একটি আদর্শ থানা হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের আইনি সেবাপ্রাপ্তির উন্মুক্ত ভরসাস্থল। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন ক্যান্টনমেন্ট থানার বাস্তবতা ভিন্ন। এটি ঢাকা সেনানিবাসের মতো কঠোরভাবে সুরক্ষিত একটি সামরিক জোনের ভেতরে অবস্থিত। ফলে সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে থানা হওয়ায় সাধারণ মানুষের সহজে আইনি সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, এসব কারণে থানায় থেকে তাদের নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় ১৫ লক্ষাধিক মানুষ বাস করেন। এর বাইরে সেনানিবাসে রয়েছেন সামরিক কর্মকর্তা, সৈনিক ও তাদের পরিবার। অর্থাৎ, থানার সিংহভাগ জনগোষ্ঠীই অসামরিক সাধারণ নাগরিক। তারা মূলত সেনানিবাসের সীমানা ঘেঁষে বাইরের অসামরিক এলাকাগুলোতে বসবাস করেন।
ক্যান্টনমেন্ট থানা পরিচিতি
ক্যান্টনমেন্ট থানা বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে এবং অপরাধ দমনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাকে নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করে নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিজাত আবাসিক এলাকা বারিধারা ডিওএইচএসসের ১ থেকে ৪ নম্বর রোড, ৫ থেকে ১৩ নম্বর রোড, এবং ৪ নম্বর রোডের উভয় পার্শ্ব থেকে শুরু করে ৬ নম্বর রোডের এ, বি, ও সি ব্লকসহ স্থানীয় মসজিদ রোড।
এছাড়া জনবহুল মাটিকাটা ও মানিকদী এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিটভিত্তিক বিভাজন করা হয়েছে। মাটিকাটা বিটের অধীনে রয়েছে মাটিকাটা বাজার, পশ্চিম মাটিকাটা ও খান পল্লী এলাকা। অন্যদিকে, মানিকদী বিটের আওতায় রয়েছে পশ্চিম মানিকদী, মাস্টারটেক, উত্তর মানিকদী নম্বরীটেক, দক্ষিণ মানিকদী, মানিকদী নামাপাড়া, মানিকদী বাজার ও পূর্ব মানিকদী এলাকা। একই সঙ্গে ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক হাব ইসিবি চত্বর এলাকাকেও এই বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরেজমিন প্রতিবেদন
আইনি সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলেছে দৈনিক এদিন। তারা জানান, সংরক্ষিত সামরিক এলাকার ভেতরে থানা হওয়ায় তাদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। সেনানিবাসের চেকপোস্টে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ, পরিচয়পত্র প্রদর্শন এবং পাসের বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষের মনে মানসিক ভয় তৈরি করে। কয়েকজন নারী সেবাপ্রত্যাশী জানান, মধ্যরাতে বা জরুরি প্রয়োজনে পারিবারিক সহিংসতা কিংবা সাইবার অপরাধের শিকার হলেও , দীর্ঘ তল্লাশি প্রক্রিয়ার ভয়ে তারা থানায় যেতে দ্বিধাবোধ করেন। ফলে অনেক অপরাধই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
সেনানিবাসের ভেতরে সাধারণ রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা বা গণপরিবহন চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নিয়মকানুন রয়েছে। ফলে কোনো প্রবীণ নাগরিক, শারীরিক প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ ব্যক্তি যদি থানায় যেতে চান, তবে তাকে চেকপোস্ট থেকে দীর্ঘ পথ হেঁটে বা বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে যাতায়াত করতে হয়, যা চরম ভোগান্তির কারণ।
ক্যান্টনমেন্ট থানায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি প্রসঙ্গে দৈনিক এদিনের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাটিকাটা বাজার এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ হোসেন। তিনি জানান, গত মাসে মোবাইল চুরির জিডি করতে গিয়ে পকেট গেট সেনা চেকপোস্টে তিনি চরম জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। এমনকি তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিও ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি থানায় না গিয়েই ফিরে আসেন। যেখানে প্রবেশ করতেই অনুমতির প্রয়োজন হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের থানা স্থাপন নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, অনেক সময় মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। বিশেষ করে কোনো সাধারণ অপরাধী বা দুর্ধর্ষ আসামিকে গ্রেফতারের পর থানায় আনা এবং থানা থেকে আদালতে নেওয়ার সময় কঠোর সামরিক নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হতে হয়। সুরক্ষিত সেনাসীমানার ভেতরে সিভিল পোশাকে বা সাধারণ পুলিশের গাড়িতে দাগী আসামিদের সার্বক্ষণিক আনা-নেওয়া সামরিক শৃঙ্খলার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অসুবিধা হয়।
দৈনিক এদিনের সাথে কথা বলা মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা বলেন, অসামরিক এলাকায় যেমন মাটিকাটা বা মানিকদী কোনো মারামারি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে, থানা থেকে পুলিশের গাড়ি বের হয়ে সেনা চেকপোস্ট পার হয়ে মূল স্পটে পৌঁছাতে সাধারণ থানার চেয়ে বেশি সময় লাগে। তারা বলেন পুলিশ সদস্যরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করলেও সেনানিবাসের ভেতরে থাকার কারণে তাদের সামরিক আইনের বিধিবিধান, ট্রাফিক নিয়ম এবং চলাচলের সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে চলতে হয়। ফলে অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার গতি থেমে যায়।
একটি আদর্শ থানা কোথায় থাকা উচিত
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবের মতে, একটি আদর্শ থানার অবস্থান এমন জায়গায় হওয়া উচিত যেখানে সাধারণ জনগণের অবাধ, বাধাহীন ও সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত থাকে। এ ক্ষেত্রে কঠোরভাবে সুরক্ষিত বা জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় থানা স্থাপন কখনো কাম্য নয়। এদিনকে তিনি বলেন, এটি বরং ক্যান্টনমেন্টের মতো সুরক্ষিত এলাকার প্রান্তিক সীমানায় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেন একই সাথে ক্যান্টনমেন্টের নিজস্ব নিরাপত্তা বজায় থাকে এবং বাইরের বেসামরিক মানুষের আইনি ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার অবস্থান প্রসঙ্গে স্থানীয়দের মতামত নিয়ে দৈনিক এদিন-এর সাথে কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুর রহমান। তিনি জানান, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যেকোনো পরিস্থিতিতেই পুলিশ জনগণের আইনি অধিকার নিশ্চিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহজ যাতায়াত এবং নাগরিক সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে একটি আদর্শ থানা সব সময় সহজলভ্য ও নিরাপদ স্থানে হওয়া যৌক্তিক এবং সমর্থনযোগ্য।
থানায় নাগরিক অধিকার রক্ষা ও আইনি হয়রানি বন্ধের বিষয়ে দৈনিক এদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা বা (কেপিআই) এলাকায় সাধারণ থানা রাখার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। তবে সেনানিবাস (ক্যান্টনমেন্ট) এলাকায় পুলিশি কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে থানা পরিচালনার বিষয়ে তিনি দুটি সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, থানা যদি সেনানিবাসের ভেতরেই অবস্থান করে, তবে প্রবেশদ্বারের চেকপোস্টের সাথে থানার সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর ফলে কোনো আইনি সেবাপ্রার্থী চেকপোস্টে এসে সরাসরি থানায় যোগাযোগ করে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেতে পারেন। তবে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সেনানিবাস এলাকার বাইরে থানা স্থানান্তরের পক্ষে সবচেয়ে বেশি জোর দেন। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আইনি সেবাপ্রাপ্তি আরো সহজ ও হয়রানিমুক্ত হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতামত
ক্যান্টনমেন্ট থানা স্থানান্তরের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গনি দৈনিক এদিনকে বলেন, সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থানা স্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের সব সেনানিবাসে বিদ্যমান। তিনি উল্লেখ করেন, বেসামরিক জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে থানা স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই আসতে হবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদন এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উচ্চ কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারে বলে জানান তিনি ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সেনানিবাস হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুরক্ষার জায়গা এবং থানা জনগণের উন্মুক্ত সেবার স্থান। এই দুটি ভিন্নধর্মী ধারণাকে এক জায়গায় মেলানো কৌশলগতভাবে ভুল এবং এটি সামরিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার উভয় দিক থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানাটি দ্রুত সেনানিবাসের বাইরে, যেমন কালশী বা ইসিবি চত্বরের কাছাকাছি কোনো উন্মুক্ত পাবলিক স্পেসে স্থানান্তর করা উচিত। এতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষও কোনো ভয় বা বাধা ছাড়াই আইনি সেবা পাবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত পুলিশের সাথে জনগণের দূরত্ব কমিয়ে আনা। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানাটি সংরক্ষিত সামরিক বেষ্টনীতে বন্দি থাকায় এই দূরত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও বেড়ে চলেছে। তাই দেশের সামরিক নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রেখে এবং সাধারণ জনগণের আইনি অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ক্যান্টনমেন্ট থানাটিকে অবিলম্বে অসামরিক এলাকায় স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









