ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’কে সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে তিনি বলেছেন দলের পরবর্তী নেতৃত্বে কে আসছেন। শেখ হাসিনার কথায় অনেকেই ধরে নিয়েছেন তিনি নেতৃত্ব ছেড়ে দিলে তাঁর জায়গায় আসবেন দলের জ্যেষ্ঠতম প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
এতে যেমন দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই নাখোশ হয়েছেন, তেমনি মাঠের নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় নেমেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁরা শেখ সেলিম সম্পর্কে দিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক নেতিবাচক পোস্ট। এতে ভীষণ বিপদে থাকা আওয়ামী লীগ যেন আরো এলোমেলো হয়ে গেছে।
জানা গেছে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কার্যক্রমের স্থবিরতার মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব আনা নিয়ে দলের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিমকে দলের হাল ধরার দায়িত্ব দেওয়ার ইঙ্গিতে ফুঁসে উঠেছে তৃণমূলের একটি বড় অংশ। পাশাপাশি শেখ পরিবারেরও একটি অংশ ক্ষুব্ধ। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের স্পষ্ট ভাষ্য, পুরনো ও বিতর্কিত নেতৃত্ব দিয়ে দল পুনর্গঠন করলে তা আত্মঘাতী হবে।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম প্রেসিডিয়াম সদস্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সে হিসেবে নাম আসে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের। এই ঘোষণা সামনে আসার পরই দেশ ও দলের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এ ছাড়া গত সোমবার রাতে কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় এক বৈঠকে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ ৮-১০ জন নেতা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
সোমবার রাতের বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, একজন কেন্দ্রীয় নেতা সেখানে দলীয় সভাপতির সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজের অস্বস্তির কথা শেখ হেলালের সামনে তুলে ধরেন।
শেখ সেলিমকে দলের পরবর্তী সভাপতি করা হবে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তৃণমূল এবং দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলা পর্যায়ের নেতা ও তৃণমূলের কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিগত বছরগুলোতে দলের ভেতরে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে, তার পেছনে এসব জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী নেতার জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি, তদবির ও দখল বাণিজ্য দায়ী। তৃণমূলের এক বিক্ষুব্ধ নেতা বলেন, “সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে তো এরাই নষ্ট করেছেন। দলের বিভিন্ন স্তরে তাঁর (সেলিম) মাধ্যমে বিতর্কিত লোকজন প্রবেশ করেছে। বিগত ১৫ বছর ধরে মাঠে রক্ত-ঘাম দেওয়া কর্মীরা আজ নিঃস্ব ও হামলা-মামলার শিকার। অথচ সংকটকালেও সেই পুরনো ও ‘পারিবারিক‘ মুখগুলোকেই আবার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত গত মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা নেতৃত্ব ইস্যুতে দলীয় গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি বলেছেন মাত্র। শেখ হাসিনা যোগ দেননি এমন কিছু বৈঠকে শেখ সেলিম সভাপতিমণ্ডলীর সিনিয়র সদস্য হিসেবে সভাপতিত্ব করেছেন। দলের নেতৃত্ব নিয়ে সংকট বা দ্বন্দ্বের কোনো প্রশ্নই নেই, কারণ আওয়ামী লীগে গঠনতন্ত্রের বাইরে কিছু হয় না।’
হাবিবে মিল্লাত বলছেন, ‘আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা যে কাউকেই দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে এখন দলের প্রস্তুতির বিষয় হলো শেখ হাসিনার ফেরা এবং তিনিই দলের সভাপতি আছেন। এর বাইরে আর কোনো আলোচনা দলের ভেতরে হয়েছে বলে জানি না।’ এরই মধ্যে গত বুধবার আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লেটার হেড প্যাডে তাঁর নাম ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে যা ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক’। যে প্রেস বিজ্ঞপ্তির কথা তিনি লিখেছেন, সেটার একটি ছবিও সঙ্গে যুক্ত করা হয় যেখানে লেখা রয়েছে যে, ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগে বিরোধ নতুন কিছু নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলছেন, মূল নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব নিয়ে সংকটের উদাহরণ আওয়ামী লীগে আগেও আছে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের এক তৃণমূল কর্মী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘দলের এই দুর্দিনে এসেও যদি সেই পুরনো পরিবারতন্ত্র আর সিন্ডিকেটের মুখগুলোর ওপরই ভরসা রাখা হয়, তাহলে মাঠের কর্মীরা কার জন্য জীবন দেবে? গত ১৫ বছর ধরে যারা দলের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে, সংকটকালে তাদের হাতে দল তুলে দেওয়া মানে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’ এই পোস্টে শত শত কর্মী সহমত জানিয়ে কমেন্ট করেছেন।
সংস্কার নাকি পুরনো ধারার পুনরাবৃত্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতার ফেসবুক পোস্ট বেশ ভাইরাল হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের আজকের এই অবস্থার জন্য দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের প্রবীণ ও একরোখা রাজনীতিই দায়ী। ৫ আগস্টের পর দল পুনর্গঠন করতে হলে প্রয়োজন ছিল সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কার এবং তরুণ ও পরীক্ষিত মুখগুলোকে সামনে নিয়ে আসা। কিন্তু তা না করে পুরনো নেতৃত্বকেই যদি পুনর্বহাল করা হয়, তাহলে সাধারণ কর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।’চট্টগ্রামের এক যুবলীগ নেতার কমেন্ট বক্সে দেখা গেছে তীব্র হতাশার সুর। তিনি লিখেছেন, ‘যাঁরা এত দিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে হুকুম চালিয়েছেন আর আজ দলের চরম বিপদের দিনেও নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চান, তৃণমূল তাঁদের আর মানবে না। মামলা-হামলার শিকার হয়ে আজ কর্মীরা পথে বসেছে, আর আপনারা সেই পুরনো বৃত্তের বাইরে বের হতে পারছেন না।’ সিলেট অঞ্চলের এক আওয়ামী লীগ সমর্থক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সময় এসেছে আত্মসমালোচনা করার। নেত্রীর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলকে বাঁচাতে হলে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বিশেষ পরিবার বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে দল চালালে তা দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হবে।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দলের শীর্ষ নেতারা হয় দেশত্যাগী, নতুবা কারাবন্দি। এমন একটি ক্রান্তিলগ্নে দলের কাঠামোগত সংস্কার, নতুন প্রজন্ম বা তরুণ ও পরীক্ষিত মুখগুলোকে সামনে আনার দাবি ছিল তৃণমূলের। কিন্তু প্রবীণ ও পারিবারিক পরিচিত মুখের মধ্য থেকেই শীর্ষ নেতৃত্ব নির্ধারণের ইঙ্গিত আসায় তৃণমূল মনে করছে, এতে দলের ইমেজ সংকটের কোনো সুরাহা হবে না, বরং জনরোষ আরো বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে তৃণমূলের আস্থার জায়গাটি পুনরুদ্ধার করা সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শীর্ষ নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তে তৃণমূলের দূরত্ব ও অসন্তোষ আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যা দলটিকে ভবিষ্যতে আরো বড় সাংগঠনিক সংকটের মুখে ফেলতে পারে।
বরিশালের একটি গ্রাম্য বাজারে চায়ের দোকানের এক কোণে বসা প্রবীণ এক স্কুলশিক্ষক চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে বলেন, ‘ভাই, রাজনীতি এখন আর আগের জায়গায় নেই। দল যখন একটা ক্রান্তিকাল পার করছে, তখন অভিজ্ঞতার তো একটা দাম আছেই। শেখ সেলিম তো আর নতুন কেউ নন, দলের একদম ভিতরের মানুষ।’তাঁর কথার মাঝেই তেড়ে উঠলেন টেবিলে বসা এক তরুণ ব্যাংকার। কিছুটা বিরক্তির সুরেই তিনি বললেন, ‘অভিজ্ঞতা? কোন অভিজ্ঞতার কথা বলছেন কাকা? গত ১৫-২০ বছরের সিন্ডিকেট আর হুকুমের রাজনীতি তো এই প্রবীণরাই টিকিয়ে রেখেছিল। দলটাকে আজ এই দশায় কে ফেলল? এখন আবার তাঁদের হাতেই যদি চাবি দেওয়া হয়, তবে তো বুঝতে হবে চরম বিরূপ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো বালাই নেই।’আড্ডার মাঝখানে বিস্কুটে কামড় দিয়ে স্থানীয় এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, ‘আগে তো লোকে ভাবছিল দলের হাল হয়তো অন্য কেউ ধরবেন। কিন্তু এখন শেখ সেলিমের নাম আসায় তৃণমূলের কর্মীরা তো পুরো তেতে উঠেছে। ফেসবুকে যা শুরু হয়েছে, তাতে মনে হয় না কর্মীরা এই সিদ্ধান্ত সহজে মেনে নেবে। মামলা-হামলায় মাঠের কর্মীরা আজ জেলে বা পলাতক, আর হুকুম দেওয়ার লোকগুলো সেই একই বৃত্তের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।’
পাশে থাকা আরেকজন যোগ করেন, ‘ঠিকই বলেছেন। দল পুনর্গঠন করতে হলে তো তরুণ ও পরীক্ষিত মুখ দরকার ছিল। এই পুরনো ফর্মুলা তো আর কাজে দেবে না। এটাকে তো আর দল বাঁচানো বলে না, এটাকে বলে কোনোমতে নিজেদের পারিবারিক বা সিন্ডিকেটের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার লড়াই।’এই আড্ডা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট— নেতৃত্বের এই ঘোষণায় দলের ভেতরে-বাইরে চঞ্চলতা তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে তা স্বস্তি বা আশার চেয়ে হতাশা ও ক্ষোভেরই জন্ম দিয়েছে বেশি। সংকটকালে প্রবীণ ও পরিচিত মুখগুলোর ওপর ভরসা করার এই কৌশল আখেরে দলের ভাঙন আরো ত্বরান্বিত করবে, নাকি নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করবে— চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এখন সেটাই হিসাব করছেন রাজনীতি-সচেতন মানুষেরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









