স্বল্প সময়, কম শ্রম ও নামমাত্র খরচে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় দারুণ খুশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের পাটচাষিরা। গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে চলতি মৌসুমে উপজেলাজুড়ে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। গত প্রায় দেড় মাস ধরে পাটের পরিচর্যা, কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানো নিয়ে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এছাড়া পাট চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বহু বেকার যুবকের ব্যবসায় সফলতার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস ও স্থানীয় চাষিদের সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার পাটের আঁশ ও পাটকাঠি উভয়েরই রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। বিঘা প্রতি সর্বনিম্ন ৮ মণ থেকে সর্বোচ্চ ১০ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ পাট মানভেদে ৩,৩ উদ্বাস্তু থেকে ৪,০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত পাটকাঠির ভালো চাহিদাও রয়েছে। মনাকষা ইউনিয়নের কৃষক জালাল উদ্দিন জানান, তিনি ১৫ বিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ করেছেন প্রায় সোয়া দুই লাখ টাকা। বিপরীতে উৎপাদিত পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে তার নিট লাভ থাকবে পৌনে তিন লাখ টাকার মতো। একইভাবে জঘলুল হক, হারুণ অর রশিদ ও মাসুদ রানাসহ শত শত কৃষক এবার পাট বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।
পাট চাষকে ঘিরে শিবগঞ্জে তৈরি হয়েছে নতুন এক অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য। অনেক বেকার যুবক জমি থেকে সরাসরি কাঁচা পাটগাছ কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রি করছেন। পারচৌকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাদেক জানান, মাত্র ১৬,৫০০ টাকায় ২৫ কাঠা জমির পাট কিনে ১০ হাজার টাকা প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ শেষে তিনি ৩৫,০০০ টাকায় পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করেছেন। এতে বড় ধরনের কোনো পুঁজি ছাড়াই তার ভালো লাভ হয়েছে। অন্যদিকে পাটগাছ থেকে আঁশ ছাড়ানোর বিনিময়ে মজুরি হিসেবে পাটকাঠি পেয়ে শিবগঞ্জের শত শত অসচ্ছল নারী আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করছেন। এলাকার অসচ্ছল নারী শিল্পী জানান, প্রতিদিন ৩০-৩৫ আঁটি পাটের আঁশ ছাড়িয়ে তিনি প্রায় ৪০-৪৫ কেজি পাটকাঠি পান। এগুলো বিক্রি করে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করে তিনি এখন সংসার চালাতে পারছেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নয়ন মিয়া জানান, অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকরা দিন দিন পাট চাষে ঝুঁকছেন। চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট আবাদি জমি হয়েছে ২,৩৭৫ হেক্টর, যা গত বছর ছিল ১,৯১০ হেক্টর। বর্তমানে মোট পাটচাষির সংখ্যা ১১,৮৭৫ জন এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪,১০৩.৭৫ মেট্রিক টন। এছাড়া সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে ৩৫০ জন চাষিকে বিনামূল্যে পাটবীজ, ডিএপি ও এমওপি সার প্রদান করা হয়েছে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করে পাটের তৈরি ব্যাগ ও ছালার বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি শিবগঞ্জে একটি স্থায়ী সরকারি পাট ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের জোরালো দাবি জানান তারা। এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, কৃষকরা লিখিত আবেদন করলে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করা হবে। এছাড়া পলিথিনের ব্যবহার রোধে আইন প্রয়োগ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান সামনে আরও জোরদার করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









