হাম ও রোগটির উপসর্গে মৃত্যু এক হাজার পার হয়ে গেল গতকাল বুধবার। সংক্রমণেও ঊর্ধ্বগতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা ছাড়িয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘটেনি। এর পেছনে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলাকে এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। চলতি বছর টিকা দেওয়ার পরও এত সংক্রমণ ও মৃত্যুকে নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।
এদিকে, রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।
অন্যদিকে চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং এ সময়ে ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণের এই আশঙ্কাজনক ও ভয়াবহ হার কমাতে তিনমাসের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক বিশেষ কর্মসূচিসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বা বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্তে ভ্রাম্যমাণ আদালতও গঠন করেছে সরকার।
হামে মৃত্যু হাজার পার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুসারে, ১৫ মার্চ থেকে গত ১৭৯ দিনে হাম ও ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২ জনে, যা অন্তত তিন দশকের ইতিহাসে বিরল। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ১০০ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৯০২ জন। সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজারের ঘরে পৌঁছে গেছে। এদিকে প্রায় ছয় মাসে দেশে রোগটিতে শনাক্তসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ জনে। ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ জন, ২২ জুলাই ৮০০ জন ও ১৫ আগস্ট ৯০০ জন ছাড়ায়। আর আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায় ৬ আগস্ট, এর মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে এক লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে বা যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে হামের বিস্তারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্যও পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়। সে হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরো তিনজন শিশু। নতুন করে রোগটি শনাক্তসহ আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১৮৮ জন। ওই সময়ে হামের উপসর্গে মৃত তিনজন শিশুর দুজন ময়মনসিংহ বিভাগে ও অন্যজন ঢাকা বিভাগের হাসপাতালে মারা গেছে। জেলা হিসেবে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও ঢাকা জেলায় একজন করে শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে রোগটির উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো এক হাজার ১১৯ জন শিশু, যাদের এক হাজার ৩৪ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ঢাকা বিভাগে ৩৪৯ জন, রাজশাহীতে ৩২ জন, সিলেটে ১৮০ জন, চট্টগ্রামে ২২০ জন, বরিশালে ১৩৮ জন, ময়মনসিংহে ৪১ জন, খুলনায় ৫৭ জন এবং রংপুরে ১৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৯ জন শিশুর শরীরে, যাদের সবাই ঢাকা বিভাগের। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জনে আর ১৯ হাজার ৯০৪ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯৬৯ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জন, যাদের এক লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়।
পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৪৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে ও আক্রান্ত হয়েছে ৮৪ হাজার ২৩৩ জন শিশু। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৫ জন, বরিশাল বিভাগে ৭৬ জন, খুলনা বিভাগে ৩৭ জন ও রংপুর বিভাগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুতে আট মাসেই প্রাণহানি ১৩৩ জনের
সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে এক লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের।
আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের শুরু থেকে গত আট মাস ৯ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং এ সময়ে ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের একই সময় পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৪ হাজার ৯৮৩ জন। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। তবে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ১৩৭ জন।
এদিকে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি এক হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা দৈনিক হিসেবে চলতি বছরে আক্রান্ত ও প্রাণহানির রেকর্ড। সব মিলে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম নয় দিনেই ৩৬ জনের মৃত্যু ও ১১ হাজার ৯২ জন আক্রান্ত হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর ও ২৩ আগস্ট ডেঙ্গুতে ৫ জন করে মারা যান। আর, ১ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ এক হাজার ৩২৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। এছাড়া, গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের, আক্রান্ত হন দুই হাজার ৯০৭ জন আর নয় হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত ও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল জুলাইয়ে। অন্যদিকে, আগস্ট মাসের শেষদিন পর্যন্ত ২০ হাজার ৫৩৬ জন আক্রান্ত ও ৪৩ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ, মাসওয়ারি আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা ও প্রাণহানিও ঘটেছে গত মাসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের প্রাণহানিসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এক হাজার ৪৬৩ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে দুজন নারী ও অন্য পাঁচজন পুরুষ, যাদের একজন করে প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকা, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে। এ বছর মারা যাওয়া ১৩৩ জনের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ ও ৭৪ জন নারী। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায়। এরপর খুলনা বিভাগে ২৩ জন, ডিএনসিসি এলাকায় ২০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে আটজন, রাজশাহী বিভাগে চারজন, সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে চারজন, রংপুর বিভাগে দুজন এবং সিলেট বিভাগে একজন মারা গেছেন রোগটিতে।
অন্যদিকে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৪৬৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৮৫১ জন পুরুষ ও ৬১২ জন নারী। তাদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৬৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ২৪১ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৯২ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১৬৯ জন, খুলনা বিভাগে ২৫৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৮ জন, রংপুর বিভাগে ১৭৪ জন এবং সিলেট বিভাগে ১০ জন রয়েছেন। এছাড়া, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৪২৬ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৩ হাজার ৫৫৩ জন । ১৩৩ জনের মৃত্যুর পর এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক হাজার ৪২৬ জন। এছাড়া বিভাগ ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে খুলনা বিভাগে।
এ বিভাগে সাত হাজার ২৯৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরপর ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে ছয় হাজার ৯৬৬ জন, বরিশালে ছয় হাজার ৮১১ জন এবং চট্টগ্রামে ছয় হাজার ৭২২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় পাঁচ হাজার ৪২৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পাঁচ হাজার ৮২৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ময়মনসিংহে এ সংখ্যা দুই হাজার ৪৯৯ জন, রাজশাহীতে দুই হাজার ৫৫৭ জন, রংপুরে এক হাজার ১৬৮ জন এবং সিলেটে ২০৬ জন। এই হিসাব অনুসারে, সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে কম।
টিকাদানে ঘাটতিতেই হামের সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি
আট বছর ধরে মৃত্যু তো দূরে থাক, হামে সংক্রমণের সংখ্যা ৪০০–র বেশি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে গত বছরই হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। আর এ বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একেবারে উল্টো হয়ে গেল পরিস্থিতি। যে হাম ভুলে যাওয়া অসুখে পরিণত হয়েছিল, তা আজ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলাকে এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। চলতি বছরের শুরু থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি। গত মার্চ থেকে হাম ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান। কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়। আর একেই সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতির পেছনে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী তিন কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী এক কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশজুড়ে হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী পাঁচ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০২০–২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও কমতে থাকে। গত বছর এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
এ বছর প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়। কিন্তু গত জুনে একই বয়সী দুই কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত ৫ মে বলেছিলেন, গত বছর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে টিকা সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি।
তবে, বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। গত বছর মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০ জন, ২০৩ জন, ৩১১ জন, ২৮১ জন ও ২৪৭ জন। এ সময়ে মৃত্যুর ঘটনা ছিলই না।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে হামে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে বাংলাদেশে। এত হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড এর আগে নেই। এটি নজিরবিহীন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘হামে এত মৃত্যু আমার জানামতে এ দেশে আগে হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, এর শিকার হলো শিশুরা।’
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকাদানের পর এত সংক্রমণ সত্যিই নজিরবিহীন। এতে বিপুলসংখ্যক শিশু বিপদে পড়েছে। এখন ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সের শিশুদের টিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশ্বের ভয়াবহতম হাম প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তালিকাতেও বাংলাদেশের এই প্রাদুর্ভাবকে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
রয়টার্স বলছে, একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং কর্মসূচির দুর্বলতার কারণে এখন ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। মার্চে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ২ জনে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তালিকাতেও বাংলাদেশের এই প্রাদুর্ভাবকে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল এই বয়সী শিশু। আবার নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত হাম টিকার আওতায় আসার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। টিকাদানে তৈরি হওয়া এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। চলতি বছরের প্রাদুর্ভাবের পেছনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও অধিকাংশ সময়ে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সেই অগ্রগতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। প্রথম পর্যায়ে তাই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরে এক কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি আগে টিকা না পাওয়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচিও প্রয়োজন।
এদিকে হাম প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। ফলে একদিকে হাম আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক শিশু, অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। কোথাও নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনের ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীদের স্বজনেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, নিয়মিত কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে প্রাদুর্ভাবের প্রভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। দুই ডোজ হাম টিকা এই অত্যন্ত সংক্রামক রোগ থেকে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
রয়টার্সকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার পেছনে দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে।অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।সোমবার সংসদে তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা এবং পরের বছর দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিলের ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।
রোগতত্ত্ববিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এর আগে কখনো এত বেশি সংখ্যক শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায়নি। একই বছরে এত বেশি রোগীও কখনো দেখা যায়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই শিশু।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা রাখা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দদুলাল সাহা বলেন, রোগী এত বেশি আসছে যে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এক হাজার ৩৫০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা থাকা হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাম রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শিশুদের স্যালাইনেরও সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। বাড়ছে চিকিৎসার খরচও।
৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সী ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হাম আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১০ দিন পর ছাড়পত্র পেলেও এখনো তার জ্বর ফিরে আসছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকার কারণে সময়মতো তার ছেলেকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। তার আগের চার সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।
আরেক পরিবারও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছে। কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর আবারও ফুসকুড়ি ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। শেষ পর্যন্ত বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন। রিপন বলেন, তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন, কিন্তু সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না।
হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তবে দুটি ডোজ টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নাসিমার ভাষায়, ‘আমি শুধু চাই আমার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠুক। আর কোনো মাকে যেন নিজের সন্তানকে এই রোগে কষ্ট পেতে বা মারা যেতে না হয়।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও প্রাণহানি বাড়ছে জুন থেকে
বছরের শুরুতে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। জুনে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় নয় হাজার ২০৬ জনে। আর আগস্টে এক মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা কমে ৪০৯ জনে এবং মার্চে আরও কমে ৩৫৩ জনে দাঁড়ায়। এরপর এপ্রিল ও মে মাসে আবারও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে। এপ্রিল মাসে ৬৪০ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন দুই হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়ে নয় হাজার ২০৬ জনে পৌঁছায়। আগস্টে আরও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে দাঁড়ায়। আক্রান্তের পাশাপাশি জুন থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ডেঙ্গুতে দুজন করে মারা যান। মে মাসে মৃত্যু হয় একজনের। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই। জুনে ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। জুলাইয়ে মৃত্যু একলাফে বেড়ে ৩৬ জনে এবং আগস্টে তা সর্বোচ্চ ৪৩ জনে পৌঁছায়।
সিলেট, রাজশাহী ও রংপুর ছাড়া অন্য পাঁচ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। এসব এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উৎপত্তিস্থলও বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
সামনের দুই মাস নিয়ে শঙ্কা বেশি
ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আগামী দুই মাস নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি বাড়ছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যটি হলো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে এমনভাবে আলাদা রাখা, যাতে মশা তাকে কামড় দিয়ে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে। এর কোনোটিই সফলভাবে করা সম্ভব হয়নি।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিধনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে মশার উৎপাদন বা প্রজনন বন্ধের দিকে যেতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা মেরে ফেললে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে। কিন্তু প্রজননস্থল থেকে গেলে সেখান থেকে নতুন মশা জন্ম নেবে।
তার আশঙ্কা, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।
তিনি খণ্ড খণ্ডভাবে অভিযান না চালিয়ে তথ্যভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও রোগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমন্বিতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীও ঢাকা থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। টানা দুই থেকে তিন দিন এই কার্যক্রম চালিয়ে বছরে অন্তত দুবার করার কথা বলেন তিনি।
ডেঙ্গু রোধে প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকাতে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ চালাবে সরকার। এই জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার, এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই তিন মাসে ১১টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা প্রশাসন ও ৫০৩টি উপজেলা প্রশাসন পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক এ বিশেষ কর্মসূচিতে অংশ নেবে। কর্মসূচিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্লস গাইড, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেবেন।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশের সব জেলার সিভিল সার্জনদের নিয়ে বৈঠক করে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। ডেঙ্গু পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতির ইঙ্গিত দিয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার থেকেই দেশে রোগী বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ এবং আগামী অক্টোবরের প্রথম দিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ বা ‘পিক’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় তিন মাসের জনসচেতনতামূলক অভিযান আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। এতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা ও লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম চালাবে।
গতকাল বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আঁচল ফাউন্ডেশন ও হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের সেমিনারে ডা. মুহিত বলেন, দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। তাঁর আশঙ্কা, চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। আমরা আশঙ্কা করছি, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।’ তিনি জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের দুটি লক্ষ্য— আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার কমানো। এ লক্ষ্যে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ডা. মুহিত বলেন, ডেঙ্গুর পিক সময়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, স্যালাইন ও পরীক্ষার কিটের সংকট এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমান রোগীর হার অনুসারে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত শয্যাও চালু করা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে প্রয়োজনে অন্যান্য শয্যা পুনর্বিন্যাস করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও ডেঙ্গুর পিক সময়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে এ সময়ে অযৌক্তিকভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ানো যাবে না এবং হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রাখতে হবে।
অন্যদিকে, গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এই তিন মাসে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে রোগীর সংখ্যা এখনকার তুলনায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে তিন মাসের বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। ১২ সেপ্টেম্বর একই সময়ে ১১টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা প্রশাসন ও ৫০৩টি উপজেলা প্রশাসন কর্মসূচিতে অংশ নেবে। রেডক্রিসেন্ট, স্কাউট, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইডস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের স্বেচ্ছাসেবক ও বিডি ক্লিনসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও এতে যুক্ত থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাড়ির আঙিনা, ছাদ ও আশপাশে যেখানে পানি জমতে পারে, সেসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এইডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে সবাইকে যুক্ত হতে হবে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, এমন এলাকার উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শাহে আলম বলেন, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পাঁচটি করে শয্যা আলাদা করে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন সরকারের কাছে পর্যাপ্ত রয়েছে বলেও দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের মশারির মধ্যে রাখার ব্যবস্থাও করা হবে। আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা যেন অন্য কাউকে কামড়ে নতুন করে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে, সে জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডেঙ্গু রোধে আরো সরকারের নানা উদ্যোগ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে গত মার্চ মাস থেকে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করার নির্দেশ এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মাঠে ‘ফিল্ড হসপিটাল’ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও ডেঙ্গুরোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে সারা দেশে প্রায় তিন হাজার জন চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ শয্যায় বিনামূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু রোগ সংক্রান্ত পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতেও নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
গত ২৩ জুন ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। টাস্কফোর্সের প্রধান কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে, জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা এবং মাঠ পর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জাতীয় কমিটিকে অবহিত করা। বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা নিরসনে কার্যকর ভূমিকাও রাখছে এই কমিটি। অন্যদিকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে সেল গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সহায়তায় ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার সমন্বিত গাইডলাইন হালনাগাদ করা হয়েছে।
ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সকল সিভিল সার্জনকে হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার রাখতে এবং জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম বাড়াতে জুম মিটিং করে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার দিতে এবং সক্ষমতা অনুসারে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা বাড়াতেও সিভিল সার্জনদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও সংক্রমণ বিস্তার রোধে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এবং পাশের ওয়ার্ডের রোগীদের জন্যও মশারির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্যালাইন, ওষুধ এবং ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের কোনো ঘাটতি দেখা দিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা সারা দেশের সিভিল সার্জনদের সাথে জুম মিটিং করেছি। ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তি এবং হাসপাতালগুলোতে যেখানে সম্ভব ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন শয্যা সংকটের মুখে পড়তে না হয়।’ তিনি বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। তবে ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালের নিজস্ব বাজেট থেকে সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।’
ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. জাকারিয়া মাহমুদ বলেন, হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন ও ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট বিতরণ করা হয়েছে। এসব উপকরণের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, ‘বৈঠকে আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত ডেঙ্গুর সম্ভাব্য মহামারি ঠেকাতে এখন থেকেই সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থল ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে এবং স্কুল হেলথ কর্মসূচির আওতায় স্কুলগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের সমন্বয় করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









