও অন্যপারের রৌমারি উপজেলার তিলতেলী গ্রামে এখনও সারের তীব্র সংকট। দুই পারের কৃষকেরাই এই সার সংকটে ভুগছেন। এর মধ্যে সময়মতো পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় সম্প্রতি ভুরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের সারের ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যান কৃষকরা।
শিলখুড়ি ইউনিয়নের পাগলার হাট গ্রামের কৃষক মো. জসিম উদ্দীন ১২ বিঘা জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ধান লাগানোর তিন সপ্তাহের মধ্যে সার দেওয়া লাগে। কিন্তু মাস হইয়া গেলেও সার পাই নাই। পরে বাধ্য হইয়া খোলা বাজার থেইকা বেশি দামে সার কিনছি।’
অন্যদিকে রৌমারীর তিলতেলী গ্রামের কৃষক এরশাদুল হক বলেন, ‘ধান লাগানো শেষ। এখন ধানি জমিতে সার প্রয়োগ করার সময়। কিন্তু সার পাচ্ছি না। পাওয়া গেলেও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে।’ প্রান্তিক এই কৃষকের অভিযোগ, ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের সরকারি দাম ৫০ কেজির বস্তার দাম এক হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু দোকান থেকে (কালোবাজার) নিতে হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনা হাট বাজারে বুধবার সারের দাবিতে সড়ক আটকে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। পরে এক ঘণ্টা পর সার বিতরণে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
সার-বীজ-কীটনাশকের উচ্চমূল্যেও দিশেহারা চাষিরা
দেশজুড়ে এখন মাঠজুড়ে সবজির সমারোহ। কোথাও ক্ষেতের পর ক্ষেত সবুজ চাদরে ঢাকা পড়েছে। আবার কোথাও মাঠ প্রস্তুতি শেষে বীজ বপনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষিরা।
বীজ থেকে উঁকি দেওয়া চারা মনে সুখময় প্রশান্তি এনে দিলেও সবুজের এ অগ্রগতি ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। কারণ হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে সার-বীজ-কীটনাশকের দাম।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ি গ্রামের চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গতবার যে ফুলকপির এক প্যাকেট বিচি (বীজ) কিনেছিলাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়, এবার সেই বীজ কিনতে হল এক হাজার ৭০০ টাকায়। তার সঙ্গে বাঁশের দাম বেড়েছে, মজুরের দাম বেড়েছে, পলিথিনের দাম বেড়েছে, ডিজেল-পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধিতে সেচেও বেশি খরচ হচ্ছে। এতো খরচের পর সবজি বেচে লাভ পাই কিনা তা নিয়েই ভাবতেছি।’
একই শঙ্কার কথা জানান মীরেরবাড়ি গ্রামের খবির উদ্দিনের ছেলে কামাল ও গোলজার খন্দকারের ছেলে রাকিব খন্দকারসহ অন্য চাষিরাও। তারা বলছেন, মৌসুম এলেই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সংকট দেখিয়ে বীজ, সার ও কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি করে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবজি চাষের খরচ সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা হচ্ছে। তারা চান সরকারের সঠিক তদারকির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা হোক। একই সঙ্গে সংকট দূর করে কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
এই গ্রামের প্রবীণ চাষি গোলজার খন্দকার বলেন, ‘সবজিই মীরের বাড়ি গ্রামের কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল। একেকজন কৃষক এক একর থেকে ৪/৫ একর জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, বরবটি, গাজর, টমেটো, শসাসহ বিভিন্ন সবজি আগাম সবজি চাষ করবেন। তবে বড় সমস্যা হল চাইলেই সার পাওয়া যায় না। ডিলাররা বলে সার নাই। বাধ্য হয়ে খোলাবাজারে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া আগাম সবজি চাষে অধিক হারে কীটনাশকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজারে কীটনাশকের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিষয়গুলো সরকারের তদারকি করা দরকার।’
খেদাবাগ গ্রামের বর্গাচাষী মনিরুজ্জামানের ছেলে মোকছেদুল বলেন, ‘এক প্যাকেট ফুলকপির বীজে খরচ ৬০০ টাকা, চারা হয় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০টি। বীজ থেকে ২৫/৩০ দিনে চারা হয়। এই চারা ৬০ দিন পর উত্তোলন পর্যায়ে চলে যাবে। সব মিলিয়ে ৯০ দিন পর সবজি ঘরে তোলা যাবে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে কুড়িগ্রাম জেলায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এর বাইরে সাড়ে ৭০০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠে বীজ রোপণ ও চারা লাগানোয় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। আগাম চাষ করে লাভবান হতে চান তারা।
সার-বীজ-কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোনো বক্তব্য না দিলেও রাজারহাট উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, ‘সবজি চাষ করে এখানকার চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। জেলার চাহিদা মিটিয়ে পাশ্ববর্তী এলাকায় সবজি বিক্রি করে তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগই বেশি
বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার অতিরিক্ত দামে বিক্রি, অবৈধভাবে মজুদ, লাইসেন্স ছাড়া সার ব্যবসা এবং ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও সার জব্দ করা হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সার বিক্রির কথা প্রতি কেজি ২২ টাকা দরে। ৫০ কেজির এক বস্তার দাম এক হাজার ১০০ টাকা। টিএসপির কেজি ২৭ টাকা, বস্তা এক হাজার ৩৫০ টাকা। ডিএপির কেজি ২১ টাকা, অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা। আর এমওপি সারের কেজি ২০ টাকা, বস্তা এক হাজার টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার না পেয়ে খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপির ৫০ কেজির বস্তা কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় একেকটি বস্তায় বাড়তি দিতে হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। ডিএপির ক্ষেত্রেও ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতি বস্তায় কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। পাবনা সদর উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের শ্রীকোল বাজারে ডিলার মেসার্স আফতাব ট্রেডার্স অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছিল। কৃষকদের কাছে ১ হাজার ৫০ টাকা দামের সার এক হাজার ৫৩০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছিল। ২৭ আগস্ট ওই উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামারা তাসবিহা অভিযান চালিয়ে বেশি দামে বিক্রির অপরাধে ওই ডিলারকে জরিমানা করেন।
এভাবে দিনাজপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর, জামালপুর, মাগুরা ও মানিকগঞ্জে শুধু অগাস্ট মাসেই অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ করা ও অনিয়মের অভিযোগে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে যশোরের চৌগাছায় ১৩ হাজার ৫৫০ কেজি এবং ঈশ্বরগঞ্জে প্রায় ৩২ টন সার অবৈধ মজুদের প্রমাণ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান বলেন, ‘অভিযান পরিচালনা করলেই কৃষকের বরাদ্দের সার কালোবাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিয়নে অবৈধ সারের দোকান পাওয়া যাচ্ছে, যারা অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে।’
সামনে আরও বড় সংকট!
তবে কৃষিবিদেরা বলছেন, গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সঠিক দামে সার পৌঁছানো দুটি আলাদা বিষয়। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম রসুল বলেন, ‘যদি জাতীয় পর্যায়ে সারের সরবরাহ ও মজুদ ঠিক থাকে, তবে মাঠপর্যায়ে গ্রামের কৃষকরা সার পাচ্ছেন না কেন? উত্তর হল, সংকটটি সারের অপ্রতুলতার কারণে নয়, বরং এটি আমাদের বিতরণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ও তদারকির অভাবের কারণে সৃষ্ট।’
কালোবাজারে বাড়তি টাকায় সার মিলছে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে কোথায় কতটুকু স্টক আছে, সেই ডেটা হয়তো কম্পিউটারে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু একজন ডিলারের দোকানে কতটুকু সার এল এবং তা কৃষকের হাতে পৌঁছাল কি না, সেই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত নয়। এই স্বচ্ছতার অভাবের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র ফায়দা লুটছে।’
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির এই অধ্যাপক বলেন, ‘কোনো কোনো কৃষি কর্মকর্তা দায় এড়ানোর জন্য দাবি করছেন, কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন বলেই সংকট তৈরি হচ্ছে। এ দায় চাপানোর মানসিকতা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এত বড় বিভাগ থাকা সত্ত্বেও যদি তারা কৃষকদের সারের সুষম ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে না পেরে থাকে, তবে তা কৃষকদের অপরাধ নয়; বরং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিজেদেরই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।’
কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া অঞ্চলের মতো সারা দেশেই সারের চাহিদা এখন বেশি। কৃষকরা বলছেন, আমন ধান রোপণের পর থেকে শীষ আসার আগ পর্যন্ত জমিতে কয়েক দফা সার দিতে হয়। কিন্তু ভরা মৌসুমেই সার না পেয়ে অথবা বেশি দামে কিনে জমিতে দিতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
তবে, সার সংকট নেই- দাবি করে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ইউনিয়নের ডিলার বিমল কুমার সাহা বলেন, ‘পর্যাপ্ত সার পাচ্ছি। আমাদের এখানে সারের সংকট নেই। এ সময়ে কৃষকরা আলু চাষের জন্য অগ্রিম টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) সার চাচ্ছেন, তাই চাহিদা একটু বেড়ে গেছে। পেঁয়াজ ও ভুট্টার জন্যও অনেকেই আগে থেকে সার নিচ্ছেন। ফলে সারের ওপর চাপ বাড়ছে।’
এ অবস্থা চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনের মৌসুম বোরোতে সারের বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। কৃষি বিশেষজ্ঞ গোলাম রসুল বলেন, ‘সামনে বোরো মৌসুম আসছে। সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আমাদের দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের সিংহভাগই আসে বোরো ধান থেকে এবং সারা দেশে মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৬০ শতাংশ একা বোরো মৌসুমেই দরকার হয়। নভেম্বর থেকেই বোরোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।’
সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘চলমান আমন মৌসুমের সংকটটি যদি আমরা দ্রুত সামাল দিতে না পারি, বর্তমানের আঞ্চলিক বা স্থানীয় সংকটগুলো যদি এখনই কঠোরভাবে প্রশাসনিক উপায়ে দমন করা না হয়, তবে বোরো মৌসুমে পুরো দেশের কৃষি উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়বে।’
সরকারের করণীয় বিষয়ে তার পরামর্শ হল- অবিলম্বে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটিকে আরও বেশি সক্রিয় করতে হবে। ডিলারদের সারের মজুদ ও বিক্রির তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে টাঙিয়ে দিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে সার অতিরিক্ত আছে, সেখান থেকে সারের ঘাটতি থাকা এলাকাগুলোতে অবিলম্বে পুনর্বণ্টন করতে হবে। সারের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে অসাধু কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তারপরও সংকট নেই, দাবি সরকারের
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ এবং এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এছাড়া এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের সুষম সার), জিপসাম, জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, বোরন ও অ্যামোনিয়াম সালফেটের চাহিদা ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে, অর্থাৎ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টন সার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া চার লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টন, টিএসপি তিন লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টন, ডিএপি তিন লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টন এবং এমওপি এক লাখ ৩৮ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে মোট মজুদ ছিল প্রায় ১২ লাখ টন।
অর্থাৎ গেল অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে মোট মজুদ প্রায় ৮৬ হাজার ১০০ টন বা ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কোনো সারের সংকট নেই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। এখন কোথাও কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।’
সারের সংকট নেই বলে দাবি করেছেন রাজশাহী জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামও। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। এর বাইরে পুকুরে ব্যবহৃত সারের চাহিদা থাকলেও এর জন্য আলাদা বরাদ্দ নেই। এর ফলে কৃষিজমির জন্য বরাদ্দ করা সারের ওপরও চাপ বাড়ার কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এ কারণে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
বরাদ্দেই গরমিল!
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) রাজশাহী জেলা ইউনিটের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, রাজশাহীতে কৃষকের সংখ্যা চার লাখ ১২ হাজারের বেশি। জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর। সেপ্টেম্বর মাসে পুরো জেলার জন্য টিএসপি সারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র এক হাজার ৪৫ টন। এ পরিমাণ সার প্রত্যেক কৃষককে এক বস্তা করে দেওয়া হলে ২০ হাজার ৯০০ কৃষকের সার পাবেন। আর অন্য সারের মধ্যে এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সার এক হাজার ৬২৯ টন এবং ডিএপি তিন হাজার ১৫ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিএফএ জেলা ইউনিটের সভাপতি মো. ওছমান আলী বলেন, বর্তমান বরাদ্দ কৃষকদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করলে একজন কৃষকের ভাগে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ কেজি টিএসপি, ৪ কেজি এমওপি ও ৭ কেজি ডিএপি পড়ে। কৃষকের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সারের বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। রাজশাহীতে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষ হয়। এসব পুকুরের জন্যও সার বরাদ্দ দেওয়ার দাবি তার।
চাহিদা নির্ধারণেও সমস্যা
সার ও বীজ মনিটরিংয়ে যুক্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা সার সংকটের পেছনে কৃষি কর্মকর্তাদেরও দায় আছে বলে মনে করেন। ঊর্ধ্বতন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়তে পারেন, এ আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। ওই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা সারের চাহিদার সঠিক পরিকল্পনা করেন না।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমানে হাওরাঞ্চলে চাষ কম। কিন্তু উত্তরবঙ্গ—রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরে এখন পিক টাইম। কিন্তু সারের বরাদ্দ প্রায় একই রকম।’এ ক্ষেত্রে একটি বর্ষপঞ্জি থাকার কথা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, সেই অনুসারে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে যাচাই করেন না, এমন অভিযোগ তুলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বছরের শুরুতে সার ও বীজ ব্যবস্থাপনা কমিটি চাহিদাপত্র নেয়। জেলায় সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আছে। উপজেলা থেকে কোন সার কী পরিমাণ দরকার, তার চাহিদা নেওয়া হয়। তার ওপর ভিত্তি করে বর্ষপঞ্জি সাজানো হয়।’ চাহিদা হিসেবে সার বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কমিটির লোকজন যথাযথভাবে যাচাই না করে গতানুগতিক চাহিদা দিয়ে দিচ্ছেন।’
এর নেতিবাচক দিক তুলে ধরে ওই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার উপজেলায় নয়টি ইউনিয়ন আছে, প্রত্যেক এলাকায় একইভাবে ধান উৎপাদন হয় না। কিন্তু সারের বণ্টন বা বরাদ্দ প্রায় সমান। অর্থাৎ প্রয়োজন ও চাহিদা অনুসারে সার বরাদ্দ ও বণ্টনে ঘাটতি আছে।’
তার মতে, বিভিন্ন এলাকায় আমন মৌসুম ১০ থেকে ১৫ দিন এদিক-ওদিক হয়। সেইভাবে সার পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অগাস্টেই জব্দের হিড়িক।
সাব-ডিলারিও সমস্যার কারণ
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি হলেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনও। এই কমিটির সভাপতি হিসেবে ফুলবাড়ীর ইউএনও আহমেদ হাছান মাঠপর্যায়ে সার সংকট তদারকি করতে গিয়ে আরো কয়েকটি কারণ খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন নীতিমালা অনুসারে তার উপজেলায় পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে ২৪ জন ডিলার থাকার কথা। চলতি বছর পর্যন্ত সব ডিলারের দোকান ছিল পৌরসভায়। ফুলবাড়ী পৌরসভা থেকে এলুয়াড়ী ইউনিয়ন ২৫ কিলোমিটার দূরে। ওই এলাকার কৃষকদের ২৫ কিলোমিটার এসে সার নিতে হতো। আরেকটি সমস্যা হল, মূল ডিলাররা ‘সাব-ডিলার’ রাখতেন। এগুলো অনুমোদিত ছিল না। কীটনাশকের দোকানেও সার পাওয়া যাচ্ছিল। তারা মূল ডিলারের নামে সার তুলছিল এবং খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছিল। আরেকটি সংকটের কথা তুলে ধরে আহমেদ হাছান বলেন, বর্তমানে দুই ধরনের ডিলার আছে—বিসিআইসি ও বিএডিসি। কিন্তু বিএডিসির ডিলাররা ইউরিয়া সার বরাদ্দ পান না। তারা টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি বরাদ্দ পান। কিন্তু প্রত্যেক উপজেলায় বিএডিসির অনেক ডিলার আছেন। মজুদ বাড়লেও সংকট কেন?
সার উৎপাদন কমেছে, রফতানি আয় নেমেছে ১০ লাখে
‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান (২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাব এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব)’ শিরোনামে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বিবিএস। তাদের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সার উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ১৭ হাজার ৮৫ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন কমেছে ৩৯ হাজার ৭৭৫ টন। শতকরা হিসাবে কমার হার ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাসে সার উৎপাদন হয়েছিল ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬০ টন। ওই অর্থবছরের শেষ মাসে উৎপাদন ছিল ৮৮ হাজার ৫৯৭ টন। তবে বিবিএস গত অর্থবছরের শেষ মাসের হিসাব দেয়নি। বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছিল। এরপর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু মার্চ ও এপ্রিলে আবার কমে যায়। মে মাসে ফের বৃদ্ধি পায়। মাসভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বড় ধস দেখা যায় অগাস্টে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অগাস্টে সার উৎপাদন ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৭৪৮ টন। চলতি অর্থবছরের আগস্টে তা নেমে আসে ১৩ হাজার ২২৩ টনে। শতকরা হিসাবে কমে যায় ৮৯ শতাংশের মতো। তবে প্রতিবেদনে মাসভিত্তিক উৎপাদন ওঠানামার কারণ সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিবিএস।
বিবিএসের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সার উৎপাদন হয় ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৭ টন। এর আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) হয় ৮ লাখ ৯৫ হাজার ১২১ টন। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার ৩৩৬ টন।
দেশে উৎপাদনের পাশাপাশি সার রফতানির তথ্যও রয়েছে বিবিএসের প্রকাশনায়। অর্থবছরভিত্তিক সার রপ্তানির টাকার অঙ্ক দেওয়া হয়েছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সার রপ্তানি হয় ১০৮ কোটি টাকার। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ কোটি টাকা। এরপর বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সার রপ্তানি নেমে আসে ১ কোটি ২ লাখ টাকায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৭০ লাখ টাকার। পরের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) রপ্তানি আয় কিছুটা বেড়ে দাড়াঁয় ৮০ লাখে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে রফতানি হছে মাত্র ১০ লাখ টাকার সার।
অন্যদিকে সার আমদানিতে দেশের ব্যয় অনেক বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে সার আমদানিতে ব্যয় হয় আট হাজার ২৬০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২৪ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানির ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় কমে ১৮ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার বেড়ে হয় ২২ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই সার আমদানিতে ব্যয় হয় ২৭ হাজার ৭৪ কোটি টাকা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









