দলীয় সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পর এবার জুলাই গণআন্দোলনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাতজন শীর্ষনেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। দণ্ডিত অন্যরা হলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তাদের মধ্যে সাদ্দাম ও ইনান ছাড়া বাকিদের অর্ধেক সম্পদ জব্দ করে জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে।
এ নিয়ে জুলাই গণআন্দোলনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ সাতটি মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাঁর দল ও সরকারের শীর্ষস্থানীয় নয়জন। এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর অন্য একটি মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড ও তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে জুলাইয়ে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয় জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত দুই ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত সাতটি মামলার রায়ে ৬৮ জন আসামির সাজা হয়েছে। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২২ জনের মধ্যে ১৮ জনই পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগের সেকেন্ড ইন কমান্ড ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন, বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ ও জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের স্বজনেরা। আর রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, সুযোগ থাকলে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা উচিৎ। রায় ঘোষণার পর পরই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের অ্যাডভোকেট লাউঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা।
বিচার কার্যক্রম: সাতজন আসামির বিরুদ্ধেই ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ, হত্যা ও নির্যাতনের চারটি করে অভিযোগ আনা হয়। একেকজনের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে কোনোটিতে মৃত্যুদণ্ড, কোনোটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তাদের প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং অভিযোগভেদে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ও দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগে জানিয়েছিলেন, আসামিদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সম্পৃক্ততায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়। অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাতজনকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), (গ), (হ) এবং ৪(১), (২), (৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। সেসব অভিযোগ প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়েছি আমরা।’
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে এই মামলার সাতজন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। সেদিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে নিহত আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাক সাক্ষ্য দেন। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ ১৭ আগস্ট রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। পরে সোমবার ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
আসামিরা সবাই পলাতক থাকায় আইনানুসারে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন এম হাসান ইমাম ও আইনজীবী ইসরাত জাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামীম।
রায়ের প্রতিক্রিয়া ও আপিল প্রসঙ্গ
আইনানুসারে, ট্রাইব্যুনালের এই রায় প্রকাশিত হওয়ার পরে ৩০ দিন পর্যন্ত আসামিদের আপিল করার সুযোগ থাকে। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘৩০ দিন পর্যন্ত কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নেই। কিন্তু ৩০ দিন পর থেকে বাংলাদেশ সরকারের এই রায় বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই।’ আসামিরা পলাতক অবস্থায় কোনো বক্তব্য দিলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন চিফ প্রসিকিউটর। একইসঙ্গে, এই মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট এবং মনে করি, এটি একটি প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। আজকে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই হতাহতদের প্রতি আজ ন্যায়বিচার করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।’
রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি বলেন, ‘সব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডকুমেন্টের ভিত্তিতে আসামিদের খালাস করানোর জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আইন অনুসারে যেভাবে এগোনো যায়, সেভাবেই আর্গুমেন্ট ও জেরা করেছি। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল আমার চারজন আসামিকে বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।’ সাদ্দাম, ইনান, নিখিল ও পরশের আইনজীবী অনি বলেন, ‘ট্রাইবুনালের রায় মানতে আইনজীবী হিসেবে আমরা বাধ্য। ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ধৃষ্টতা আমাদের নেই। ট্রাইবুনালের রায় মানি, মান্য করি। কিন্তু আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট নই।’
কাদের, নাছিম ও আরাফাতের আইনজীবী হাসান ইমাম বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করেছি। জেরা করেছি, আর্গুমেন্ট করেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল অব কমন রেসপনসিবিলিটির সুবিধা-অসুবিধা সবকিছু ট্রাইব্যুনালে ব্যাখ্যা করেছি। রায়ে আমাদের এসব বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, রায় না দেখে বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘আমি একজন জজ ছিলাম। সেই হিসেবে বলছি, বিচারপতিদের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই, কিংবা বলার মতো ধৃষ্টতাও নেই। তবে আমিও এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।’ সুযোগ থাকলে আপিল করা উচিত মন্তব্য করে হাসান ইমাম বলেন, ‘আপিলে হয়তো আমরা আরও ভালো কোনো ফল পেতে পারি, আগামী দিনগুলোতে।’
মিরপুরে নিহত মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতেই থাকুন, ওইখানেই মরুন। মরার পরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিক অথবা তাকে দাফন করুক, সেটি তাদের ভারতের ব্যাপার। কিন্তু আমরা তাকে চাই না। যারা তাগড়া আসামি, তাদের দেশে নিয়ে এসে ফাঁসি দেওয়া হোক।’ তিনি বলেন, ‘যারা দেশে আছেন, তাদের বিচার করুক। দুই-একজনকে ফাঁসি দিক না। তারপরে বলব যে, সরকার বিচার করছে। আজ পর্যন্ত প্রদীপের বিচার হলো না। জিয়াউল হাসানের কিছু হলো না। তারা এমন শরীর নিয়ে জেলে এক্সারসাইজ করেন।
তো দুই-একটা ফাঁসি হোক না, দেখাক না যে কারও ফাঁসি হয়েছে।’ সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করে মোশাররফ বলেন, ‘আজকে সরকারের যে অবস্থা, এই সরকার থাকবে কি না তাও জানি না। নতুন কোনো সরকার এলে, আবার শুনি যে আওয়ামী লীগ আসবে, তখন তো এদের সব মামলা শেষ হয়ে যাবে। এরা আবার দেশের মধ্যে অশান্তি শুরু করবে।’ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে মোশাররফ বলেন, ‘তারেক রহমানকে আবারও বলছি, দুই-একজনের ফাঁসি দেন, তারপর বিশ্বাস করব যে, আপনি আসলেই বিচার করতে চান।’
রায়ের পর ককটেল বিস্ফোরণ
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ডের এই রায় ঘোষণার পর পরই দুপুর ১টা ১৫ থেকে ১টা ২০ মিনিটের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের প্রবেশপথের সামনে গণপূর্ত ভবনের উল্টো দিকের রাস্তায় চলন্ত একটি মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা রাস্তায় ককটেল ছুড়ে মেরে দ্রুত পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, ‘কে বা কারা একটি ককটেল ছুড়ে মারলে বিস্ফোরণ ঘটে। আমরা জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছি।’ সুপ্রিম কোর্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামও বলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের কাছে, গণপূর্ত ভবনের উল্টো দিকের রাস্তায় ওই বিস্ফোরণ ঘটে। চলন্ত একটি বাইক থেকে দুর্বৃত্তরা ককটেলটি ছুড়ে মারে। ঘটনাটি প্রধান ফটকের বাইরে রাস্তার দিকে ঘটেছে।’
আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নীরব প্রতিবাদ
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। দুপুর দেড়টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের অ্যাডভোকেট লাউঞ্জের সামনে আওয়ামীপন্থি একদল আইনজীবী জড়ো হয়ে এ প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাদের কোনো স্লোগান দিতে দেখা যায়নি। তবে উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবীকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে শোনা যায়।
সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সাজা
ওবায়দুল কাদের: জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময়ের ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি, আন্দোলন দমনের নির্দেশ, অপহরণ এবং হত্যার মতো চারটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনেন প্রসিকিউশন। এর মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড ও একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড পেয়েছেন তিনি।
এই মামলার শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে ওবায়দুল কাদেরের বেশ কয়েকটি অডিও শোনানো হয়েছে। এসব অডিওতে কাদেরকে তার নেতা-কর্মীদের জুলাই আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিতে শোনা গেছে। প্রথম অভিযোগ অনুসারে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে মোবাইল ফোনে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’। প্রমাণিত এই অভিযোগে সর্বোচ্চ সাজা পেয়েছেন তিনি।
পরে ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ উচ্চারণ করে যে বক্তব্য দেন সেই সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরও ছিলেন। তিনি অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রমাণিত দ্বিতীয় এই অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড পেয়েছেন তিনি।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, পরদিন ১৫ জুলাই ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের দমনে শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে ফোন করে ছাত্রলীগকে ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি। আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট ধীর করা, পুলিশ-র্যাবকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। চতুর্থ এই অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে ফোনালাপেও আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি। প্রমাণিত এই দুটি অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ওবায়দুল কাদের।
আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম: প্রথম অভিযোগ অনুসারে, ৯ ও ১৫ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে বসে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ ও প্ররোচনা দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের বিষয়টি তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করতেন এবং তার নির্দেশে সেখানে একাধিক হত্যার ঘটনা ঘটে। তৃতীয় অভিযোগে ৪ আগস্ট ফার্মগেইটে আন্দোলনকারীদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শেষ অভিযোগে বলা হয়েছে, বাহাউদ্দিন নাছিমের প্ররোচনায় নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-৮-এ সশস্ত্র হামলায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রথমটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও দ্বিতীয়টিতে খালাস পেলেও শেষ দুটিতে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।
মোহাম্মদ আলী আরাফাত: প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩ ও ১৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুসারে, ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে মহড়া দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা-১৭ আসনের মহাখালী ও গুলশান এলাকায় হামলা চালিয়ে একাধিক আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। এছাড়া আন্দোলন দমনে সরকারের বল প্রয়োগের খবর প্রচার করায় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। চতুর্থ এই অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ ও ২২ জুলাই কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের ঘটনায় তার ভূমিকা ছিল।
শেখ ফজলে শামস পরশ: প্রথম অভিযোগ অনুসারে, যুবলীগ চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলে শামস পরশ তার অধীনস্থ নেতাকর্মীদের ‘সশস্ত্র অবস্থায়’ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, তার নির্দেশ ও নেতৃত্বে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলন চলাকালে হামলা চালায়।
তৃতীয় অভিযোগ অনুসারে ১৮ জুলাই সারা দেশে গুলিতে অন্তত ২৩ জন নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হওয়ার কথাও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। শেষ অভিযোগে পরশের বিরুদ্ধে ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মাইনুল হোসেন খান নিখিল: প্রথম অভিযোগ অনুসারে, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১২ জুলাই সিলেটে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যুবলীগ নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল। দ্বিতীয়টিতে ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় অংশ নেওয়া এবং তৃতীয়টিতে ১৯ জুলাই মিরপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, নিখিলের সরাসরি নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।
সাদ্দাম হোসেন: প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি দেন। দ্বিতীয়টিতে ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১১ জুলাই বিকালে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাদ্দামের ফোনালাপ হয় এবং সেখানে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া এবং আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। শেষ অভিযোগে ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দামের বক্তব্যের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান: প্রথম অভিযোগ অনুসারে, আন্দোলন দমনে শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন, নির্দেশনা দেন এবং অর্থ গ্রহণ করেন। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে তিনি হিংসাত্মক, বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখান তিনি। দ্বিতীয়টিতে ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় হেলমেট পরা অবস্থায় মাঠে থেকে তা সরাসরি তদারকি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ১৫ জুলাই আসিফ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর নেতৃত্বে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা হামলা চালান।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দাম আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার যে হুমকি দেন, তা সেখানে উপস্থিত থেকে সমর্থন করেন আসিফ। সেদিন সারা দেশে ছয়জন নিহত হন। ১৮ জুলাই ছাত্রলীগসহ অন্যদের হামলায় দেশে ২৩ জন নিহত হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আসিফের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে। চতুর্থ অভিযোগ অনুসারে, আল জাজিরায় ফাঁস হওয়া কথোপকথনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে তা সারাদেশে বাস্তবায়নের বিষয়টি উঠে আসে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, কার জন্য কতো
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আসামি ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক (৫০ শতাংশ) বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং ওই সম্পত্তি বিক্রির অর্থ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বা আগস্ট সময়কালে নিহত ও আহত সবাই বা তাদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো।’
এই রায়ের একটি ইতিবাচক দিক আছে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘রোম স্ট্যাটিউটে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান আছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই রায়ে পাঁচজন আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে।’ তিনি বলেন, এই ৫০ শতাংশ এটাও সুনির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিলি-বন্টনের ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে এখন আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ও বিক্রির ব্যবস্থা এবং আহত-নিহতদের পরিবারের মধ্যে বিলি-বন্টনের ব্যবস্থা করতে আর কোনো সমস্যা হবে না বলেও মনে করেন আমিনুল ইসলাম। আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এই রায় বাস্তবায়ন করবে সরকার এবং তাদের কার কোথায় কী সম্পদ আছে রাষ্ট্র বা সরকার সেটা খুঁজে বের করবে এবং সে অনুসারে তাদের যে সম্পদ পাওয়া যাবে তার অর্ধেক বাজেয়াপ্ত হবে।’ এর আগে যেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ হয়েছিল, সেসব বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মনে হয় যে আজকের যে জাজমেন্ট হয়েছে, আমার মনে হয় সরকার সেটিকে ফলো করতে পারবেন।’
কাদেরের সম্পদ: ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে ওবায়দুল কাদের (নোয়াখালী-৫) হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁর ঘোষিত সম্পদের তথ্য জানা যায়।
ওবায়দুল কাদের দেখিয়েছিলেন, তাঁর হাতে আছে নগদ ৮০ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আছে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্র আছে প্রায় দেড় কোটি টাকার। গাড়ি একটি, যার দাম ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২৫ তোলা সোনার দাম ওবায়দুল কাদের দেখিয়েছিলেন দেড় লাখ টাকা। তাঁর ৯ লাখ ২০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রী এবং ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আসবাব রয়েছে বলে হলফনামায় দেখানো হয়েছিল।
সব মিলিয়ে ওবায়দুল কাদেরের অস্থাবর সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় তিন কোটি ২৩ লাখ টাকা। ওবায়দুল কাদেরের স্থাবর সম্পদ হিসেবে শুধু ঢাকার উত্তরায় ৫ কাঠা জমি দেখানো হয়েছে। এই জমির মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ওবায়দুল কাদেরের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য তিন কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
নাছিমের সম্পদ: ২০২৪ সালের নির্বাচনে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ঢাকা–৮ আসনে অংশ নিয়েছিলেন। হলফনামা অনুসারে, নাছিমের হাতে নগদ টাকা ছিল সাত কোটি ৬৯ লাখ। ব্যাংকে ছিল নয় কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বিভিন্ন কোম্পানিতে তাঁর মালিকানা, অর্থাৎ শেয়ার এবং বন্ডের মূল্য ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্র রয়েছে ৬০ লাখ টাকার। তাঁর দুটি গাড়ি আছে, যার দাম প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। ২৫ ভরি সোনার দাম তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকা দেখিয়েছেন। ইলেকট্রনিস সরঞ্জাম ও আসবাবের দাম তিনি দেখিয়েছেন সোয়া ১০ লাখ টাকা। নাছিমের অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। নাছিমের স্থাবর সম্পদের মধ্যে মাদারীপুর ও সাভারে ১৩৯ শতাংশ কৃষিজমি রয়েছে। তাঁর অকৃষি জমি রয়েছে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাজীপুরে; পরিমাণ ১৫৩ শতাংশ। জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা।
ঢাকার উত্তরায় নাছিমের একটি ভবন রয়েছে। তার দাম ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ঢাকার মিরপুরে তাঁর একটি ফ্ল্যাট আছে। যার দাম ৪৫ লাখ টাকা। নাছিমের মোট স্থাবর সম্পদ রয়েছে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ টাকার।
আরাফাতের সম্পদ: মোহাম্মদ আলী আরাফাত ঢাকা–১৭ আসনে ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। এরপর আরাফাত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী হন।
আরাফাতের নামে স্থাবর সম্পদের মধ্যে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। হলফনামায় এর মূল্য দেখানো হয়েছে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ ছাড়া তাঁর নামে অন্য কোনো স্থাবর সম্পদের তথ্য নেই। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে আরাফাতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ শেয়ারে। নয়টি কোম্পানির শেয়ার রয়েছে তাঁর নামে, যার মূল্য প্রায় এক কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ৩৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি এবং তিন লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে। সব মিলিয়ে আরাফাতের নিজের নামে অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
নিখিলের সম্পদ: ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিলের হলফনামায় স্থাবর সম্পদের তালিকায় কৃষি ও অকৃষিজমির তথ্য রয়েছে। একটি কৃষিজমি প্রায় সাড়ে ছয় একর, যার মূল্য চার লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আরেকটি কৃষিজমি ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যার মূল্য ২৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা। নিখিলের তিন কাঠার একটি অকৃষি প্লটের মূল্য দেখানো হয়েছে চার লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকা।
এ ছাড়া বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট শ্রেণিতে ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ টাকার সম্পদের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর ঘোষিত স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৬৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা। নিখিলের অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ অর্থ রয়েছে ২৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। নিজের নামে এক কোটি টাকার একটি এফডিআরও (ব্যাংকে স্থায়ী আমানত) রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর শেয়ারের মধ্যে নাবিল প্রপার্টিজে আট লাখ টাকা এবং নাবিল প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ে ৬২ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। তাঁর তিনটি যানবাহনের মূল্য দেখানো হয়েছে এক কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা। নিখিলের সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









