রানওয়ে বড় করার পরিকল্পনা আছে, বসছে আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, বাড়ছে যাত্রীসেবার সুযোগ-সুবিধা। কাগজে-কলমে বরিশাল বিমানবন্দরকে ঘিরে উন্নয়নের পরিকল্পনা কম নয়। অথচ বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বিমানবন্দরটি আধুনিকায়নের পথে এগোলেও আকাশপথে নিয়মিত যাত্রীই মিলছে না।
বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন ফ্লাইট পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও রোববার এই তিন দিনের বাইরে আকাশপথে রাজধানীর সঙ্গে বরিশালের নিয়মিত যোগাযোগ নেই। ফলে হঠাৎ চিকিৎসা, ব্যবসা, চাকরি কিংবা জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যেতে হলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে অনেক সময় বেছে নিতে হচ্ছে সড়ক অথবা নৌপথ।
অথচ সড়কপথে পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানীর সঙ্গে বরিশালের যোগাযোগ আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সময়ের হিসাবে আকাশপথের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানোর প্রয়োজন রয়েছে, এমন মানুষের কাছে বিমান এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সংকটটা তাই বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তায় নয়, বরং নিয়মিত ও সাশ্রয়ী ফ্লাইট পাওয়ার সুযোগে।
বরিশাল বিমানবন্দরে বর্তমানে যে চিত্রটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো যাত্রীস্বল্পতা। ৭৪ আসনের ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজে প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে যাত্রী হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২২ জন।
এতে একদিকে আসন খালি থাকছে, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এয়ারলাইন্সকে। যাত্রী কম থাকায় ফ্লাইট বাড়ানোর বাণিজ্যিক আগ্রহও তৈরি হচ্ছে না। আর যাত্রী কম থাকলে ভাড়া কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল রুটে বাংলাদেশ বিমানের ভাড়া প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। ফলে একদিকে ফ্লাইটের সংখ্যা কম, অন্যদিকে ভাড়া তুলনামূলক বেশি—দুইয়ের সমন্বয়ে অনেক যাত্রী শেষ পর্যন্ত সড়কপথকেই বেছে নিচ্ছেন।
একসময় বরিশাল-ঢাকা আকাশপথ ছিল বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ারও নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। ফলে যাত্রীদের হাতে ছিল একাধিক বিকল্প।
পদ্মা সেতু চালুর পর বদলে যায় সেই হিসাব। সড়ক যোগাযোগ দ্রুত ও সহজ হওয়ায় আকাশপথে যাত্রীর সংখ্যা কমতে থাকে। একপর্যায়ে যাত্রী সংকটের কারণে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো এ রুট থেকে সরে যায় কিংবা ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
তবে স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মতে, পদ্মা সেতু আকাশপথের প্রয়োজনীয়তা শেষ করে দেয়নি। বরং দুই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিজস্ব প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘ সড়কযাত্রা এড়িয়ে অল্প সময়ে ঢাকায় পৌঁছাতে চান চিকিৎসাপ্রার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও জরুরি কাজে যাতায়াতকারীরা।
তাদের বক্তব্য, নিয়মিত ফ্লাইট ও যাত্রীবান্ধব ভাড়া নিশ্চিত করা গেলে আকাশপথে যাত্রী ফেরানো সম্ভব।
বরিশাল বিমানবন্দরটি বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর এলাকায়। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-৯১ সালে বিমানবন্দরটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য এটি চালু করা হয়।
বর্তমানে বিমানবন্দরের রানওয়ে ৬ হাজার ফুট দীর্ঘ এবং ১০০ ফুট প্রশস্ত। ভবিষ্যতে রানওয়ে ৮ হাজার ৫০০ ফুটে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল), আইএলএস, ডিভিওআর, ডিএমই ও পিএপিআই লাইট স্থাপন, কনভেয়ার বেল্ট ও এপ্রোন সম্প্রসারণসহ একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক সঞ্জয় কুমার রায় বলেন, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু ঘাটতির কথাও সামনে এসেছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের সুপারভাইজার মনমথো সরকার জানান, সীমানাপ্রাচীরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি স্থানে বাইরে থেকে সহজেই ভেতরে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমন সুযোগ থাকা নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করেন তিনি। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
এদিকে উড়োজাহাজ অবতরণের সময় রানওয়ের অবস্থান ও গ্লাইডপাথ নির্দেশনায় ব্যবহৃত পিএপিআই লাইটের কিছু অংশ নষ্ট রয়েছে। তবে সিএএবির উন্নয়ন পরিকল্পনায় নতুন পিএপিআই লাইট স্থাপনের বিষয়টি রাখা হয়েছে।
বরিশাল-ঢাকা রুটে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ফ্লাইট পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ কর্মদিবসগুলোতে ফ্লাইট না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে সড়কপথ ব্যবহার করেন।
ব্যবসায়ী মো. আতিকুর রহমান বলেন, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিয়মিত ঢাকায় যেতে হয়। কিন্তু ফ্লাইটের সংখ্যা কম থাকায় অনেক সময় আকাশপথে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ফ্লাইট বাড়ানোর পাশাপাশি সময়সূচি ও ভাড়া যাত্রীবান্ধব করার দাবি জানান তিনি।
জরুরি চিকিৎসা সেবা ও বিনিয়োগ ধরে রাখতে আকাশপথ সচল রাখার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব। বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব ওয়াহিদুল ইসলাম প্রিন্স জানান, জটিল রোগীদের জন্য বিমানই একমাত্র দ্রুগামী ভরসা। ফ্লাইট না থাকায় সাধারণ মানুষ সড়কপথের দীর্ঘ ধকল নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন জানান, এই সংকট কাটাতে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে অবিলম্বে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো যায়। একই সঙ্গে বরিশাল বিমানবন্দরকে ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের রূপরেখা নিয়ে কাজ করার কথা জানান তিনি।
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ কেবল সড়কের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। সঠিক ভাড়া নির্ধারণ, সমন্বিত সময়সূচি এবং বেসরকারি বিমান সংস্থাসমূহকে পুনরায় এই রুটে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে বরিশাল বিমানবন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করাই এখন সময়ের মূল দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









