ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতের গণমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’ বলেছে, তারেক রহমান ভারত সফরে আগ্রহী, তবে আগে ঠিক করতে চান এজেন্ডা। হিন্দু লিখেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যত দ্রুত সম্ভব ভারত সফরে যেতে আগ্রহী, তবে তার আগে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বা আলোচ্যসূচি চূড়ান্ত করতে আগ্রহী। কারণ এ ধরনের একটি সফরের পর দেশে ফিরে ‘জনগণের সামনে তুলে ধরার মত দৃশ্যমান কী অর্জন থাকবে’, তা নিয়ে ভাবছেন তারেক রহমান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের ফাঁকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সে কথা জানানো হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনুকূল পরিবেশ হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর হবে কিনা—সেটা নিয়ে কিছুদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। আগামীকাল শনিবার ও রবিবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আসর বসছে। এ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে যোগ দিতে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানায় ভারত। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়।
এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সরাসরি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ে। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চললেও দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির কয়েক দিন আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এদিকে, বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বুধবার এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, এ ধরনের একটি সফরের পর দেশে ফিরে ‘জনগণের সামনে তুলে ধরার মত দৃশ্যমান কী অর্জন থাকবে’, তা নিয়ে ভাবছেন তারেক রহমান।
ওই কর্মকর্তা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের তরফ থেকে বহুপক্ষীয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তা এড়িয়ে গেছেন। তবে তার মানে এই নয় যে, তিনি ভারতের মত গুরুত্বপূর্ণ ও নিকটতম প্রতিবেশীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও ত্যাগের কথা ঢাকা সবসময়ই স্বীকার করে। ওই সূত্রের ভাষ্য, আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যেতে পারেন তারেক রহমান, কারণ আগামী ডিসেম্বরেই গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যত দ্রুত সম্ভব এটি নবায়ন করা দরকার।
বাংলাদেশের ওই কর্মকর্তা হিন্দুকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিবিড় বৈঠকের মাধ্যমে এজেন্ডা চূড়ান্ত করা দরকার, যা এখনো শুরু হয়নি। ঢাকা মনে করে, ৩০ বছর ধরে টিকে থাকা গঙ্গা চুক্তি একটি ‘অর্জন’ এবং এটি নবায়নের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আটকে থাকা অন্য দিকগুলোতেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। ‘যেমন পুনরায় পুরোদমে ভিসা কার্যক্রম চালু করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরোপিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, স্থলবন্দরগুলো দিয়ে আবার পুরোদমে বাণিজ্য শুরু করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার মত ক্ষেত্রগুলোতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে,’ বলেন ওই কর্মকর্তা। এছাড়া জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশ এ খাতে ভারতের সহায়তাকেও ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখবে বলে জানান তিনি। ভারত যদি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা করে, তবে তা দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির ‘একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ’ হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মনে করেন।
হিন্দু লিখেছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের মত 'কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন' থেকে বাণিজ্যিক ও কনস্যুলার সেবার বিষয়গুলো বাংলাদেশ ‘আলাদা রাখতেই আগ্রহী’ বলে ওই সূত্রটি ইঙ্গিত দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির একটি বড় সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেন এই কর্মকর্তা। পরে ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি শাসনামলেও এই চুক্তি কার্যকর ছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বছর শেষ হওয়ার আগে এই চুক্তি নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
চুক্তি নবায়নে বিলম্ব হলে তা ‘হিতে বিপরীত’ হতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিহারের এমপি সঞ্জয় ঝার মতো নেতারা ইতোমধ্যে এই চুক্তির বিরোধিতা শুরু করেছেন। তাদের দাবি, এই চুক্তি বিহারের কোনো উপকারে আসছে না। নবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে চুক্তির সমালোচকরা আরও উৎসাহিত হবেন বলেও সতর্ক করেছেন বাংলাদেশের ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপে বসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ইতোমধ্যেই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের এজেন্ডা তৈরিতে আমলা পর্যায়ের আলোচনা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
ওই কর্মকর্তা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে দুই দেশের সম্পর্কের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার মতে, ‘কেবল তাহলেই প্রধানমন্ত্রী দিল্লি থেকে দেশে ফেরার সময় উল্লেখযোগ্য অর্জন সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারবেন।’
তিনি এও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপে বসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ওই সূত্রের ভাষ্য, ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ইতোমধ্যে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছেন; তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের এজেন্ডা তৈরিতে আমলা পর্যায়ের আলোচনা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য এজেন্ডা তৈরিতে আমরা খোলা মন নিয়ে এগোচ্ছি। কিছু বিষয়ে আমরা আমাদের অবস্থান থেকে ছাড় দিতে পারি। কিছু বিষয়ে আমরা সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চাই।’
ওই কূটনৈতিক সূত্র হিন্দুকে বলেছেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার করা অভিযোগ যৌক্তিক মনে করা ভারতের উচিত হবে না, কারণ তারেক রহমান একজন নির্বাচিত নেতা, এ বিষয়টি দিল্লির বিবেচনায় রাখা উচিত বলে বাংলাদেশ মনে করে। তবে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করার উদ্যোগ ভারত আটকে দিয়েছে বলে যে খবর এসেছে, তাতে বাংলাদেশ সন্তুষ্ট বলে ওই কর্মকর্তার ভাষ্য।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি ভারতের দিক থেকে একটি গঠনমূলক বার্তা এবং আমরা বিষয়টি লক্ষ্য করেছি।’ এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতাদের ২০১৮ সালের একটি ঘটনার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন ওই কর্মকর্তা। সে সময় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী লর্ড আলেকজান্ডার কার্লাইলের। ভারত তাকে সে সময় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









