টিকা দেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ না কমছেই না। মাত্র ছয়মাসেই ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এ রোগটি ও উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯ জনে আর আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৮ জনে। অন্যদিকে, ডেঙ্গুর প্রকোপও ঠেকেছে রেকর্ড হারে। চলতি বছরে মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৪৩০ জনে এবং এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৩৯ জন।
অন্তত তিন দশকের ইতিহাসে হামে আক্রান্ত ও প্রাণহানির বিরল এই পরিস্থিতিতে দেশে ফের বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর এ ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে। তবে, হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানো শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স ছয় মাসের কম। আর কম মারা গেলেও পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুরাও আছে এ তালিকায়। প্রচলিত টিকাদান কর্মসূচিতে এ দুটি বয়স শ্রেণির শিশুরা টিকা পায় না। গতবারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায়ও আসেনি তারা। ফলে শুরু হতে যাওয়া নতুন বিশেষ কর্মসূচিতে তাদের সুরক্ষা কীভাবে হবে, এ প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল এই বয়সী শিশু। আবার নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত হাম টিকার আওতায় আসার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। টিকাদানে তৈরি হওয়া এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, ডেঙ্গুর ভয়াবহ সংক্রমণ ঠেকাতে আগামীকাল শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ চালাবে সরকার। এই জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
হাম-ডেঙ্গু বাড়ছে সমান তালে
সর্বশেষ একদিনে মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি এক হাজার ৪৯২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৪৩০ জনে এবং এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৩৯ জন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই ৪২ জনের মৃত্যু ও ১২ হাজার ৫৮৪ জন আক্রান্ত হওয়ায় আতঙ্কও বাড়ছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি এক হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা দৈনিক হিসেবে চলতি বছরে আক্রান্ত ও প্রাণহানির রেকর্ড। এর আগে গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের, আক্রান্ত হন দুই হাজার ৯০৭ জন আর নয় হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত ও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল জুলাইয়ে। অন্যদিকে, আগস্ট মাসের শেষদিন পর্যন্ত ২০ হাজার ৫৩৬ জন আক্রান্ত ও ৪৩ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ, মাসওয়ারি আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা ও প্রাণহানিও ঘটেছে বিদায়ী মাসে।
অন্যদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরো সাতজন শিশু। নতুন করে রোগটি শনাক্তসহ আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১৯৪ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১৮০ দিনে হাম ও ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯ জনে, যা অন্তত তিন দশকের ইতিহাসে বিরল। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ১০০ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৯০৯ জন। আর প্রায় ছয় মাসে দেশে রোগটিতে শনাক্তসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৮ জনে। ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ জন, ২২ জুলাই ৮০০ জন ও ১৫ আগস্ট ৯০০ জন ছাড়ায়। সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজার ছাড়ায় গত মঙ্গলবার। এদিকে আর আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায় ৬ আগস্ট, এর মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে এক লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে বা যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে হামের বিস্তারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত বুধবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে খুলনা বিভাগে দুজন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও রাজশাহীতে একজন করে মারা গেছেন। অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৪৯২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫৫৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২ জন, খুলনা বিভাগে ২৮৪ জন, রংপুর বিভাগে ৫৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ১২২ জন, বরিশাল বিভাগের ১৭৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৩ জন রয়েছেন।
ডেঙ্গুতে এ বছর মারা যাওয়া ১৩৯ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায়। এরপর খুলনা বিভাগে ২৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ২০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে নয়জন, রাজশাহী বিভাগে পাঁচজন, সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে পাঁচজন, রংপুর বিভাগে দুজন এবং সিলেট বিভাগে একজন মারা গেছেন রোগটিতে। এছাড়া বিভাগ ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে খুলনা বিভাগে। এ বিভাগে সাত হাজার ৫৮২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৩০৪ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৪ হাজার ৮৫৭ জন । ১৩৯ জনের মৃত্যুর পর এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন হাজার ৪৩৪ জন।
সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।
হাম ও উপসর্গের সংক্রমণও বাড়ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত বুধবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত সাতজন শিশুর তিনজনই ঢাকা বিভাগের এবং একজন করে সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের হাসপাতালে মারা গেছে। এ সময়ে রোগটির উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো এক হাজার ১৬৫ জন শিশু, যাদের এক হাজার ১১২ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৩৬৪ জন, চট্টগ্রামে ২৬২ জন, সিলেটে ১৫৩ জন, বরিশালে ১১৬ জন, ময়মনসিংহে ৮২ জন, খুলনায় ৯০ জন, রাজশাহীতে ৩১ জন এবং রংপুরে ১৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৯ জন শিশুর শরীরে। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনে আর ১৯ হাজার ৯৩৩ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।
অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৬৯ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন, যাদের এক লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।
এ বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৪৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও আক্রান্ত হয়েছে ৮৪ হাজার ৬৮৩ জন শিশু। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৬ জন, বরিশাল বিভাগে ৭৬ জন, খুলনা বিভাগে ৩৮ জন ও রংপুর বিভাগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হামে দুই বয়স শ্রেণির মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ
৪ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামে মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত ২৫২ জনের মধ্যে ছয় মাসের কম বয়সি শিশু রয়েছে ৬৭ জন, অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আর পাঁচ বছরের বেশি শিশু রয়েছে তিনজন, যা মোট মৃত্যুর এক দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আগস্ট মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে মৃতদের ৯০ শতাংশ এ রোগের টিকা পায়নি। মৃতদের সাত দশমিক ৯ শতাংশ হামের এক ডোজ টিকা পেয়েছে আর দুই দশমিক ১৯ শতাংশ হামের দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও মারা গেছে। হামে মারা যাওয়াদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণও দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেখা যায়, মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম; আর ছয় থেকে নয় মাসের কম বয়সের ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ হামে মৃতদের ৫১ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম।
এ কারণেই টিকার ‘কাভারেজ’, অব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, অপর্যাপ্ত টিকার ‘কাভারেজ’, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবায় অব্যবস্থাপনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরও আগস্ট মাস থেকে হাম সংক্রমণের উর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে, ছয় মাসের কম এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সিদের বিষয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে হামের সংক্রমণ থামানো কঠিন হবে। প্রচলিত কর্মসূচি অনুসারে নয় মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার এক ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে আরেক ডোজ দেওয়া হয়। এবার হামের প্রকোপ তীব্র হওয়ায় ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়। তারপরও এখন আর ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ-নাইট্যাগ গাইড লাইন অনুসারে পরীক্ষার দরকার নেই। কারণ, ৬৪ জেলা এবং প্রায় সব উপজেলায় হাম। সে কারণে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সবাইকে হাম আক্রান্ত হিসেবে ধরে নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাম সংক্রমণের প্রথম ৩০ দিনে দুই হাজার ৫০০ জনের মতো রোগী সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। পরের তিন মাস চার হাজারে সীমাবদ্ধ ছিল এ সংখ্যা। ৩১ জুলাইয়ের হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল চার হাজার ১২৮ জন। বুধবার এ সংখ্যা পাওয়া গেছে পাঁচ হাজার ৫৭৪ জন, যা প্রথম ৩০ দিনের তুলনায় দ্বিগুণ।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে সরকার প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু করে ৫ এপ্রিল। এরপর চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু হয় ১২ এপ্রিল। আর ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হয় দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি। ১৪ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ ‘কাভারেজ’ বা শতভাগ শিশুকে টিকাদান সম্পন্ন হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়।
তবে, হামের প্রকোপ ঠেকাতে টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার ঠিক করেছিল তার সঙ্গে ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাপসুল কর্মসূচির আওতায় আনা শিশুর সংখ্যার ফারাক থাকায় টিকা ‘কাভারেজ’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হামের মতো একই বয়সি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। অর্থাৎ দুই কর্মসূচিরই আওতায় আনা শিশুর বয়স ৬ থেকে ৫৯ মাস ছিল।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে, ২৮ জুন দুই কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৫০৯ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, হামের টিকা পেয়েছে এক কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ জন শিশু। ক্যাপসুল খাওয়া ও টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৩ জনের পার্থক্য দেখা গেছে। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরকার বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার কথা বলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুসারে, দেশের এক কোটি ৮০ লাখ লক্ষমাত্রার বিপরীতে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। যা লক্ষমাত্রার হিসাবে ১০৯ শতাংশ।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআইর সাবেক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘টিকার কাভারেজ সঠিক না হওয়ার কারণে মৃত্যু থামছে না। কারণ, একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার আগে হাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’
বিশেষজ্ঞদের এ মত অনুসারে হিসাব করে দেখা যায়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও হামের টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যার পার্থক্য এখনো প্রায় ২৬ লাখ। অর্থাৎ ৮৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিশুই হামের টিকা পায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নতুন করে ৪০ লাখ ডোজ টিকার অর্ডার করা হয়েছে। এ টিকা এলে আমরা আরেকটা ক্যাম্পেইন করব বাদ পড়াদের নিয়ে। তখন আশা করি, হাম কমে যাবে।’
তবে, ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছিলেন, ‘হাম নিয়ে অবাস্তব আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ নেই। টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ানো হলেও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস লাগবে। তবে এ সময়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।’
অথচ, তথ্য বলছে, ছয় মাসের কম এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তাদের টিকার আওতায় আনা বা অন্য কীভাবে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। এ দুই বয়স শ্রেণির এ শিশুদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ববিদ ও জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটি-এনভিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ হাম রোগী আছে তার ১০ ভাগের এক ভাগের বয়স ছয় মাসের কম। আর আরেকটা শ্রেণি রয়েছে যাদের বয়স পাঁচ বছরের বেশি। এই দুই বয়স শ্রেণিকে টিকাদানের সিদ্ধান্ত নেই। তাদের নিরাপদ করতে না পারলে হামের সংক্রমণ থামানো সম্ভব হবে না।
ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বহু আগে থেকে বয়স ভিত্তিক সংক্রমণের হার বিশ্লেষণ করে টিকা এবং যাদের টিকা দেওয়া সম্ভব নয় তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বলে আসছি। কিন্তু কথা শুনলেও কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন না।’ তিনি বলেন, ‘ছয় মাসের কম বয়সিদের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, সেজন্য নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন।’
জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেছি। গবেষণার জন্য আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআর’বি কাজ করছে।’
টিকাদানের শুরুতে এপ্রিল মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর থেকে দাবি করা হয়, টিকাদানের পর জুন মাস থেকে হাম সংক্রমণ কমতে থাকবে। তবে বাস্তবে সংক্রমণ পরিস্থিতি সেটির বিপরীত। হামের টিকার ক্ষেত্রে শতভাগ ‘কাভারেজ’ দাবি করলেও শিশুদের কাঙ্ক্ষিত বড় অংশের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (হার্ড ইমিউনিটি) তৈরি না হওয়ায় হামের সংক্রমণ কমেনি।
টিকা কার্যক্রম পুরোপুরি সফল হয়নি, সরকার এটি না মানলেও আবার টিকা দেওয়ার কথা বলছে। তাহলে হামের সংক্রমণ থামবে কীভাবে?- প্রশ্ন তুলে রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, সবার আগে টিকার ‘কাভারেজ’ পূরণ করতে হবে। তারপর দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে, যেন সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। আর নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ঠিক করতে হবে। সর্বশেষ বয়সভিত্তিক গ্রুপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু টিকাদানের বাইরে থেকে গেছে। ফলে তাদের শরীরে হার্ড ইউমিনিটি তৈরি হয়নি৷ অন্যদিকে ছয় মাসের কম বয়সি শিশুও হামে আক্রান্ত হচ্ছে৷ তারা কেন আক্রান্ত হচ্ছে? কারণ তাদের মা হামের টিকা পায়নি৷ ফলে শিশুর শরীরেও হামের ইউমিনিটি তৈরি হয়নি। এই চিকিৎসকের পরামর্শ, বর্তমানে যারা বিয়ের উপযুক্ত তাদের ‘স্ক্রিনিং’ এবং টিকাদানের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এবার হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপুষ্টি। সেক্ষেত্রে শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্বের বিষয়টি সবাইকে জানাতে হবে। আর পথশিশু, যৌন পেশায় জড়িতদের সন্তানসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, ‘যদি ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় না আনতে পারেন, তাহলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়।’ মৃত্যু ঠেকানোর বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও ভালো হলে কিছুটা মৃত্যু ঠেকানো যেত, কিন্তু এ দিকটাও ভালো নেই। এখনো দেশের সব মানুষকে সচেতন করা যায়নি।’
সচেতনতার বিষয়ে তিনি বলছেন, শুধু জ্বর হলেই যেন শিশুদের আলাদা রাখা হয়। আর জ্বর না সারলে স্থানীয় কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতে ভর্তি করা হয়। সেখানে যদি হাম শনাক্ত হয়, তাহলে শরীর ভালো না হওয়া পর্যন্ত ভর্তি থাকবে। ডা. মুশতাক বলেন, ‘দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নত করতে হবে। অর্থাৎ আইসিইউ আর বাসার মাঝখানে একটা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকতে হবে। এতে রোগীদের যেমন জীবন রক্ষা হবে, তেমনি শহরের হাসপাতালে ভিড় কমে আসবে। দেশের গরীব মানুষদের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে যেন তারা ঘরেই সেবা পেতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘চলতি মাসেই টিকা আসার পর ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আরেকটি ক্যাম্পেইন হবে। তার আগে আমরা যেসব এলাকায় উচ্চ সংক্রমণ বিবেচনায় টিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে সংক্রমণের চিত্র এবং অ্যান্টিবডি যাচাই করা হবে। এটির জন্য জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, আইইডিসিআরসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এবার টিকাদান শেষে হামের সংক্রমণ কমে আসবে।’
৪০ লাখ শিশু বাদ হামের টিকা থেকে
চলতি বছরের শুরু থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি। মার্চ থেকে হাম ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে; কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান; কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়।
চলতি বছরের প্রাদুর্ভাবের পেছনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও অধিকাংশ সময়ে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সেই অগ্রগতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি আগে টিকা না পাওয়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচিও প্রয়োজন। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা হাম পরিস্থিতির অবনতির জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। আর বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর না হয়ে, পরিকল্পনাহীন কাজ করলে কী হয়, তার উদাহরণ দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। এটিও অবহেলা। এ দুইয়ে মিলে দুঃসহ অবস্থা দেখতে হলো আমাদের।’
এদিকে হাম প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। ফলে একদিকে হাম আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক শিশু, অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। কোথাও নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনের ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীদের স্বজনেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, নিয়মিত কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে প্রাদুর্ভাবের প্রভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। দুই ডোজ হাম টিকা এই অত্যন্ত সংক্রামক রোগ থেকে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
রয়টার্সকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার পেছনে দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে।অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।সোমবার সংসদে তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা এবং পরের বছর দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিলের ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।
রোগতত্ত্ববিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এর আগে কখনো এত বেশি সংখ্যক শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায়নি। একই বছরে এত বেশি রোগীও কখনো দেখা যায়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই শিশু।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা রাখা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দদুলাল সাহা বলেন, রোগী এত বেশি আসছে যে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এক হাজার ৩৫০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা থাকা হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে, রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাম রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শিশুদের স্যালাইনেরও সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। বাড়ছে চিকিৎসার খরচও।
৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সী ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হাম আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১০ দিন পর ছাড়পত্র পেলেও এখনো তার জ্বর ফিরে আসছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকার কারণে সময়মতো তার ছেলেকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। তার আগের চার সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।
আরেক পরিবারও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছে। কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর আবারও ফুসকুড়ি ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। শেষ পর্যন্ত বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন। রিপন বলেন, তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন, কিন্তু সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না।
হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তবে দুটি ডোজ টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নাসিমার ভাষায়, ‘আমি শুধু চাই আমার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠুক। আর কোনো মাকে যেন নিজের সন্তানকে এই রোগে কষ্ট পেতে বা মারা যেতে না হয়।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও প্রাণহানি বাড়ছে জুন থেকে
বছরের শুরুতে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। জুনে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় নয় হাজার ২০৬ জনে। আর আগস্টে এক মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা কমে ৪০৯ জনে এবং মার্চে আরও কমে ৩৫৩ জনে দাঁড়ায়। এরপর এপ্রিল ও মে মাসে আবারও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে। এপ্রিল মাসে ৬৪০ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন দুই হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়ে নয় হাজার ২০৬ জনে পৌঁছায়। আগস্টে আরও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে দাঁড়ায়। আক্রান্তের পাশাপাশি জুন থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ডেঙ্গুতে দুজন করে মারা যান। মে মাসে মৃত্যু হয় একজনের। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই। জুনে ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। জুলাইয়ে মৃত্যু একলাফে বেড়ে ৩৬ জনে এবং আগস্টে তা সর্বোচ্চ ৪৩ জনে পৌঁছায়।
সিলেট, রাজশাহী ও রংপুর ছাড়া অন্য পাঁচ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। এসব এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উৎপত্তিস্থলও বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
সামনের দুই মাস নিয়ে শঙ্কা বেশি
ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আগামী দুই মাস নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি বাড়ছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যটি হলো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে এমনভাবে আলাদা রাখা, যাতে মশা তাকে কামড় দিয়ে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে। এর কোনোটিই সফলভাবে করা সম্ভব হয়নি।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিধনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে মশার উৎপাদন বা প্রজনন বন্ধের দিকে যেতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা মেরে ফেললে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে। কিন্তু প্রজননস্থল থেকে গেলে সেখান থেকে নতুন মশা জন্ম নেবে।
তার আশঙ্কা, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।
তিনি খণ্ড খণ্ডভাবে অভিযান না চালিয়ে তথ্যভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও রোগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমন্বিতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীও ঢাকা থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। টানা দুই থেকে তিন দিন এই কার্যক্রম চালিয়ে বছরে অন্তত দুবার করার কথা বলেন তিনি।
নেত্রকোনায় ডেঙ্গু বাড়ছে, সীমান্ত এলাকায় রোগী বেশি
নেত্রকোনায় দিন দিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জেলার সবকটি হাসপাতালে বিশেষায়িত শয্যা প্রস্তুত করার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বুধবার রাতের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২০৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন; তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১৯৯ জন বাড়ি ফিরেন। এ হিসাব অনুযায়ী, জেলায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৬ জন অর্থাৎ প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছেন।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে জানানো হয়, নেত্রকোণা সদর হাসাপাতালে সবচেয়ে বেশি ৭২২ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলেও রোগী শনাক্তের হার বেশি দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায়। এ দুই উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৬ জন করে রোগী শনাক্ত হয়। দুটি উপজেলাই মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৮৫টি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে এনএস-১ পজিটিভ ১৩৩ জন এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন পজিটিভ ৫৫ জনসহ মোট ১৯০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। নেত্রকোণার সিভিল সার্জন গোলাম মওলা বলেন, জেলায় ডেঙ্গুর জন্য ৮৬৯টি এনএস-১ এবং ৯৪৯টি ইমিউনোগ্লোবুলিন কিট মজুত রয়েছে। এ ছাড়া সদর হাসপাতালের ১৫টিসহ জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ৫৮টি বিশেষায়িত শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল উপায়। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে মন্তব্য করে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। আর জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। নেত্রকোণা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী কেন্দুয়া উপজেলায় প্রশাসন ও দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছেন। সংসদ সদস্য হিলালী বলেন, চিকিৎসা স্বাস্থ্য বিভাগ দেবে, তবে মশাই যেন সৃষ্টি হতে না পারে- সেই চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মানুষের জীবন রক্ষায় সব স্তরের মানুষকে এ অভিযানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে নেত্রকোণা-২ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হকও জেলা শহরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছেন।
হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট টিকাও আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে। আর এসব টিকা দিয়েই আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ টিকা দান ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হামের টিকা ক্যাম্পেইন শেষ করার পরও যখন সংক্রমণ অব্যাহত থাকার বিষয়টি দেখা যায়, তখন সরকার অবশিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে।’ সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিগত সরকার দেশে কোনো টিকা রেখে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার মাত্র ২১ দিনের মধ্যে এক কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
ডেঙ্গু রোধে প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান
আগামী তিন মাসে ১১টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা প্রশাসন ও ৫০৩টি উপজেলা প্রশাসন ডেঙ্গু রোধে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক বিশেষ কর্মসূচিতে অংশ নেবে। কর্মসূচিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্লস গাইড, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেবেন।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশের সব জেলার সিভিল সার্জনদের নিয়ে বৈঠক করে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। ডেঙ্গু পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতির ইঙ্গিত দিয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার থেকেই দেশে রোগী বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ এবং আগামী অক্টোবরের প্রথম দিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ বা ‘পিক’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আর ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ কমাতে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় তিন মাসের জনসচেতনতামূলক অভিযানে এতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা ও লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম চালাবে।
ডা. মুহিত বলেন, দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। তাঁর আশঙ্কা, চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। আমরা আশঙ্কা করছি, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।’
তিনি জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের দুটি লক্ষ্য— আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার কমানো। এ লক্ষ্যে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ডা. মুহিত বলেন, ডেঙ্গুর পিক সময়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, স্যালাইন ও পরীক্ষার কিটের সংকট এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমান রোগীর হার অনুসারে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত শয্যাও চালু করা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে প্রয়োজনে অন্যান্য শয্যা পুনর্বিন্যাস করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও ডেঙ্গুর পিক সময়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে এ সময়ে অযৌক্তিকভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ানো যাবে না এবং হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রাখতে হবে।
গত ২৩ জুন ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। টাস্কফোর্সের প্রধান কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে, জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা এবং মাঠ পর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জাতীয় কমিটিকে অবহিত করা। বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা নিরসনে কার্যকর ভূমিকাও রাখছে এই কমিটি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এই তিন মাসে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে রোগীর সংখ্যা এখনকার তুলনায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, ১২ সেপ্টেম্বর একই সময়ে ১১টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা প্রশাসন ও ৫০৩টি উপজেলা প্রশাসন কর্মসূচিতে অংশ নেবে। রেডক্রিসেন্ট, স্কাউট, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইডস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের স্বেচ্ছাসেবক ও বিডি ক্লিনসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও এতে যুক্ত থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাড়ির আঙিনা, ছাদ ও আশপাশে যেখানে পানি জমতে পারে, সেসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে সবাইকে যুক্ত হতে হবে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, এমন এলাকার উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শাহে আলম বলেন, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পাঁচটি করে শয্যা আলাদা করে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন সরকারের কাছে পর্যাপ্ত রয়েছে বলেও দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের মশারির মধ্যে রাখার ব্যবস্থাও করা হবে। আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা যেন অন্য কাউকে কামড়ে নতুন করে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে, সে জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডেঙ্গু রোধে সরকারের আরো নানা উদ্যোগ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে গত মার্চ মাস থেকে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করার নির্দেশ এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মাঠে ‘ফিল্ড হসপিটাল’ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও ডেঙ্গুরোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে সারা দেশে প্রায় তিন হাজার জন চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ শয্যায় বিনামূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু রোগ সংক্রান্ত পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতেও নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে সেল গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সহায়তায় ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার সমন্বিত গাইডলাইন হালনাগাদ করা হয়েছে।
ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সকল সিভিল সার্জনকে হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার রাখতে এবং জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম বাড়াতে জুম মিটিং করে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার দিতে এবং সক্ষমতা অনুসারে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা বাড়াতেও সিভিল সার্জনদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও সংক্রমণ বিস্তার রোধে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এবং পাশের ওয়ার্ডের রোগীদের জন্যও মশারির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি স্যালাইন, ওষুধ এবং ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের কোনো ঘাটতি দেখা দিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা সারা দেশের সিভিল সার্জনদের সাথে জুম মিটিং করেছি। ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তি এবং হাসপাতালগুলোতে যেখানে সম্ভব ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন শয্যা সংকটের মুখে পড়তে না হয়।’ তিনি বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। তবে ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালের নিজস্ব বাজেট থেকে সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।’
ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. জাকারিয়া মাহমুদ বলেন, হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন ও ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট বিতরণ করা হয়েছে। এসব উপকরণের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, ‘বৈঠকে আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত ডেঙ্গুর সম্ভাব্য মহামারি ঠেকাতে এখন থেকেই সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থল ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে এবং স্কুল হেলথ কর্মসূচির আওতায় স্কুলগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের সমন্বয় করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









